তন্বী শ্যামা শিখরদশনা বলতে যা বোঝায়,
তবে শ্যামা নন-রীতিমতো গৌরাঙ্গিনী। ধর্মসাগর পাড়ে যে বাড়িটিতে মায়ের সঙ্গে
গেলাম, তারই একতলার দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক মহিলা-কালিদাসের সংজ্ঞার
আধুনিক সংস্করণ। আমি তখন রীতিমতো খুদে, নয়-দশ বছর হয় কি না হয়। কিন্তু
আশেপাশের মহিলাদের সঙ্গে তফাৎটা বোঝার মতো বুদ্ধির অভাব হয়নি। আমার মা
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ করা বিদূষী মহিলা, কিন্তু অত্যন্ত সাদাসিধে
আটপৌরে পুরাঙ্গনা-এরকম ঝাঁ চকচকে চলনটা নেই।
মাকে দেখে উচ্ছ্বসিত
হাসিতে অভ্যর্থনা জানালেন। হাসিটা আন্তরিক ছিল, দেখে ভালো লাগল। ও বাড়িতে
তখন ফ্রক পরা তিন-চার বছরের ছোট একটি মেয়ে ছাড়া সেদিন আর কাউকে দেখিনি।
সেদিনই শ্রীময়ীর নাম জেনেছিলাম-প্রতীতি দেবী।
শ্রদ্ধেয় ধীরেন্দ্রনাথ
দত্তের পরিবারের সঙ্গে আমাদের জানাশোনা ও সখ্য বহুদিনের। দাদু, মানে
ধীরেন্দ্রনাথ, আমার মাকে কন্যাসম স্নেহ করতেন। ঠাকুমা সুরবালা দত্তকেও
দেখেছি আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন সময়ে। ধীরেন্দ্র-কন্যা খেলুদি (মনিষাদি) আমার
দাদা সুপ্রিয় সেনের সহপাঠিনী, সঞ্জীব কাকু আমার বাবার বৃত্তের ভেতরের
মানুষ। এই সঞ্জীব কাকু, যাঁর আরেক পরিচিত নাম ‘খেপু’। তাঁরই সহধর্মিণী
প্রতীতি দেবী।
এখানে একটা মজার ব্যাপার হলো-আমাদের এই দুই পরিবারের
মধ্যে সম্পর্কের কোনো পরম্পরা ছিল না। দাদুর মেয়ে দিদি, কাকুর বউ দিদি,
মাসিকে দিদি-যার যেমন সুবিধে ডেকে যাচ্ছে, অসুবিধে হচ্ছে না। এবং তাতে
দোস্তি বা সম্মান প্রদর্শনেও কোনো ঘাটতি হয়নি।
তারপর গড়িয়ে গেছে অনেকদিন।
প্রাপ্তে
তু ষোড়শবর্ষে-বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতীতিদির গণ্ডিতে ভিড়ে গিয়েছিলাম।
ততদিনে কলেজে উঠেছি, কিছুটা বুদ্ধিশুদ্ধি হয়েছে। তিনি আশকারা দিতেন ঠিকই,
কিন্তু রাশ টানতেও জানতেন। অভয় আশ্রমের পরিমল কাকুর কাছে মাঝেমধ্যেই গান
শিখতাম দুজনে। গানটা সুনিপুণভাবে তুলে নিয়ে অনুপম গায়কীতে পরিবেশন করতেন।
অত্যন্ত মখমলি এক কণ্ঠ ছিল তাঁর।
গৃহবধূ ছিলেন-বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য
দিয়েই যেতে হয়েছিল তাঁকে। কোনো শাস্ত্রীয় রেওয়াজ কিংবা কণ্ঠপোষকতার আয়োজন
ছিল না, তবু কোনো এক বিধাতার আশীর্বাদে সঙ্গীত তাঁর উপাসনার মাধ্যম হয়ে
উঠেছিল। মগ্ন হয়ে গাইতেন-বদলে যেত বাতাবরণ। তখন অন্য এক প্রতীতি দেবীকে
আমরা অনুভব করতাম। অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল সমভাবে মূর্ত হতেন তাঁর
পরিবেশনায়। সেকালে কোনো প্রচার ছিল না, কোনো রেকর্ড হয়নি। পূর্ব
পাকিস্তানের এক শহরে পড়েছিলেন; কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না। থাকলে মনে হয়
রবীন্দ্রনাথের মোহরের সমতুলনীয় হতেন।
ঘটক পরিবারের উত্তরাধিকার তো
ছিলই, ছিল অনায়াসলভ্য সহজাত এক প্রতিভা-যার উচ্চতায় তাঁকে ছোঁয়া যেত না।
অত্যন্ত প্রাণোচ্ছ্বল এক ব্যক্তিত্ব, সুরসিকা। ঐঁসড়ঁৎ কিংবা রিঃ-কোনোটারই
কমতি ছিল না। হাসতে জানতেন শালীন রসবোধে, হাসাতেও জানতেন অনায়াসে।
আরও
একটা দুর্লভ গুণ ছিল শ্রীমতি প্রতীতি দেবীর। রসবোধের পাশাপাশি অনায়াসলব্ধ
এক সাহিত্যপ্রতিভা ছিল, যার চর্চা তিনি কখনোই করেননি। আসলে একমাত্র সঙ্গীত
ছাড়া শিল্পের অন্য কোনো পরিমণ্ডলের সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল না-শুধু তাঁর
অনাগ্রহের কারণেই। অথচ লেখার হাত ছিল ঝরঝরে, চিত্রগ্রাহী। ঋত্বিক ঘটকের ওপর
তাঁর জমজ সহোদরার লেখা এক অসামান্য সংকলন-‘ভবি’র দৃষ্টিতে ‘ভবা’কে দেখা এক
অনন্য অভিজ্ঞতা, যা সাহিত্যজগতে বিরলতম অভিরম্য সংযোজন। বলা বাহুল্য,
ঋত্বিক ও প্রতীতির পরিবারদত্ত ডাকনাম ছিল ‘ভবা’ এবং ‘ভবি’।
মানুষের
সঙ্গে মিশতেন, তবে একটু ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে-শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি ন্যূনতম
মাত্রার প্রত্যাশায়। ছিল এক সংবেদনশীল হৃদয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় তার
স্পর্শ পেয়েছি বহুবার। আমার বাবা চলে গিয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে, মা-১৯৮৬-তে। সেই
দুর্বহ দিনে পরম মমতায়, ভালোবাসায় বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন নিখাদ উষ্ণতায়। নিজ
হাতে হাবিষ্য রান্না করে খাইয়েছিলেন-যা কখনো ভোলার নয়।
মৃত্যুর পরও দান করে গেছেন আপন দেহ, জনহিতার্থে-বাংলাদেশে যা এক বিরল নিদর্শন।
প্রতীতিদি,
তুমিও থাকোনি শেষাবধি; কিন্তু তোমার সান্নিধ্যের নির্মল হাওয়ায় উজ্জীবিত
হয়েছিল আমার অসংখ্য অবসর ও অনবসর। তোমার সেই নিরহংকৃত প্রাণরসকে জানাই আমার
সশ্রদ্ধ প্রণাম। আজ তুমি নেই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি পরিবেশনায়
কালের সীমারেখা পেরিয়ে তুমি চিরন্তনী হয়ে থাকবে-
“মৃত্যু নয়, ধ্বংস নয়, নহে বিচ্ছেদের ভয়-”
