
রাজার বড় ইচ্ছে দুধ খাবে।
কাজেই দুধের ব্যবস্থা হলো। রাজা মুখে দিয়ে বুঝলেন তা খাঁটি নয়। তাই
মন্ত্রীকে খাঁটি দুধের ব্যবস্থা করতে বললেন। মন্ত্রী খাঁটি দুধ পাবার জন্য
গোয়ালার গোয়ালে লোক নিয়োগ করলেন, তার দায়িত্ব গাভী দোহনের সময় উপস্থিত থেকে
তা তদারকি করা, গোয়ালা যে রাস্তা দিয়ে রাজবাড়িতে আসবে এ রাস্তায় তদারকি বা
পাহারা দিতে একজন নিয়োগ করা হলো, রাস্তায় যেন দুধে জল না মিশাতে পারে,
রাজবাড়ির গেইটে লোক রাখা হলো, যেন গোয়ালাকে ঠিক জায়গায় পৌছিয়ে দেয়। সুতরাং
খাঁটি দুধ পাওয়ার যখন সব ব্যবস্থা নেয়া হলো- মন্ত্রী রাজাকে জানালেন- আজ
থেকে খাঁটি দুধ খেতে পারবেন। গোয়ালার বাড়ি থেকে রাজবাড়ির অন্দরমহলের রান্না
ঘর পর্যন্ত পাহারার ব্যবস্থা হয়েছে। গোয়ালা ইচ্ছে করলেও আর জল মিশাতে
পারবে না। আজ রাজা খাঁটি দুধ খাওয়ার আনন্দে বিভোর হলেন। এক সময় যথানিয়মে
দুধের পাত্র রাজার সামনে আনা হলো। রাজা উৎফুল্ল হয়ে দুধের গ্লাসের উপর থেকে
যখন আভরণ সরালেন, দেখলেন দুধের গ্লাসে দুধের সাথে একটি চিংড়ি মাছও ভেসে
আছে। তারপরের ঘটনা আমার জানা নেই। অনুমান করি- যতজন লোক নিয়োগ হয়েছে, তাদের
তুষ্ট করতে মাথাপিছু যতটুকু দুধ তাদেরকে দেয়া হয়েছে, এ পরিমাণ জল মিশাতে
গিয়েই খালে-বিলের জলের সাথে চিংড়ি মাছটাও ভাণ্ডে চলে এসেছে। রাজার ইচ্ছে
পূরণ হলো না। হতভাগ্য রাজা।
আমি কিন্তু এদিক দিয়ে অত্যন্ত ভাগ্যবান। আমি
যখন স্কুলে পড়ি, তখন ইচ্ছে হয়েছিল- যদি এ স্কুলে শিক্ষকতা করতে পারতাম।
আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে যখন বাড়িতে কর্মহীন সময় কাটাচ্ছিলাম, আমার
বাবা যিনি ঐ স্কুলের তখন সহকারী শিক্ষক, অনেক অনুরোধ করে তাঁর পরিবর্তে
দু’মাস স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলাম।
ভিক্টোরিয়া কলেজে যখন পড়ি, গ্রাম থেকে
শহরে এসেছি, সিনেমা দেখতে সারাক্ষণ মন পড়ে থাকত। ইচ্ছে হলো- যদি সিনেমা
হলের গেইট কীপার হতে পারতাম, তবে প্রাণভরে সিনেমা দেখে জীবনটা সার্থক করতে
পারতাম। তবে এ ইচ্ছাটা ছিল সাময়িক। তবে আমি যে বাসায় থাকতাম, সে বাসার একজন
কর্তাব্যক্তি লিবার্টি সিনেমা হলের ম্যানেজার ছিলেন। তাঁর হাতে ধরা পড়ে
লাঞ্ছিত না হলেও বাঞ্ছিত ব্যবহার পাইনি। তবে আশ্বাস দিলেন- ভালো সিনেমা এলে
নিজে থেকেই ডেকে নিবেন। তাই ভালো বই আর আসে না, সুযোগও হয় না। অর্থাৎ
সিনেমা দেখাই নষ্ট হওয়ার মহা সড়ক, অযথা শিক্ষক পিতার টাকা-পয়সা খরচ- তা
অন্যায় নয়, পাপও। ইচ্ছার মৃত্যু ঘটল তখনই। তবে এ কলেজে যখন অনার্স পড়ি, তখন
এ কলেজের শিক্ষক হতে ইচ্ছে হলো। অসীমের অসীম কৃপায় এ কলেজে ১৬ বছর
শিক্ষকতা করার সৌভাগ্য হয়েছিল। ইচ্ছে পূরণ হলো। আমিযখন ১৯৮১ সালের মে মাসে
ভিক্টোরিয়া কলেজে সরকারি মহিলা কলেজ থেকে বদলি হয়ে বাংলা বিভাগে যোগদান
