জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, বাংলাদেশের জন্য এটি ক্রমেই ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা ও আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে। এর ফলে প্রতিবছর স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সম্প্রতি ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ, হেলথ সিস্টেম অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক পলিসি ডায়ালগে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এই ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ তাপপ্রবাহ। অতিরিক্ত গরমের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ১৯৯০ সালের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি খাত। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন একদিকে মানুষের কর্মক্ষমতা ও আয় কমাচ্ছে, অন্যদিকে খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শুধু অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে দেশে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তীব্র গরমে হৃৎপিণ্ড ও কিডনির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, শ্রমজীবী ও আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে বছরে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার মধ্যে ১ বিলিয়ন থেকে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সরাসরি পর্যবেক্ষিত জলবায়ু উষ্ণায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এত বড় সংকটের বিপরীতে সরকারি বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য। জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট সরকারি বাজেটের মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশ পায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। তার ওপর বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও বাস্তবায়ন নিয়েও ঘাটতি রয়েছে।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই রোগীদের পকেট থেকে মেটাতে হয়। ফলে জলবায়ুজনিত অসুস্থতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন দেখা দিলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকটে পড়ে।
আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত এক দশকে বৃষ্টিপাতের ধরন ও ঋতুচক্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। চলতি অক্টোবর মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টি না হলে বায়ুদূষণ বাড়ে, যা শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শীতকালে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রার আকস্মিক পতন ঘটছে। তাপমাত্রার দ্রুত ওঠানামায় শিশু ও বয়স্করা বিশেষভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পোলট্রি খামার ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতেও।
এই বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয় বা দুর্যোগব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য, কৃষি, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করে স্থানীয় বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় ‘ক্লাইমেট অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়ন করা যেতে পারে। এতে কোন এলাকায় তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, পানিদূষণ কিংবা শীতজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি, তা চিহ্নিত করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নির্দিষ্ট বাজেট, জবাবদিহি এবং বাস্তবায়নের নিয়মিত মূল্যায়ন। জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা, তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, রোগ নজরদারি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু বাজেটের বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে দৃশ্যমান। এখন প্রয়োজন সংকটের স্বীকৃতির বাইরে গিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আজকের অবহেলার মূল্য আগামী দিনে আরও বেশি মানুষকে জীবন, জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিয়ে দিতে হবে।
