গাজী জাহাঙ্গীর আলম জাবির, বুড়িচং।।
কুমিল্লার
বুড়িচং উপজেলার কংশনগর বাজার। জেলার অন্যতম বৃহৎ এই বাজারে প্রতিদিন শত শত
বিক্রেতা বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। হাজার হাজার পাইকার ও খুচরা
ক্রেতার ভীড়ে বাজারটি সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মুখরিত থাকে। তবে
ইজারাদারের বেপরোয়া খাজনা আদায়ে চরমভাবে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে
বিক্রেতারা, আর ক্রেতারা বাধ্য হচ্ছে অতিরিক্ত মুল্যে পণ্য কিনতে। মাস শেষে
ইজারাদারের পকেটে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। দিনের পর দিন এই নৈরাজ্য চালালেও
প্রশাসনের নিরবতায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীসহ ক্রেতা সাধারণ।
সর্বশেষ গত ২৬
জুলাই বাজারে কবুতর বিক্রয়কারী থেকে খাজনা আদায় নিয়ে ৩ দফা দু’পক্ষের
সংঘর্ষ বাধেঁ। এতে দু'গ্রুপের অন্তত ৮/১০ জন আহত হয়।
সংঘর্ষে আহত কবুতর
বিক্রয়কারী জানান, ১০ টাকার খাজনা ৫০ টাকা দিয়েছি তবুও তারা ৭০ টাকা চায়।
আমি আরো ২০ টাকা না দেয়ায়, তারা আমার উপর চড়াও হয়ে মারধর করে। পরে এ নিয়ে
সালিশ দরবারে বসলে তারা এখানেও আমাদের উপর আক্রমণ করে।
কংশনগর বাজারটি
কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের উত্তর ভারেল্লা ইউনিয়নে অবস্থিত। বাজারটির
অবস্থান সড়কটির কোল ঘেষে দু’পাশজুড়ে। ধান, পাট, আখ, ভূট্টা, পশু খাদ্য,
প্রায় সব ধরনের তরিতরকারি, মাছ, মুরগী, মিষ্টি জাতীয় পণ্য, মাটির তৈসজপত্র,
হাড়ি-পাতিল, এলমুনিয়াম, কাচেঁর, ষ্টিলের সকল প্রকার ব্যবহার্য জিনিস, শিশু
খাদ্য, পশু খাদ্য, ভাসমান কাপড়, বুট-বাদাম সহ এমন কোন পণ্য নেই যা এই
বাজারে খুচরা বা পাইকারী বিক্রি হয় না।
সরেজমিন বাজার ঘুরে ভাসমান
বিভিন্ন পণ্যের দোকানীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইজারাদার ১৪৩২ সালে
দরপত্রের মাধ্যমে এই বাজারটি থেকে খাজনা আদায়ের অনুমতি পায়। সরকার
নির্ধারিত দরপত্রে অংশ নিয়ে প্রায় ৫৮ লাখ টাকায় বাজারটি ইজারা নেয়।
নাম
প্রকাশে অনিচ্ছক একাধিক ব্যবসায়ী/বিক্রেতা জানান, ২০/৩০ বছর ধরে ব্যবসা
করছি, আগে কোনদিন এত খাজনা দিতে হয়নি। এসময় বিক্রেতারা জানান, মূলত শনি ও
বুধবার এই দু’দিন কাগজে-কলমে সাপ্তাহিক বাজার হলেও প্রতিদিনই এখন বাজারটি
চালু রয়েছে। এমতাবস্থায় ইজারাদার কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে দু’ধরনের খাজনা
নির্ধারন করেছে। অর্থাৎ শনি ও বুধবার এক রকম, বাকী দিন কিছুটা কম খাজনা
আদায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুত্র আরো জানায়, এ বাজারে এমন কোন নিত্য
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেই যা পাওয়া যায় না। এসব বিবেচনা করে ইজারাদার তার
খাজনা আদায়ে ঝামেলা মুক্ত থাকতে বাজারটিকে মোট ২৮টি ভাগে বিভক্ত করেছেন।
যেমন মাছ, শুটকি বাজার, মুরগী, গোস্ত বাজার, তরিতরকারি বাজার, কবুতর বাজার,