করি, বিভাগে তখন আমার তিনজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কর্মরত। তাঁরা হলেন শ্রদ্ধেয়
মরহুম অধ্যাপক কাজী নুরুল ইসলাম, মরহুম অধ্যাপক এ, কে ফজলুল হক ও মরহুম
অধ্যাপক আমীর আলী চৌধুরী। শিক্ষককে সহকর্মী হিসেবে পাওয়া সৌভাগ্যের ও
আর্শীবাদের। শিক্ষক হয়েও ছাত্রের অধিকারে অপূর্ণতাকে পূর্ণ করার সুযোগ
অফুরন্ত। যখনই কোনো জিজ্ঞাসা মনের মধ্যে ভীড় জমাত, বিনা দ্বিধায় হাতের কাছে
শিক্ষকের নাগাল পেয়ে যেতাম। উপলব্ধিটা হলো- প্রথাগত শিক্ষাজীবন শেষ হলেও
ব্যবহারিক ক্ষেত্রে যৌক্তিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য একজন নির্দেশকের
প্রয়োজন পড়ে, শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রায়শ সমস্যার ধারাবাহিকতায় তা মোকাবিলা
করতে হলে অভিজ্ঞ শিক্ষকের সহযোগিতাই তা পূরণ করতে পারে। আমার শিক্ষকতা
জীবনে এ সুযোগটি পেয়ে সৌভাগ্যবান হয়েছিলাম। শিক্ষকতা করতে গিয়ে সাধারণত
অনেকেই ব্যাকরণ, ভাষার ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, ধ্বনিতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলো
পড়াতে আগ্রহী হয় না। আমি এ ক্ষেত্রে নিজেকে অনীহার পক্ষে ঠেলে দেইনি। আমি
বুঝে গিয়েছিলাম-অভিভাবক শিক্ষকদের পাদমূলে বসে এখনই তা আয়ত্ত করতে পারলে
ভবিষ্যতে ছাত্রদের শিক্ষাদানে অসুবিধা হবে না। এ বিষয়গুলো হলো- প্রথাগত গান
গাওয়া বা গান শিক্ষার প্রাথমিকভাবে যেমন সুর-তাল-লয় জানার জন্য উচ্চাঙ্গ
সঙ্গীতের তালিম দিতে হয়, উল্লেখিত বিষয়গুলো হলো শিক্ষকতার জন্য উচ্চাঙ্গ
সঙ্গীত। এভাবে আমার ইচ্ছা পূরণ হয়েছিল।
একসময় ইচ্ছে হয়েছিল
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হই। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি অগ্রাহ্য হিসেবে বিবেচনা
করা হয়, তাহলো শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ফলাফল। আমার ফলাফল আহামরি নয়। তবে এরূপ
ফলাফল নিয়ে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন। একবার ১৯৬৯ সালে
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে সাক্ষাৎকার দিতে সুযোগ
পাই। সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জানতে পারি- অন্যতম প্রার্থী হলেন
হুমায়ুন আজাদ। তিনি সব পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ ও প্রথম শ্রেণিতে পাশ করেছেন।
বিশেষত বাংলা বিষয়ে অনার্স ও এম,এ শ্রেণিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন।
সুতরাং তাঁর চাকুরি হওয়াটা ছিল নিশ্চিত ও সময়ের ব্যাপার। পরে জানতে পারি-
হুমায়ুন আজাদের চাকুরি তখনও হয়নি। তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। প্রথম হয়েছেন
সাধারণ দ্বিতীয় শ্রেণি প্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাবশালী শিক্ষকের
