বারবার জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম (এলপিজি) গ্যাস খাতের অব্যবস্থাপনা সামনে এসেছে। এমনিতেই নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। তার ওপর এলপিজির দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি জনজীবনে নতুন করে দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। গত সোমবার দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দর সোমবার রাত ৮টার পর থেকে কার্যকর হয়েছে।
বিইআরসি নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা করেছে। গত অক্টোবরেও ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। তার পরও ভোক্তাদের ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা প্রতি সিলিন্ডারে বেশি দিতে হতো। এমন অস্থিরতার মধ্যেই বিইআরসি ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে।
একই আদেশে অটোগ্যাসের দামও প্রতি লিটার ৮৪ দশমিক ৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯১ দশমিক ৯৫ টাকা করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে যানবাহনে ব্যবহৃত প্রতি লিটার গ্যাসের দাম ছিল ৭৩ দশমিক শূন্য ৯ টাকা। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে বিক্রেতাদের কমিশনও। বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানিকারক, ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর কারণে এ দাম বাড়ানো হয়েছে।
ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, দাম বাড়ানোর কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বেশি দামে বিক্রির লক্ষ্যে এলপিজি সরবরাহ আটকে রাখছেন। অথচ বিইআরসি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ভোক্তাদের বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। দেশে এলপিজির গ্রাহকসংখ্যা ১ কোটিরও বেশি। এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় রান্নার কাজে। এর পাশাপাশি শিল্প ও পরিবহনে এলপিজি ব্যবহার করা হয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানান, বিইআরসি গণশুনানির পর এত দ্রুত সবার মতামত মূল্যায়ন সম্পন্ন কীভাবে করেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা ভোক্তাদের ব্যয়ের চাপ থেকে ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা আগে দেখেছে। এমনভাবে বারবার দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
নতুন করে এলপিজির দাম বাড়ার ফলে ভোক্তাদের বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হচ্ছে। বিইআরসির দাবি, ভোক্তা পর্যায়ে সহনীয় বিবেচনা করেই এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন কথা হলো, সব ভোক্তার পক্ষে কি এ দাম সহনীয়? বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ সংকটে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। এর ওপর এলপিজির বারবার মূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অসহনীয় চাপ। এ ছাড়া সিলিন্ডারপ্রতি অতিরিক্ত মূল্য বা গ্যাস না পাওয়া, কম ওজন- এ রকম অভিযোগ সামনে আসছে। এ অবস্থা প্রতিকারে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তাই এ সমস্যা নিরসনে কর্তৃপক্ষকে বিক্রয়কেন্দ্রে মূল্যতালিকা প্রদর্শন ও রসিদ প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া কৃত্রিম সংকট বা সরবরাহের ঘাটতি সৃষ্টি করে যারা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, সেসব অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। আশা করছি, সরকার ভোক্তাদের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এলপিজির বর্তমান সংকট নিরসনে উদ্যোগী হবে।
