- ধারণক্ষমতার বেশি অটোরিকশা ইজিবাইক
- রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে হকার
- ট্রাফিক পুলিশে জনবলের চরম সঙ্কট

কুমিল্লা নগরীতে যানজটন নিরসন নিয়ে সব সময়ই ‘প্রহসন’ করা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিকরা। দীর্ঘ এক দশক ধরে জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসক যে-ই থাকুক না কেন কেউ ই সমস্যার সমাধান করতে পারে নি। বরং যানজট নিরসনে বিভিন্ন সময় নানান সভা, সেমিনার, সড়ক বিভাজন, উচ্ছেদ ও শৃঙ্খলা অভিযানের নামে নানান কর্মযজ্ঞ চালানো হলেও তা বারবারই ব্যর্থ হয়েছে। এসব কার্যক্রম নাগরিকদের মনে সাময়িক স্বস্তি দিলেও বাস্তবে তা প্রহসনেই রূপ নিয়েছে। নগরীর অটোরিকশা ইজিবাইক নিয়ন্ত্রন যেমন সম্ভব হয় নি-বরং দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে। নাগরিকদের দাবি, প্রশাসন যেহেতু কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না- তাই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মানুষে পাশে দাঁড়ানো উচিত।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে মোট ১১০ কিলোমিটার পাকা সড়ক রয়েছে, ৫ কিলোমিটারের মত কাঁচা সড়ক রয়েছে। নানান অনিয়মের কারণে এসব সড়কের অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় যানজট নিত্য দিনের ভোগান্তি। ছুটির দিনেও যানজটের কবলে পরতে হয় সাধারণ মানুষকে। অবৈধ পার্কিং, অবৈধ দোকানপাট ও হকার, মাত্রারিক্ত ইজিবাইক ও অটোরিকশার বিশৃঙ্খলা, সড়ক নির্মান ও মেরামত, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পুলিশের জনবলের অভাব এবং সচেষ্টার অভাবে এই যানজটের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাচ্ছে না সাধারণ নাগরিকরা। প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে চেয়ে মানুষ এখন অধৈর্য্য হয়ে উঠছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, কুমিল্লা নগরীতে ধারন ক্ষমতার অন্তত ৫গুণ বেশি যানবাহন চলাচল করে। এর বেশির ভাগই বৈদ্যুতিক অটোরিকশা ও ইজিবাইক। যেসব যানবাহনের কোন লাইসেন্স নেই। সিটি কর্পোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের তথ্য মতে, কুমিল্লা নগরীতে ৩০ হাজারেরও বেশি অটোরিকশা ইজিবাইক চলে। যা অবৈধভাবেই চলাচল করে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আর এই অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা ইজিবাইকই যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি কুমিল্লা মহানগরীর যুগ্ম সমন্বয়ক ইঞ্জি. মুহাম্মদ রাশেদুল হাসান ‘যানজট নিরসনে অভিযানের নামে প্রহসন চলে’ মন্তব্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই শহরে মেয়র আসে মেয়র যায়, প্রশাসক আসে প্রশাসক যায়, এই শহরের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। প্রায় প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা অপচয় হয় কয়েক লক্ষ নাগরিকের। একটা ধাঁধাঁর মধ্যে রয়েছে নগরীরর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে নানা রকম সলিউশন দেওয়া হলেও ডিসি, সিটি প্রশাসক, ট্রাফিক পুলিশ করো যেন ভ্রুক্ষেপ নেই। মাঝে মাঝে অভিযানের নামে চলে প্রহসন।
গেলো কয়েকদিনে কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ভয়াবহ যানজটের চিত্র। বিশেষ নগরের কান্দিরপাড় থেকে পুলিশ লাইন্স সড়ক, টমছমব্রিজ সড়ক ও রাণীর বাজার সড়কে দীর্ঘ যানজট লেগেই থাকে। এছাড়াও নগরীর রাজগঞ্জ, চকবাজার, মোগলটুলি, ফৌজদারী মোড়, পুলিশ লাইন্স, বাদুরতলা, সালাউদ্দিন মোড়, টমছমব্রিজ, শাসনগাছা, বাদশা মিয়ার বাজার, রেইসকোর্স, রানীর বাজার বেশ কয়েকটি স্থানে যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। এসব এলাকায় সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা/১০টা পর্যন্ত তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে থেমে থেমে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেলো কয়েকমাসে কুমিল্লা শহরে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ইজিবাইকের সংখ্যা অন্তত ৫ গুণ বেড়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নগরজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো এবং পরিবহণের কারণেই বিভিন্ন এলাকায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়াও নগরীর বেশ কয়েকটি স্থানে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্ট্যান্ড। এসব এলাকায়ও যানজট নিত্য চিত্র। সড়ক দখল করে গাড়ি পার্কিং, যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রী রেখে সড়ক দখল, ফুটপাত দখল করে হকারদের বাণিজ্যের কারণে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকার একরম অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
