অনিয়ম
ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে এবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়
শিক্ষার্থী সংসদ-জাকসু ভোট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সদস্য
অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার। শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে সাংবাদিকদের ডেকে
তিনি এই ঘোষণা দেন। ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার বিএনপিপন্থি
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।
পাঁচটি প্যানেল ও বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচন বর্জনের মধ্যে
মোট চারজন শিক্ষক নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ালেন।
এর আগে
বৃহস্পতিবার ভোটের দিন নির্বাচন নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচনি
দায়িত্ব থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক। তারা হলেন,
গণিত বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম ও অধ্যাপক
শামিমা সুলতানা।
ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার পর সকাল থেকেই বিভিন্ন দলের
প্রার্থীরা নানা অসংগতি ও অনিয়মের কথা বলছিলেন। কিন্তু ভোট কারচুপির সরাসরি
অভিযোগ কারও ছিল না। তারা কেন্দ্রে ভোটের চেয়ে ব্যালট বেশি যাওয়া,
প্রতিপক্ষের আচরণবিধি ভঙ্গ করা, জামায়াত সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে ব্যালট
পেপার ও ওএমআর মেশিন সরবরাহ করা, পোলিং এজেন্টের অনুমতি থাকলেও তাদের
প্রবেশে বাধা দেওয়া, ডোপটেস্টের ফলাফল না আসা, নির্বাচনকে ‘ম্যানিপুলেট’
করার নানা অভিযোগ আসছিল।
এর মধ্যে একে একে পাঁচটি প্যানেল ও স্বতন্ত্র
কয়েকজন প্রার্থীও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো ঘোষণা দেন। একটি প্যানেল থেকে
অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলা হলেও তারা নির্বাচন বর্জন না করার পক্ষে
অবস্থান দেন।
ভোট গ্রহণের পর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো জাকসু
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হয়নি। দ্রুত ফল ঘোষণার দাবিতে শুক্রবার সন্ধ্যার
দিকে জাকসুর সিনেট ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা৷
তার মধ্যেই অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন।
পদত্যাগের
কারণ বলতে গিয়ে অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার বলেন, নির্বাচনে অনেকগুলো
মারাত্মক ত্রুটি তিনি দেখেছেন। সেইসব ত্রুটি সংশোধনে তিনি নির্বাচন কমিশনকে
যেসব পরামর্শ বা মতামত দিয়েছেন সেগুলোকে রাখা হয়নি। তাকে বৃহস্পতিবার
থেকেই চাপ দেওয়া হচ্ছে তিনি যেন নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ না করে সব
কিছু মেনে নেন। নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক ছিল না এবং সেখানে লেবেল প্লেয়িং
ফিল্ড ছিল না বলেও জানান তিনি।
মাফরুহী সাত্তার বলেন, “নির্বাচন কমিশনে
আমার মতামত তুলে ধরে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। যখন আমি
কোনো মতামত দিয়েছি বা তুলে ধরেছি তখন তা বিভিন্নভাবে বা বিভিন্ন কারণে
পরিবর্তন করা হয়েছে।
“৩৩ বছর পরে একটি জাকসু নির্বাচন হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা ফলাফলটা চাচ্ছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে,
এই সমগ্র প্রক্রিয়া যেভাবে বিতর্কিত করা হয়েছে, যেভাবে প্রক্রিয়াগুলো
সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সর্বশেষ এই ত্রুটিগুলো দূর করার জন্য যে পদক্ষেপ
নেওয়ার জন্য বলা হযেছে তার কোনোটাই গ্রহণ করা হয়নি।”
নিজের পদত্যাগের
সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে এই অধ্যাপক বলেন, “আজ বিকাল ৪টায় প্রধান নির্বাচন
কমিশনার সভা ডাকেন। এক পর্যায়ে আমি আসরের নামাজ পড়তে গেলাম। এসে দেখি ভোট
গণনা শুরু হয়ে গেছে। আমি কমিশনকে বারবার বলেছি যে, যে অভিযোগগুলো উত্থাপন
হয়েছে সেদিকে দৃষ্টিপাত করে আপাতত গণনা বন্ধ রাখা হোক। শিক্ষার্থীসহ
সারাদেশ যে সুষ্ঠু স্বচ্ছ জাকসু চেয়েছিল আমরা সেদিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আমি সেটাতে ব্যর্থ হয়েছি।
“আমি নির্বাচনে অনেকগুলো মারাত্মক
ত্রুটি দেখেছি। যেগুলো আসলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটাকে প্রশ্নবিদ্ধ
করেছে। এরকম পরিস্থিতিতে আমি, নির্বাচন কমিশনের সকলে এই বিষয়ে একমত হলেও
বিশেষ কিছু কারণে তারা আমার যে মতামত সেটাকে গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
সে কারণে আমি যখন আসরের নামাজ পড়ে এসে দেখেছি আমার মতামত সুরাহা না করেই
গণনা শুরু হয়ে গেছে তখন আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আমার দ্বিমত
লিখিতভাবে জানিয়েছি।”
আপনি নির্বাচনের অনেক পরে এসে কেন এমন কথা বলছেন
জানতে চাইলে এই অধ্যাপক বলেন, “আমরা সবাই মানুষ, আমাদের সবার আশা থাকে। যখন
সেই জায়গাটা চলে যায়ৃ । আগামীকাল বা পরশু ফল প্রকাশের পরে বললে আপনারা
হয়তো বলতেন ফল প্রকাশের পর কেন বললেন।”
সুনির্দিষ্ট কী কারণে বা কোন
ত্রুটি সংশোধন না করতে পেরে তিনি পদত্যাগ করলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনই
তিনি এসব বলতে চান না। ভবিষ্যতে সময়-সুযোগ পেলে বলবেন।
আপনি
বিএনপিপন্থি শিক্ষক, বিএনপি যেহেতু এই ভোট প্রত্যাখ্যান করেছে আপনি সে
কারণেই করছেন কি-না জানতে চাইলে এই শিক্ষক বলেন, “আমি বিএনপি করি না। আমি
অবশ্যই স্বাধীন নাগরিক হিসেবে একটি আদর্শে বিশ্বাস করি এবং সেই আদর্শের
সংগঠনের সঙ্গে জড়িত আছি।”
