আধুনিক গণপরিবহনের প্রতীক মেট্রোরেল বিভিন্ন কারণে তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে। আধুনিক এই স্থাপনা যে খুঁটিতে ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেই খুঁটি দেখলে মনে হয় পোস্টার, ব্যানার, গ্রাফিতির স্থান। অথচ মেট্রোরেলের দেয়ালে পোস্টার লাগানো বা নিয়ন্ত্রণে আইন ও জরিমানার বিধান থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের নজির চোখে পড়ছে না। দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১২-এর ৪ ধারায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে স্থান নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত স্থানে পোস্টার লাগানো যাবে। অন্য স্থানে লাগানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত প্রযোজ্য হবে। একই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, ৪ ধারার অধীনে নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও দেয়াললিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে না। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির জন্য ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলামোটর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও প্রেসক্লাবসংলগ্ন এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে লাগানো পুরোনো পোস্টারের ওপর নতুন পোস্টার যুক্ত হওয়ায় পিলারগুলোর নম্বরপ্লেট ক্রমেই বিজ্ঞাপনে ঢেকে যাচ্ছে। শুধু বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনই নয়, মেট্রোরেলের পিলারে রাজনৈতিক দলীয় নেতাদের প্রচারসামগ্রীরও ছড়াছড়ি। এ ছাড়া মেট্রোরেলের পিলার ও স্টেশনসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকার পাশাপাশি কোথাও কোথাও মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের অবস্থান দেখা যায়। এসব এলাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য অপসারণ ও নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে।
সচেতন মহল মনে করেন, রাজনৈতিক প্রচার কিংবা বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জন্য এভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্নের সৌন্দর্য নষ্ট করা অনাকাক্সিক্ষত। আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও মেট্রোরেলের পিলারসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থাপনায় পোস্টার-ব্যানারের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। পোস্টারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের নম্বর উল্লেখ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, আইন না থাকলেও পরিবেশ ও নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করা অপরাধ। বিজ্ঞাপনের আকার, আলোকসজ্জা, পোস্টার-ব্যানারের ব্যবহার ও রঙের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। আইনেও এসব না মানলে শাস্তির বিধান রয়েছে, কিন্তু কার্যত প্রয়োগ হচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সরকারদলীয় নেতাদের প্রচারসামগ্রী বেশি দেখা যাচ্ছে। অথচ তাদের জনস্বার্থ ও নগরের সৌন্দর্য রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত তদারকি, সমন্বিত উদ্যোগ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
মেট্রোরেলের পিলারে যেসব পোস্টার-ব্যানার রয়েছে, তা অপসারণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। মেট্রোরেল আধুনিক যোগাযোগের একটা মাধ্যম। এ ক্ষেত্রে সৌন্দর্যবর্ধনের জায়গাটি যাতে কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, সেদিকটায় সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। দলীয় নেতা-কর্মীদের এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদারকি বাড়াতে হবে। আশা করছি, সরকার একটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আধুনিক গুরুত্বপূর্ণস্থাপনার সৌন্দর্য সংরক্ষণে উদ্যোগী হবে।