স্ত্রী। সেই শিক্ষক ছিলেন সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানের অন্যতম সদস্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন, ড. এ, আর, মল্লিক, বাংলা বিভাগের প্রধান ও
কলা বিভাগের ডীন ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। তাঁরা এ কাজটি করেছিলেন। কাজেই
বুঝে গিয়েছিলাম যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য যে ইচ্ছা- তা আমার
ক্ষেত্রে কখনই পূরণ হবার নয়। তা তখনই ত্যাগ করেছিলাম।
ইচ্ছে হয়েছিল লেখক
হই। কলেজে শিক্ষকতা করতে গিয়েই লেখালেখি।পত্রিকায় দশটি লেখা পাঠালে ১/২টি
লেখা ছাপা হয়। কিছু নিরাশ হয়েইপাঠ্যতালিকা কেন্দ্রিক লেখায় বিশ বছর
কাটিয়েছি। ফলে সৃজনশীল লেখা আরলিখতে চেষ্টা করিনি। কিন্তু ততদিনে বুঝে গেছি
যে, সৃজনশীল লেখা ছাড়া একজনলেখকের আয়ু খুবই ক্ষীণ। বহু পণ্ডিতব্যক্তির
শ্রেষ্ঠ গবেষণাসমৃদ্ধ কাজের কথাজানি, ব্যক্তিটির অবর্তমানে আজ তা ম্রিয়মান।
শুধু তথ্যপুঞ্জিতে উল্লেখ্য থাকেন,অন্যের চৌর্যবৃত্তিতে অস্বীকৃতি গৌরবে
স্থান পেয়ে যান মাত্র।
তাই আমি শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করার পর
সৃজনশীল নয়, অনেকটা স্মৃতিকাতর আত্মজৈবনিক আদলে লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করি। এ
সামান্য প্রচেষ্টায় উপলব্ধি করেছি- মানুষের মনের কাছে, বোধের কাছে, যাপিত
বিশ্বাসের কাছে আসতে হলে লেখালেখির বিকল্প অন্য কিছু যেন নেই। তাতে আমার
ইচ্ছা পূরণের সর্বাঙ্গীন প্রতিফলন না ঘটলেও অপূর্ণতার বেদনায় কাতর হই না। এ
কাজটি যদি নির্মোহভাবে করা যায়, তবে অনাবিল আনন্দ পাওয়া যায়। আমি তো
পাচ্ছি। আবার কাউকে দেখছি- এ কাজটি নিষ্ঠার সাথে করেন ঠিকই কিন্তু কী যেন
পেতে চান। তখনই লোকটির ইচ্ছাপূরণের মধ্যে ঘাটতি এসে যায়। যাক বিষয়টি
অন্যের, আমার নয়। আমি পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ও অপাংক্তেয়। কষ্ট পাই তখনই
যখন আমার মাথায় পা রেখে উপরে কেউ কেউ উঠতে চায়। এরূপ মেকিপনাকে ঘৃণা করি।
ইচ্ছা
হয়েছিল- আমার একটি নিজস্ব ছোট্ট ঘর থাকবে, তাতে একটি লাইব্রেরি করব, নীরবে
পড়াশোনা করব। এ লক্ষ্যে বাংলা বিষয়ের উপর বেশ কিছু বই সংগ্রহ করেছিলাম,
১৯৭১ সালে আমার সংগৃহিত প্রায় তিন হাজার বই এর সংগ্রহটি থেকে একটি বইও ফেরৎ
পাইনি। তখন আমি চট্টগ্রামে রাঙ্গুনীয়া কলেজে চাকুরি করতাম। শুনেছি- সের
দরে বিক্রি করা হয়েছে, দোকানি তা ছিঁড়ে ছিঁড়ে পুটলি বেঁধেছে। সে অর্থাৎ যে
বিক্রি করেছে ও দোকানি আমার বই-এর সঙ্গে আমার প্রাণটাকেও ছিঁড়ে ফেলেছিল।
তারপর নতুন উদ্যমে আবার সংগ্রহের ভাণ্ডার বাড়াতে থাকি। তারপরও প্রথম যৌবনের
স্বাদের মতো প্রথম সংগ্রহটির কথা যখন মনে পড়ে, তখন কষ্ট পাই। বলে রাখি-
