জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির দশম বৈঠক। বৈঠকে তরুণ প্রজন্মের কল্যাণ, জনস্বার্থ নিশ্চিত করা এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী সংবিধান প্রণয়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আইনি দলিল নয়, এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো, নাগরিক অধিকার এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তি। তাই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ হতে হবে দূরদর্শী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনগ্রাহ্য।
কিন্তু সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে সংসদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকা বিএনপির অবস্থান, সংস্কার যা হওয়ার তা সংসদের ভেতরেই হতে হবে। সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা কিংবা সংশোধনী বিল উত্থাপনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যেতে পারে। দলটি জুলাই সনদের কয়েকটি মৌলিক প্রস্তাবের সঙ্গেও একমত নয়। বিশেষ করে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করার কিছু নির্দিষ্ট ফর্মুলা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। বিএনপি তাদের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংসদকে কার্যকর করার কথাও বলে আসছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় ঐক্যের অবস্থান ভিন্ন। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ ও দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, গণভোটে জনগণ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সংবিধান সংস্কারের দাবিতে তারা দেশব্যাপী লংমার্চ কর্মসূচিও পালন করছেন।
সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণ, একই ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রপতির কিছু ক্ষমতা বৃদ্ধি। পাশাপাশি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার অধিকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নির্ধারণের বিষয়ও রয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম ও জাতীয় পরিচয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও আলোচনার বাইরে নয়। প্রতিটি প্রস্তাবের সঙ্গে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রশ্ন জড়িত।
এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন বিএনপি বিরোধী দলকে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছে। দলটির বক্তব্য, জুলাই সনদে তাদের যেসব নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলোর পরিবর্তন চাইলে আলোচনার মাধ্যমেই তা করতে হবে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, মতপার্থক্য নিরসনের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ আলোচনা। সংবিধান সংশোধনের মতো মৌলিক বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যেমন ভবিষ্যতে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, তেমনি রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে প্রয়োজনীয় সংস্কার আটকে রাখাও কাম্য নয়।
আলোচনার জন্য প্রয়োজন ছাড় দেওয়ার মানসিকতা। হেনরি কিসিঞ্জার তার ‘হোয়াইট হাউস ইয়ার্স’ বইতে লিখেছেন, যেসব আলোচকের ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নেই, তাদের আলোচক হিসেবে উপযুক্ত বলা চলে না। কথাটি বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার মানসিকতা নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। কোনো পক্ষের সব প্রস্তাবই যে গ্রহণ করতে হবে, তা নয়; বরং যুক্তি, জনমত ও জাতীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সংবিধান কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি পুরো জাতির। আজকের রাজনৈতিক সমঝোতার ঘাটতি আগামী দিনের সাংবিধানিক সংকটের কারণ হতে পারে। তাই দলীয় জয়-পরাজয়ের হিসাবের ঊর্ধ্বে উঠে এমন একটি সংবিধান সংশোধন-প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ সংকুচিত করবে এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত রাখবে। শেষ পর্যন্ত দলীয় অবস্থান নয়, জাতীয় স্বার্থই হোক সংবিধান সংশোধনের প্রধান বিবেচনা।
