
আসন্ন ঈদ উল আযহাকে সামনে রেখে দেশের লাইফলাইন ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে সম্ভাব্য যানজট প্রবণ এলাকা হিসেবে ২৪ টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। মুন্সীগঞ্জের মেঘনা টোলপ্লাজা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বারবকুন্ড বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই শত কিলোমিটার এলাকায় এসব পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও হাইওয়ে পুলিশ ও সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে- তাদের প্রচেষ্টায় এসব এলাকাগুলো যানজটমুক্ত থাকবে। ঈদ উল আযহায় ঘরে ফেরা হবে স্বস্তির। ইতোমধ্যে মহাসড়ক যানজট মুক্ত রাখতে করণীয়ও নির্ধারণ করেছে তারা। তবে এই মহাসড়কে চলাচলকারীরা বলছেন, মহাসড়কের পাশে যেন পশুর হাট না বসে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়- এই বিষয়ে বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে সংশ্লিষ্টদের। মহাসড়কে ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধেও পুলিশকে সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানিয়েছেন যাত্রী ও চালকরা।
কুমিল্লা জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের সূত্র মতে, হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের আওতাধীন এলাকায় ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা স্বস্তির করতে হাইওয়ে পুলিশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানগুলোকে সম্ভাব্য যানজট প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে জটিলতা নিরসনে কাজ শুরু করেছে। মুন্সীগঞ্জ থেকে শুরু করে কুমিল্লা ও ফেণী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় দুই শ কিলোমিটার সড়কে নজরদারি ও টহল বাড়াচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ। একই সাথে যেসব এলাকায় সংস্কার ও মেরামত প্রয়োজন সেসব এলাকাগুলোতে কাজ করছে সড়ক বিভাগ।
এদিকে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জের টোলপ্লাজাকে যানজটের সম্ভাব্য পয়েন্ট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ ঈদের অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সেখানে টোল আদায়ে ধীর গতি হতে পারে, কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরীপুর, আমিরাবাদ, চান্দিনা, মাধাইয়া বাজার এলাকায় মহাসড়কের পাশে বাজার ও বাসস্ট্যান্ড থাকায় যানজট তৈরী হতে পারে। কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আলেখারচর এলাকা পর্যন্ত মহাসড়ক মেরামতে কাজ চলমান থাকায় সেখানে যানজটের তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া পদুয়ার বাজার এলাকায় পার্শ্বরাস্তা ও ইউটার্ন, মিয়াবাজারে মহাসড়কের উভয় পাশে দোকান, বাসস্ট্যান্ড এবং একটি গরুবাজার, চৌদ্দগ্রাম বাজারেও ঢাকামুখী লেনের উভয় পাশে দোকান ও বাসস্টপেজ যানজটের কারণ হবে। এছাড়া ফেনীর মহিপালে বেসিক মোড়, কসকা বাজার, সমিতি বাজার বারইয়ার হাট, মীরসরাই এলাকায় পার্শ্ব রাস্তা এবং বাসস্টপেজের কারণ যানজটের শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড বাজার, বড় দারোগার হাট ওজন স্কেল, ফুটলিংক, ছোট কুমিরা, কেডিএস বাজার, ভাটিয়ারী এবং বরবকুন্ড বাজার এলাকাতেও যানজটের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তা নিরসনে উদ্যোগ নিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রায় প্রতিদিনই কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এই মহাসড়কে চলাচলকারীদের। গতকাল বৃহস্পতিবারও এই চিত্র দেখা গেছে। সড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে মূলতঃ এই সমস্যা তৈরী হলেও টোলপ্লাজায় টোল আদায়ে ধীর গতির কারণেও যানজটের সৃষ্টি হয় বলে জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই সংগঠনটি। অন্যদিকে একাধিক যাত্রী ও চালকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের যানজট ও ভিড়কে কেন্দ্র করেমহাসড়কের বিভিন্ন স্পটে ছিনতাই, মলমপার্টি ও ডাকাতদল সক্রিয় হয়। পুলিশ তৎপর থাকলে এসব অপরাধীরা সুযোগ পায় না।
