শনিবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৯ ফাল্গুন ১৪৩২
ফেব্রুয়ারি ও কুমিল্লা শান্তিরঞ্জন ভৌমিক
প্রকাশ: শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:৩৪ এএম |

ফেব্রুয়ারি ও কুমিল্লা শান্তিরঞ্জন ভৌমিকআমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি তা ভুলিতে পারি ?’
একুশে ফেব্রুয়ারি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি। সংগ্রাম সেদিন থেকে শুরু। পাকিস্তানিরা চেয়েছিল ‘বাংলাভাষা’কে অকার্যকর করতে, উর্দু ও ইংরেজিকে প্রাধান্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে প্রদমিত করে এককভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে নিজেদের চিরকালীন প্রতিষ্ঠা দিতে। বাঙালি অঙ্কুরেই বুঝে গিয়েছিল, তাই ২৩ বছর নানা পথে-নানা উপায়ে ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা লাভের দোরগোড়ায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মাথা উঁচু করে নিজস্ব পতাকা, নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীত, নিজস্ব মানচিত্র পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করে। সেদিনের প্রত্যয়ী ধ্বনিং ছিল-
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
বাঙালি চিরকালই সংগ্রাম জাতি। তাই ২০২৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাসের সিংহ চিহ্নিত বিজয় তোরণে কুমিল্লার দু’যোদ্ধার নামাঙ্কিত কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কারণ, ভাষা আন্দোলনের ডাক ও বিশে^ এ ডাকের মর্মাথ তো কুমিল্লার দু’কৃতী সন্তানই প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন।
ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার মাস, মাতৃভাষার মাস, বাংলা ভাষার মাস, বাঙালির গর্ব ও অহংকারের মাস। কুমিল্লাবাসীর কাছে এ মাসের গুরুত্ব সংগতকারণেই ভিন্নতর। ভিন্নতর এজন্য যে এ জেলার দুজন কৃতী পুরুষ এ ভাষার মাসকে গৌরবদীপ্ত করেছেন।
১৯৪৭ সালের জুন মাসে ইংরেজ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে তৎকালীন ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের কূটকৌশল হলো- ভারতবর্ষকে একক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা না দিয়ে তা দ্বিখণ্ডিত করে দেবে। এ পরিকল্পনায় ১৯৪৭ সালের অগাস্ট মাসে দু দেশের নবতর জন্ম হলো- ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের হল দুটি অংশ-পূর্ব ও পশ্চিম, ১২০০ মাইলের ব্যবধানে মাঝখানে বৃহৎ ভারত। পশ্চিম পাকিস্তানের ৫টি প্রদেশ, পূর্ব পাকিস্তান সমগ্রটি একটি প্রদেশ। সমগ্র পাকিস্তানের লোকসংখ্যার মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকসংখ্যা ৪৪%, পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা ৫৬%। ভাষাগত হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশের পৃথক পৃথক ভাষা, পূর্ব পাকিস্তানের মাত্র একটি ভাষা- বাংলা। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউল হক আনসারি এক প্রবন্ধে লিখলেন যে, যদি পাকিস্তান হয়- তবে তার রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়া উচিত। অথচ উর্দু পাকিস্তানের কোন অঞ্চলের ভাষা নয়। তাই তার প্রতিবাদে জ্ঞানতাপস ড. মুহুম্মদ শহীদুল্লাহ যুক্তি উপস্থাপন করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে এক জোড়ালো প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এ প্রবন্ধই লিখিতভাবে প্রতিবাদের প্রথম হাতিয়ার। তখনই আমরা জানতে পারি উর্দু কোনো বিশেষ অঞ্চলের ভাষা নয়, উর্দুর কোনো নিজস্ব হরফ নেই।
দেশ বিভাগ হলো। পাকিস্তান হলো। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশন বসলো। সেখানেই অধিবেশনের কার্যবিবরণীতে দেখা গেলো- গণপরিষদে কেবলমাত্র ইংরেজি ও উর্দুতে বক্তৃতা দেওয়া যাবে। কুমিল্লার কৃতী পুরুষ শ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিনীতভাবে বললেন যে, যেহেতু পাকিস্তানের ৫৬% লোকের ভাষা বাংলা, সেজন্য কার্যবিবরণীতে ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলা অন্তর্ভুক্ত করা হোক। প্রতিক্রিয়াশীলদের নগ্ন হস্তক্ষেপে তা নাকচ হয়ে যায়। তাঁকে অপমানিত করা হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নীরবে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন, কিন্তু এ বার্তাটি আগেই এ অংশে পৌঁছে যায়। প্রতিবাদের সূত্রপাত হয়। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ১৯৬২-র কুখ্যাত শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬-র ছয়দফা ঘোষণা, ১৯৬৯-র গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-র স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বাধীনতা লাভ। এসব ঘটনা দিবালোকের মত পরিষ্কার। এ আন্দোলন সংগ্রামের সাথে কাঁরা জড়িত ছিলেন, কাঁরা আত্মত্যাগ করেছেন, কাঁদের রক্তদানের বিনিময়ে আজ স্বাধীন দেশের মাটিতে অমিয় প্রাণশক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাতি তা সূর্যের মত উজ্জ্বল ও সত্য। সুতরাং কুমিল্লাবাসী শহীদধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ভুলবে কীভাবে। আমরা জানি- বটবৃক্ষের বীজ অতি ক্ষুদ্র, কিন্তু পরবর্তীতে তা হয়েছিল মহীরুহ। এ মহীরুহের বিস্তার ঘটিয়েছেন কুমিল্লার অপর কৃতী পুরুষ রফিকুল ইসলাম। জাতিসংঘের মাধ্যমে মাতৃভাষার চেতনাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের সহযোগিতায় ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে ১৮৮ দেশের অনুভূতিতে বাংলাদেশের একসময়ে অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগের মহিমাকে পৌঁছিয়ে দিতে সক্ষম হলেন এ কুমিল্লার বাঙালি সন্তান। সুতরাং গর্ব ও অহংকার নিয়েই বলতে পারি- বাংলাভাষার জন্য সূচনায় কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও বিস্তারে কুমিল্লার রফিকুল ইসলাম আজ প্রদীপ্ত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
৪৩ এসব প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি এলে কুমিল্লায় ভিন্নতর আবেদনে এ মাসটি নানা আয়োজনে উদযাপন করা হয়। গেল ২ বছর যাবত ‘তিন নদী পরিষদ’ ঐতিহাসিক জামতলায় নিরন্তর ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে আসছে। মুক্ত মঞ্চে, মুক্ত আয়োজনে, মুক্ত আলোচনায় কুমিল্লার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও স্কুল কলেজ উৎসাহে অংশগ্রহণ করে, এখন এক গণজাগরণের স্রোত সৃষ্টি করেছে।
কুমিল্লার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠান করে থাকে। ভিক্টোরিয়া কলেজের শহীদ মিনারের পাদদেশে কবিতা পাঠের আসর বসে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই মনে হয় কুমিল্লা নবজাগরণে উজ্জীবিত হয়।
তবে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে আমরা ক্ষোভও প্রকাশ করি। আজও শাহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করতে পারিনি, তাঁর স্মরণে স্মৃতিরক্ষার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারিনি, জাতীয় বীর হিসেবে, স্বাধীনতা প্রাপ্তির উষালগ্নে শহীদ হওয়া সত্ত্বেও মর্যাদাবান করে তুলতে পারিনি। শুধু ফেব্রুয়ারি এলে তাঁর নাম উচ্চারণ করি-সারা বছর স্পর্শ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করিনি- এ দায় আমাদের বহন করতে হবে। প্রজন্ম কিন্তু আমাদের ক্ষমা করবে না।
আজ বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লেখ আছে- ‘প্রজাতন্ত্রের ভাষা বাংলা’। বর্তমান ক্ষমতায় যাঁরা আছেন, তাঁরা ভাষা শহীদের রক্ততিলকধারী মুক্তিযুদ্ধ স্বপক্ষের উত্তর প্রজন্ম। পবিত্র সংবিধান অনেক কাটাছিঁড়া করা হয়েছে। ১৯৭২-র সংবিধানে ফিরে যাবেন কিনা জানিনা। কিন্তু বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় যাঁদের আত্মত্যাগে গৌরবদীপ্ত বাংলাদেশ, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধায় ও আপন দায়বদ্ধতায় অন্তত একটা কিছু স্মারক স্থায়ীরূপ লাভ করবে, কুমিল্লাবাসী তা প্রত্যাশা করে। কারণ ফেব্রুয়ারি মাস যে একমাত্র বাঙালির, বাংলাভাষীর- আমাদের।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
মহান একুশে ফেব্রুয়ারি
অমর একুশে আজ
প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের বিনম্র শ্রদ্ধায় মানুষের ঢল
প্রথম প্রয়োরিটি কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন
বরুড়ায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন গণ সংবর্ধনা প্রদান
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
আজ কুমিল্লা সফরে আসছেন মন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন
ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ হবে: মন্ত্রী ইয়াছিন
কুমিল্লায় ব্রয়লার মুরগির দাম দুই দিনে কেজিতে বাড়তি ২০ টাকা ধরলেন জেলা প্রশাসক
কুমিল্লার ইফতারি বাজারে জিলাপির দোকানে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি
কুমিল্লায় বিজিবির অভিযানে ৩৯ লাখ টাকারভারতীয় মোবাইল ডিসপ্লে উদ্ধার
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২