হোগলা-চাটাই বাজার, ধান বাজার, পিয়াজ-রসুনসহ মসল্লা বাজার, ফল বাজার,
পুরাতন কাপড়, লুঙ্গী বাজার, ভাসমান হাঁস-মুরগী বাজার, ভাসমান ফেরিওয়ালা
ইত্যাদি। আর এসব প্রত্যেকটি বাজার থেকে খাজনা আদায়ে আলাদা আলাদা লোক নিয়োগ
বা সাব কন্ট্রাক্ট দিয়েছেন। তারা কাক ডাকা ভোর থেকে বাজারে খাজনা আদায় শুরু
করে। একাধিক ব্যবসায়ী সুত্র জানায়, এই বাজারে পাইকার, খুচরাসহ বিভিন্ন
পণ্য বেচা-কিনা করছে কমপক্ষে ৪’শর অধিক দোকানী। বাজারে মাছের আড়ৎ ১১ টি।
সাপ্তাহিক হাটে ৫০-৬০ জন দোকানী খোলা আকাশের নীচে মাছ বিক্রি করলেও
অন্যান্য দিন সেটা গড়ে ১৫-২০ জন। এসব মাছ বিক্রেতাদের কাছ থেকে সরকারীভাবে
সর্বোচ্চ ৭৫ টাকা খাজনা আদায়ের নির্দেশনা থাকলেও সাপ্তাহিক বাজারে
ইজারাদার নিচ্ছে ৪’শ টাকা করে অন্য দিনগুলোতে ৩’শ টাকা। প্রতিটি ভাসমান
দোকানী থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০-১’শ টাকা, গরু’র গোাস্তের দোকান থেকে ২’শ ৪০
টাকা, স্থায়ী দোকান থেকেও ১’শ – ১৫০ টাকা, গলায় ঝুলিয়ে বুট-বাদাম
বিক্রেতারাও ২০-৩০ টাকা না দিলে ইজারাদারের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ফলে
সরকার বিভিন্ন পণ্যের উপর যে খাজনা নির্ধারন করেছে, সেটাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী
দেখিয়ে ৫/১০ গুণ অতিরিক্ত খাজনা আদায় করছে প্রতিটি বিক্রেতার কাছ থেকে ।
যার ফলে বিক্রেতারা অধিক মুল্যে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে, প্রভাব পড়ছে
ক্রেতাদের উপর। অথচ সরকার চাউলের দোকান খুচরা ৮ টাকা, ধানের দোকান পাইকারী
মন প্রতি ১০ টাকা, আমের চাটাই ১১ টাকা, আনারসের চাটাই ২০ টাকা, কলার বড়
দোকান ১৫ টাকা, বিভিন্ন ফলমুলের বড় দোকান ১৫ টাকা, বাজেমালের দোকান
খোলাস্থানে ১৪ টাকা, পানের বড় দোকান ১৪ টাকা, মাছ-শুকনো মাছ, কচ্ছপ বড়
দোকান ৩৩ টাকা, হাস, মুরগী খাচা প্রতি ক্রেতা ১৩ ও বিক্রেতা ৮ টাকা, চাই,
আনতা, চাটাই, বাশের তৈরী জিনিসপত্র বড় দোকান ১৪ টাকা, আখের দোকান ১৫ টাকা,
পান-সুপারির দোকান ২৫ টাকা নির্ধারন করেছে। কিন্তু ইজারাদার সর্বনিম্ন ৭০
থেকে ১৫০ টাকা ভাসমান দোকানীদের কাছ থেকেই নিচ্ছে। আর এভাবেই মাস শেষে
ইজারাদার লক্ষ লক্ষ অতিরিক্ত টাকা খাজনার নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লুটে
নিচ্ছে। যার মাসুল দিচ্ছে ক্রেতারা অতিরিক্ত পন্যে মালামাল কিনে।
বিষয়টি
জানতে চাইলে বাজারের ইজারাদার খোরশেদ আলম জানান, উপজেলা প্রশাসন থেকে
আমাকে নির্ধারিত খাজনার কোন তালিকা দেইনি, আমরা কোন অতিরিক্ত খাজনা আদায়
করছি না । অভিযোগ সত্য নহে।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ
তানভীর হোসেন জানান, সরকারী বিধিমোতাবেক খাজনা আদায় করতে হবে। অতিরিক্ত
নেওয়া যাবে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। আমরা মনিটরিং করবো। বাজারে লিফলেট
বিতরন করবো খাজনার তালিকা দিয়ে, যেন অতিরিক্ত খাজনা নিতে না পারে।
