আমি
যখন হাই স্কুলে পড়তাম, তখন আমার গ্রামের পথচলা আজকের দিনের মতো সহজ ছিল
না। শহরে যাওয়ার রাস্তা ছিল কাঁচা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। স্কুলে
যেতে হলে আমাদের দুইটি বাঁশের সাঁকো পার হতে হতো। এমনই একটি সাধারণ গ্রামে
আমার জন্ম।
গ্রামটি ছিল প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের প্রাণ। এখানকার মানুষ
ছিল পরিশ্রমী, আশাবাদী এবং সংগ্রামী। ছোটবেলা থেকেই খেটে খাওয়া মানুষের
জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
আমার বাবা ছিলেন একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পরিবারের প্রয়োজন
মেটাতে শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁকে কৃষিকাজও করতে হতো।
আমার গ্রামের নাম
সিদলাই যা কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় অবস্থিত। আমি দক্ষিণ সিদলাই
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। আমাদের গ্রামটি বড় হওয়ায় এখানে
চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি হাই স্কুল, একটি দাখিল মাদ্রাসা এবং
একটি ফাযিল মাদ্রাসা রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে আমি আমাদের গ্রামেরই
নাজনীন হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই।
আমি যখন নাজনীন হাই স্কুলে
পড়তাম, তখন সেখানে স্কাউটিং কার্যক্রম ছিল না। ১৯৯৬ সালে ব্রাহ্মণপাড়ায়
একটি জেলা স্কাউট সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় কুমিল্লা-৫
(বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও তৎকালীন মন্ত্রী অ্যাডভোকেট
আবদুল মতিন খসরু সেই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
আমরা অনেকেই তখন সেই স্কাউট
সমাবেশ দেখতে গিয়েছিলাম। স্কাউটদের শৃঙ্খলা, কার্যক্রম এবং তাদের
কর্মচাঞ্চল্য দেখে আমাদের মনে খুব ইচ্ছা হয়েছিলÑআমরাও যদি স্কাউটিংয়ের
সঙ্গে যুক্ত হতে পারতাম! কিন্তু আমাদের স্কুলে স্কাউট দল না থাকায় সেই সময়
স্কাউটিং করার সুযোগ পাইনি। তাই বলা যায়, স্কাউটিংয়ের শুরুটা আমার খুব
দৃশ্যমান বা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না।
আজ যারা কাব স্কাউট বা স্কাউট হিসেবে
কাজ করছে, তাদের অনেকেরই স্কাউটিং জীবনের শুরুটা ছিল খুব গৌরবময়। আমার
ক্ষেত্রে তা না হলেও আজ আমি বাংলাদেশ স্কাউটস কুমিল্লা জেলা রোভারের
সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এর কিছুটা হয়তো আমার যোগ্যতার কারণে
হয়েছে, আর বাকিটা মহান আল্লাহর ইচ্ছা। তাই এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরে নিজেকে
সত্যিই সৌভাগ্যবান মনে করি।
স্কাউটিংয়ে যতটুকু সময় দেওয়া সম্ভব, আমি
সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করি। যখনই স্কাউটিংয়ের জন্য সময় দেই, তখন মনে
হয় আমি একটি ভালো কাজ করছি। এই অনুভূতিই আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে। ২০০১
সালে আমি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে অনার্সে ভর্তি হই। সেখানেই
প্রথমবারের মতো সরাসরি রোভার স্কাউটিং করার সুযোগ পাই। আমার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ
বন্ধুÑমো. খালেকুজ্জামান, কাজী তাবারুকুল ইসলাম টিপু, মো. মনিরুজ্জামান
সাগর, মাজাহারুল আলম রাসেল, শরিফ উদ্দীন আহম্মেদ এবং গাউছে সামদানী
রিয়েলÑআমরা সবাই দীর্ঘ সময় একসঙ্গে রোভার স্কাউটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।
আমরা সবাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিবিএস (সম্মান) এবং এমবিএস একসঙ্গে সম্পন্ন
করি।
স্কাউটিং জীবনে আমরা অনেক ক্রু মিটিং করেছি। ক্রু মিটিং হলো রোভার
স্কাউটদের নিয়মিত বৈঠক, যেখানে আমরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি এবং
অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগও পাই। পাশাপাশি সমাজসেবামূলক নানা
কার্যক্রমে আমরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছি। ধীরে ধীরে স্কাউটিংয়ের সঙ্গে আমার
সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে এবং রোভার স্কাউটিং আমার খুব প্রিয় হয়ে ওঠে।
কুমিল্লা
ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ আমাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ দিয়েছে।
রোভারসহচরে ভর্তি হয়ে আমার ব্যাচ থেকে আমিই একমাত্র সিনিয়র রোভার মেট এর
দায়িত্ব পাল করে বের হই।
এখান থেকেই আমি নিজেকে স্কাউটিংয়ের জন্য
প্রস্তুত করতে পেরেছি। আমি সব সময় চেষ্টা করি স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে সমাজের
জন্য কিছু ভালো কাজ করতে। রোভার স্কাউটদের মূল লক্ষ্যই হলো সেবা করা। সব
সময়ই তারা ভালো কিছু করার জন্য প্রস্তুত থাকে। এই সেবার মনোভাব আমাদের সব
সময় অনুপ্রাণিত করে।
একদিন আমার এক বন্ধু, বাদল আহাম্মদ-যিনি বর্তমানে
সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের একজন ম্যানেজার-আমাকে স্কাউট পোশাকে দেখে জিজ্ঞেস
করেছিল, “তুই এখনো স্কাউটিংয়ের সঙ্গে আছিস?” সে আরও জানতে চেয়েছিল, আমার
স্কাউট জীবনের অভিজ্ঞতা কি আমার কর্মজীবনে কোনো প্রভাব ফেলেছে কিনা।
আসলে
জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে কাজে লাগে। স্কাউটিং
আমাকে নেতৃত্ব দিতে শিখিয়েছে, বিনয়ী হতে শিখিয়েছে এবং আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি
করতে সাহায্য করেছে। স্কাউটিংয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ সবার জন্য থাকে।
এখানে নেতা মানে বস নয়; নেতা মানে একজন মেন্টর। একজন নেতা তার সহকর্মীদের
সঙ্গে সুন্দর আচরণ করে, তাদের বোঝে এবং তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করে। এই
ধরনের নেতৃত্বগুণ তৈরিতে স্কাউটিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্কাউটিংয়ের
কাজের পদ্ধতি, কৌশল এবং প্রশিক্ষণ আমার ব্যক্তিগত জীবন ও চাকরিজীবনে অনেক
প্রভাব ফেলেছে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা, তাদের বোঝানো এবং একটি কাজে
তাদের সম্পৃক্ত করার দক্ষতা স্কাউটিং থেকেই অর্জন করেছি। স্কাউটিং আমাদের
আত্মমর্যাদাশীল হতে শেখায়। এটি সত্যকে অনুসরণ করতে শেখায়। আমরা অন্যের ভালো
গুণগুলো গ্রহণ করার চেষ্টা করি এবং সেগুলো নিজের জীবনে প্রয়োগ করি।
স্কাউটিংয়ের মূলনীতি ও প্রতিজ্ঞা যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করি, তাহলে আমাদের
জীবন স্বাভাবিকভাবেই শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসে।
স্কাউটিংয়ে সম্পৃক্ত থাকা
মানে শুধু কোনো সংগঠনের সদস্য হওয়া নয়। একবার স্কাউট হলে সারাজীবনই একজন
স্কাউট থাকা। স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ব্যাডেন পাওয়েল বলেছেন, ঙহপব ধ
ঝপড়ঁঃ, অষধিুং ধ ঝপড়ঁঃ।”
আমি ২০০৪ সাল থেকে স্কাউটিংয়ের সঙ্গে সরাসরি
যুক্ত আছি। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্কাউটিংয়ের বিভিন্ন স্তর
অতিক্রম করে কাজ করে যাচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্কাউটিংয়ের ধরনও বদলেছে।
আমরা এখন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি, তাই স্কাউটিং কার্যক্রমেও পরিবর্তন
এসেছে।
আজকের প্রজন্মের অনেক ছেলে-মেয়ে আছে যারা সবার সামনে কথা বলতে
পারে না, সহজে বন্ধুত্ব করতে পারে না বা সামাজিক পরিবেশে নিজেকে গুটিয়ে
রাখে। আমি অভিভাবকদের বলব-আপনার সন্তানকে স্কাউটিংয়ে যুক্ত করুন। এতে তারা
বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করবে, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করবে এবং অনেক নতুন কিছু
শিখবে।
স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে একটি শিশুর মধ্যে স্মার্টনেস তৈরি হয়,
নেতৃত্বগুণ বাড়ে, দায়িত্ববোধ তৈরি হয় এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
তাঁবুবাস, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন কার্যক্রম একজন স্কাউটকে বাস্তব জীবনের
জন্য প্রস্তুত করে।
একজন স্কাউট যেখানে যায়, সেখানে চারপাশ সম্পর্কে
সচেতন থাকে-কোথায় হাসপাতাল, কোথায় মসজিদ, কোথায় বাজার-এসব জরুরি তথ্য জানার
চেষ্টা করে। পরিবেশ, প্রকৃতি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখাই স্কাউটিংয়ের
বড় শক্তি।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি-স্কাউটিং এমন কোনো বিষয় নয়, যা
সরাসরি অর্থ উপার্জন বা চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু এটি একজন
মানুষকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই
লেখাপড়াকে সব সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি অবসর
সময়কে সৃজনশীলভাবে কাজে লাগানোর একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম হতে পারে স্কাউটিং।
যদি আমরা স্কাউটিংয়ের নীতি ও আদর্শ ধারণ করতে পারি, তাহলে আমরা শুধু
নিজেদের জীবনেই নয়, পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্যও ইতিবাচক অবদান রাখতে পারব।
ব্যাডেন
পাওয়েল বলেছেন, “তুমি পৃথিবীকে যেমন পেয়েছো, তার চেয়ে একটু ভালো রেখে
যাওয়ার চেষ্টা করো।” আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত-আজকের পৃথিবীকে আগামী
প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে রেখে যাওয়া। এজন্য প্রয়োজন সঠিক
নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ।
আমি বিশ্বাস করি, যদি আমাদের
তরুণ প্রজন্ম স্কাউটিংয়ের আদর্শ ধারণ করে, তবে তারা নিজেদের জীবন গড়ার
পাশাপাশি সমাজ ও দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তাই
অভিভাবকদের প্রতি আমার আহ্বান-আপনার সন্তানকে স্কাউটিংয়ে যুক্ত করুন এবং
তাদের ভালো কাজে উৎসাহিত করুন।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজ, বাগিচাগাঁও, কুমিল্লা।