নুরপুর এলাকার বাসিন্দা নাছির উদ্দিন বলেন, রবি থেকে সোমবার সকাল সন্ধ্যা চকবাজার থেকে কান্দিরপাড় যেতে ৪৫ মিনিট সময় লেগে যায়। চকবাজার বেবী স্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড, এরপর রাজগঞ্জ বাজার এবং মনোহরপুর মাতৃভান্ডারের সামনে থেকে লিবার্টি মোড় পর্যন্ত যানজট থাকবেই। রাস্তার দুই পাশে যে হকার বসে তারাইতো যানবাহন চলাচলের দুই লেনের জায়গা দখল করে রাখে, ফুটপাতেও হকার থাকার কারনে মানুষ রাস্তা দিয়েই হাঁটে। আর এই যানজট লাগে।
তিনি আরো বলেন, একবার যানজট লাগলে- তা ছুটানোর কেউ থাকে না। ট্রাফিক পুলিশ কই থাকে, জানি না। ওইদিকে রাজগঞ্জ মোড় থেকে মুরগিবাজার গেইট পর্যন্ত আর হাইস্কুলের সামনে থেকে মোগলটুলী-গাংচর রোডে একবার যানজট লাগলে- ভোগান্তির শেষ থাকে না।
টমছব্রীজ এলাকার বাসিন্দা জুলকারনাইন জাকি বলেন, টমছম ব্রীজ থেকে কোটবাড়ি সড়কে দুই পাশে সিএনজি আর বাজার রাস্তা দখল করা, কান্দির পাড়ের দিকে অটো-সিএনজি রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করায়, ইবনে তাইমিয়া স্কুল সড়কের ভাঙ্গাচুরা আর সড়ক ভবনের সামনে যাত্রীবাহী বাস ইউটার্ন করে- সব মিলিয়ে এই জায়গার যানবাহনের বিশৃঙ্খল অবস্থা কি দাঁড়ায়-এপথে যারা আসা যাওয়া করে তারাই বলতে পারবে। কিন্তু এই জায়গায় যানজট নিরসন করবে টা কে ?
তিনি আরো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সালাউদ্দিন মোড়েও যানজট থাকে, শিক্ষাবোর্ডের সামনেও। যানজট যখন দীর্ঘ হয়, তখন ট্রাফিক পুলিশ আসে যানজট ছুটাতে। এটা কোন কথা হতে পারে না।
কুমিল্লার বিশিষ্ট সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম শান্ত বলেন, একটি নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা এভাবে চলতে পারে না। যানজটের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। জ্যামে জ্যামে বসে বসে মানুষের কর্মঘন্টা নষ্ট হয়। এই নগরীর সড়কে যদি এখনি শৃঙ্খলা না ফেরানো যায়- দিন দিন এশহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এখনি যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রন যেমন দরকার, তেমনি রাস্তাঘাটও বাড়ানো প্রয়োজন। প্রতিটি রাস্তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। হাঁটার জন্য ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত রাখতে হবে।
তিনি জেলা ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাদের আছে ক্ষমতা আছে- তারা চাইলেই মানুষের উপকার করতে পারেন। শুধু মাত্র কাগজ কলমের দায়িত্বের বাইরে এসেও মানবিক দায়িত্ব থেকেও যদি উনারা দায়িত্ব পালন করেন- কুমিল্লার নাগরিকরা স্বস্তি পাবেন। এখন কোন প্রভাবশালী ক্ষমতার অপব্যবহার করার কথা নয়- তারপরও প্রয়োজনে, তারা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দেরও সহযোগিতা নিতে পারেন।
কুমিল্লা জেলা ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সারোয়ার মোঃ পারভেজ বলেন, যেখানে পুরো জেলায় অন্তত ২শ জন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য হলে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। সেখানে আমার মোট জনবল আছে মাত্র ৭৯ জন। নগরীতে আমাদের যে জনবল তা খুবই অপর্যাপ্ত। এই কম সংখ্যক জনবল দিয়ে যানজট নিরসন করার চেষ্টা আমরা করি।
তিনি আরো বলেন, শহরের সড়কে সিএনজি, অটোরিকশা ইজিবাইক নিয়ন্ত্রন না করলে যানজট নিরসন কষ্টসাধ্য।
কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন জানান, যানজট নিরসনে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের একটি কমিটি আছে - তারা কাজ করছেন। আমরা শুধু সাধারণ মানুষ হাঁটার জন্য ফুটপাত দখল মুক্ত করে দিতে অভিযান পরিচালনা করতে পারি এবং সেটি পরিচালনা করছি।
তবে এসব অভিযানও কোন ফল দিচ্ছে না এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আমরা উচ্ছেদের কাজ করছি। আমাদের অন্যান্য কাজও রয়েছে।