নিরাপদ সড়ক চাই - দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা বিভিন্ন সভা সেমিনারে উল্লেখ করি - টোলপ্লাজায় টোল আদায়ে ধীর গতির কারণেও যানজট হয়। ঈদের আগে সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পন্যবাহী যানবাহন রাজধানীমুখী থাকে- এসময় টোল আদায়ের পরিমান বাড়ে- কিন্তু ভাংতি টাকার অজুহাতে টোলপ্লাজায় ৮টি বুথের মধ্যে মাঝে মাঝে ৪টিও বন্ধ থাকে। এটা জরুরী সময়ে একেবারে অনুচিত। টোলপ্লাজায় একটি বুথ বন্ধ হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই যানজট গৌরীপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। আর সেখানে চৌমুহনী হওয়ায় যানজটের ব্যাপকতা আরো বেশি বাড়ে। টোলপ্লাজায় নজর দিতে হবে প্রশাসনকে।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাজধানীগামী লরি চালক আমিনুলের সাথে কথা হয় পদুয়ার বাজার এলাকায়। আমিনুলের অভিযোগ, কোথাও যানবাহনের জটলা তৈরী হলে- সাথে সাথে তা নিরসনের চেষ্টা করা হয় না। অবৈধ পার্কিং কিংবা দুর্ঘটনার কারণে যদি যানবাহন আটকে যায় হাইওয়ে পুলিশ যদি সাথে সাথে তা নিরসন করে তাহলে যানজট কখনোই দীর্ঘ হবে না।
কুমিল্লার চান্দিনার মসলা ব্যবসায়ি আবিতুর রহমান বলেন, আমি চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন এলাকায় মসলা পাঠাই। ঈদের সময় হলো ভরা মৌসুম এই সময়- কোথাও ট্রাক এক মিনিট থেমে থাকা মানে হাজার টাকা লোকসান। সভা সেমিনারে পুলিশ ও প্রশাসনকে জানাই- এবার ঈদে কি হবে দেখি !
ঢাকাগামী বাস যাত্রী মাহফুজ আহমেদ জানান, সাধারণত ঈদে রাস্তায় তিন চারগুণ বেড়ে যায়। এসময় পুলিশ ও প্রশাসনকেও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। কেউ আইন ভাঙ্গলে প্রয়োজনে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। অথচ এক নিমসার ও চান্দিনায় বারবার উচ্ছেদ করেও সড়কের আশেপাশের জটলা ও স্থাপনা সরানো গেল না। আর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় যে মেরামত কাজ গত ৫ মাস ধরে চলছে তা শেষই হয় না। এসব কারণেই মানুষের যানজটের ভোগান্তি বাড়ে। এখন আবার প্রচন্ড রোদ আবার প্রচন্ড বৃষ্টি- যানজটে মানুষের কষ্টের শেষ নাই!
কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আদনান ইবনে হাসান বলেন, আমরা ঈদের আগে সকল মেরামত কাজ বন্ধ রাখবো। বরং যেখানে যেখানে ভাঙ্গাচুড়া আছে সেগুলো দ্রুত সারিয়ে তুলছি। আর অবৈধ স্থাপনা আমরা উচ্ছেদ করি কিন্তু আবার সেগুলো বসে যায়- এসব নিয়ে সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে আমাদের একার পক্ষে সম্ভব না।
দাউদকান্দি টোলপ্লাজার দায়িত্বে থাকা নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহিম জানান, টোলপ্লাজায় টোল আদায়ে ধীরগতির বিষয়টি আমি ইতোমধ্যে অবগত হয়েছি। আমরা টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানকে বলেছি তারা যেন পর্যাপ্ত ভাংতি টাকা রাখে এবং যাত্রী-চালকদেরও বলছি তারা যেন টোলের সমপরিমান টাকা জমা দেয়। বিষয়টি আমি জেনেছি- এবং অবশ্যই তা গুরুত্বের সাথে দেখা হবে।
এদিকে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা যেন নিরাপদ ও স্বস্তির হয় এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়ন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহীনুর আলম খান। তিনি জানান, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত ৭২৯ কিলোমিটার মহাসড়ক যানজটমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে প্রায় একহাজার পুলিশ সদস্য কাজ করবে। এর মধ্যে নিয়মিত সদস্যের বাইরে আড়াই শ জন নিয়োৃজিত থাকবে।
এছাড়াও পুলিশ সুপার জানান, মহাসড়তে ছিনতাই, ডাকাতি রোধে রাতে পুলিশ বেশি তৎপর থাকবে-এ ব্যাপারে জেলা পুলিশের সাথেও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া সড়ক ও মহাসড়কের পাশে যেন পশুর হাট না বসে সেজন্য নজরদারি করা হচ্ছে। আশা করি ঈদ যাত্রা স্বস্তির হবে।