আমার অপূর্ণ ভাণ্ডারে এখন যা আছে তা দিয়ে আমার চলতে কোনো অসুবিধা হয় না,
অসুবিধা হলো- আমার ছোট্ট আস্তানায় তাদের নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে
কষ্ট হচ্ছে। সান্ত্বনা পাই এ ভেবে যে- ক্ষাণিকটা হলেও তো ইচ্ছে পূরণ হয়েছে
বা হচ্ছে।
আমি লেখক নই। কিন্তু লিখি এবং তা আমার ইচ্ছা পূরণের তাগিদে।
আর মাঝে মাঝে আমার শুভানুধ্যায়ীরা যখন আমার লেখার বিষয় উল্লেখ করে মিশ্র
প্রতিক্রিয়া জানান, তখন বুঝে যাই যে অন্তত কিছু ব্যক্তি তা মনোযোগ দিয়ে
পড়েন। তাঁদের উৎসাহ ও প্রেরণা আমার জন্য পাথেয়, তাঁদেরকে ধন্যবাদ, অভিনন্দন
ও কৃতজ্ঞতা জানাই। ইচ্ছা পূরণে সহায়ক শক্তি না থাকলে আমার মতো ক্ষীণজীবীরা
অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন- আমার ইচ্ছাগুলো কী সবই পূরণ হয়েছে?
ইচ্ছা পূরণ হলে বাঁচবার এত স্বাদ কেন? আরও বাঁচতে চাই কেন? এমন কতগুলো
ইচ্ছে আছে-যা কোনোদিন পূরণ হবার নয়। যেমন- একজন নারী চায়- তার ইচ্ছাগুলো
একজন পুরুষ পূরণ করুক। আর একজন পুরুষ চায়- তার ইচ্ছাগুলো অনেক নারী পূরণ
করুক। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছে পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা তো নেই। বলা হয়- সংসারে ইচ্ছে
পূরণের জন্য তাকেই সঙ্গী করবে- যে তোমাকে ভালোবাসে। তুমি যারে ভালোবাসো-
তাকে সঙ্গী করলে কপালে দুঃখ আছে। যে ভালোবাসে সে কেবলই দিতে চায়, পেতে চায়
না। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছে পূরণের আনন্দটাই অন্য রকম। যাক এখন আমার ইচ্ছে করছে-
মন্ত্রী পদ মর্যাদায় উপদেষ্টা হই। কারণ, আমি রাজনীতি করি না, নির্বাচনে
দাঁড়ালে পাশ করতে পারব না, কিন্তু দেশসেবা করতে চাই। তাই আমার এখন ইচ্ছা-
যদি এরূপ একটা পদ বা পদবাহী ক্ষমতা পেয়ে যাই, তা হলে দেশসেবাও হবে, ইচ্ছে
পূরণও হবে। জানি, সে গুড়ে বালি। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন- কেন দেশসেবা করতে
চাই। অনেক ভেবে দেখেছি-জনসেবা খুবই কঠিন কাজ, দেশসেবা তার তুলনায় সহজ ও
সরল। তাতে জনগণের কাছে যেতে হয় না, প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দিতে হয় না,
দায়বদ্ধতাও নেই। কাজেই জনসেবা থেকে দেশসেবাকেই বেছে নিয়েছি। দেশসেবা করতেই
ইচ্ছা করছি। এখন দেশসেবার জন্য রাজনীতি বা দলনীতি যারা করছেন, তারাই
রাজাধিরাজ। জনসেবার কথা কেউ বলছেন না, ভাবছেনও না। এতে ত্যাগের মহিমা নেই,
শুধু প্রাপ্তি আর প্রাপ্তি। জানি এ ইচ্ছে পূরণ হবে না। কারণ যেহেতু রাজনীতি
বা দলনীতি করি না, সুতরাং আমার ইচ্ছে পূরণের সমাধি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে
গেছে। তারপরও ভাবছি ইচ্ছে করলে জনসেবা করা যায়, দেশসেবা করতে না পারলেও
সেটাই হবে মহৎ কাজ। চলুন না এ অভিযত্রায় যার যার অবস্থান থেকে নির্মোহভাবে
এ কাজটি করি। আহবান রলো।
