দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও অ্যাপে সঠিক পরিকল্পনা ও সুরক্ষার অভাবে প্রায় শতভাগ ওয়েবসাইট ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে রয়েছে। অর্ধশতাধিক ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনে এখনো পিএইচপির পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ সংস্করণ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে সাইবার হামলা ও অননুমোদিত প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সরকারের সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্ট। গত রবিবার জারি করা জরুরি সতর্কবার্তায় সংস্থাটি জানায়, নিয়মিত নজরদারিতে সরকারি, জন খাত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনে নিরাপত্তার দুর্বলতা শনাক্ত হয়েছে। এর আগেও সতর্ক করার পর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাব্যবস্থা হালনাগাদ করেছে কি না, তা নিশ্চিত করেনি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান জবাবও দেয়নি। তবে ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পুনরায় সচল করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপি ওয়েবসাইট হোস্ট করা সার্ভারে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যা এখন নিরাপত্তা শঙ্কায় আছে। আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে গচ্ছিত থাকে। একজন হ্যাকার একজন ব্যক্তির একটি মোবাইল নম্বর বা তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য নিয়ে ওই ব্যক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অতি দ্রুত বের করতে পারবে। এ বিষয়ে উন্নত দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এ রকম কোনো ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের খুবই কম প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত আছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ডিকোডস ল্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ মইনুদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ ওয়েবসাইটের সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে যে ওয়েবসাইটগুলো তৈরি করা হয়, তা সঠিকভাবে পরিকল্পনা না করেই তৈরি করা হয়। নিরাপত্তার সঙ্গে সংরক্ষিত ইস্যুগুলো ভালোভাবে সংরক্ষিত রাখা হয় না। তাই যারা ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান, তাদের উচিত হবে একজন ভালো প্রোগ্রামার দিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি করা। ওয়েবসাইটে দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে তা মূল্যায়নের পর সেগুলো নির্দিষ্টভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সিস্টেম উন্নত করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সাইবার নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখতে কাজ করতে হবে। অতীতে দেশে অনেক হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। সে বিষয়গুলো যাতে আর না ঘটে, সেদিকটা সতর্কতার সঙ্গে নজরদারি করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নিজেদের সফটওয়্যারের কোড ও প্রযুক্তি অবকাঠামো পরীক্ষা করতে হবে। সরকারি ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি আরও মারাত্মক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষিত থাকে। এসব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের হাতে চলে গেলে তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট হবে। এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হ্যাকাররা সুইফট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলার চুরি করে। এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক সাইবার হামলার ঘটনা। এ ছাড়া দেশের অন্যতম বড় সুপার চেইন শপ ‘স্বপ্ন’-এর সিস্টেমে বড় ধরনের হামলার মাধ্যমে গ্রাহকদের লক্ষাধিক তথ্য ও শপিং হিস্ট্রি চুরি করে। পরে তা ডার্ক ওয়েবে ফাঁস করা হয়। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ সরকারের একটি ওয়েবসাইট থেকে লাখ লাখ নাগরিকের নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটে। কাজেই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো ও স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নজরদারি, নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং ত্রুটি সংশোধনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটিই কাম্য।
