মঙ্গলবার ● ২৭ অক্টোবর ২০২৬
১১ কার্তিক ১৪৩৩
জাপান চুক্তি ও বিগ-বি: আগামীর শিল্প সম্ভাবনা
খালিদুর রহমান ।।
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ২৭.১০.২০২৬ ১:২৩ এএম |

জাপান চুক্তি ও বিগ-বি: আগামীর শিল্প সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী বড় শক্তি খুঁজতে গেলে আমাদের খুব দূরে তাকাতে হবে না। প্রবাসী আয়, তরুণ জনগোষ্ঠী ও বঙ্গোপসাগর, এই তিন সম্পদই হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাক, কৃষি, অভ্যন্তরীণ বাজার ও প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে উৎপাদন, প্রযুক্তি, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাপানের সহযোগিতায় প্রস্তাবিত বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা বিগ-বি (ইওএ-ই) বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর নির্ধারিত জাপান সফরকে ঘিরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সফরকে সামনে রেখে আলোচিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহযোগিতা প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব বিনিয়োগ এক বিষয় নয়। এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনাকে কতটা বাস্তব প্রকল্প, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া যায় তার ওপর।
বিগ-বির মূল ধারণা হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগস্থলে পরিণত করা। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার উদ্যোগে আলোচিত এই পরিকল্পনা কেবল সড়ক, বন্দর ও শিল্পাঞ্চল নির্মাণের বিষয় নয়। এর সার্থকতা নির্ভর করবে অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের কার্যকর সংযোগ তৈরির ওপর।
এই সংযোগের প্রথম ভিত্তি হতে পারে প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৩৫.৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। এই অর্থ লাখ লাখ পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়। কিন্তু প্রবাসী আয়ের বড় অংশ যদি ভোগ ও আবাসনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে তার সম্ভাব্য অবদান পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কৃষিপণ্যের হিমাগার, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে উঠলে একই অর্থ কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে পারে।
ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রবাসী আয় একটি দেশের অর্থনীতিতে কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ভারত ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০.৭ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় পেয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে একই পরিমাণে পৌঁছানোই মূল লক্ষ্য নয়; উপরন্তু প্রবাসীদের মূলধন, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে দেশের বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য স্বচ্ছ বিনিয়োগনীতি, সহজ নিবন্ধন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয় ভিত্তি বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী। বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও দক্ষতার অভাব সেই সুযোগকে সীমিত করছে। শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সংযোগ দুর্বল থাকলে জনসংখ্যাগত সুবিধা অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার, যন্ত্রপ্রকৌশল, আধুনিক কৃষি, সামুদ্রিক প্রযুক্তি ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা গেলে তরুণরা শুধু চাকরিপ্রার্থী থাকবেন না; তারা দক্ষ কর্মী, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে উঠতে পারবেন।
তৃতীয় ভিত্তি বঙ্গোপসাগর। সামুদ্রিক মৎস্য, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত, পর্যটন, বন্দরসেবা এবং সামুদ্রিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব খাতের পূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, সংরক্ষণব্যবস্থা, দক্ষ জনবল ও উন্নত পরিবহন। এ ক্ষেত্রে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হলেও বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্পাঞ্চল, গুদাম, জ্বালানি অবকাঠামো, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং রপ্তানিমুখী কারখানা গড়ে উঠলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমতে পারে। তবে বন্দর নির্মাণই যথেষ্ট নয়; বন্দরের সঙ্গে উৎপাদন ও বাজারের সংযোগ নিশ্চিত করাই আসল কাজ।
সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে। দেশটি সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েও বন্দর, দক্ষ জনশক্তি, আর্থিক সেবা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সমন্বয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুর বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ প্রায় ৪৪.৬৬ মিলিয়ন একক সমতুল্য কনটেইনারে পৌঁছায়। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম বিদেশি বিনিয়োগকে উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত করে শিল্পায়নের অগ্রগতি ঘটিয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে বাস্তবায়িত বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের জন্য এই দুই অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো, অবকাঠামো ও বিদেশি বিনিয়োগের সুফল তখনই স্থায়ী হয়, যখন স্থানীয় শিল্প, দক্ষ কর্মী এবং রপ্তানি সক্ষমতা পাশাপাশি গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোতেও এই পরিবর্তন জরুরি। তৈরি পোশাক খাত দেশের বড় সাফল্য হলেও রপ্তানি আয়ের অতিরিক্ত অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, জাহাজ নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার রপ্তানি বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা, পরিবেশগত মানদণ্ড ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এ জন্য ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন কাঠামোর বাইরে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলাও জরুরি। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ীকে বন্দর ও শিল্পের কেন্দ্র, কক্সবাজারকে সামুদ্রিক অর্থনীতি ও পর্যটনের কেন্দ্র, সিলেটকে প্রবাসী বিনিয়োগ ও পর্যটনের কেন্দ্র, খুলনাকে মৎস্য ও শিল্পের কেন্দ্র এবং রাজশাহীকে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত করা যেতে পারে। এতে স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার বাড়বে, কর্মসংস্থান ছড়িয়ে পড়বে এবং রাজধানীর ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমবে।
অবশ্য এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, সহজ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও দক্ষ পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বড় প্রকল্পের ব্যয়, ঋণের শর্ত ও পরিবেশগত প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। উপকূলীয় শিল্পায়নের ক্ষেত্রে জলবায়ু ঝুঁকি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকাও সুরক্ষিত রাখতে হবে। বিনিয়োগের সাফল্য পরিমাপ করা উচিত শুধু অর্থ ব্যয়ের ভিত্তিতে নয়, অধিকন্তু বাস্তব কর্মসংস্থান, নতুন শিল্প, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের সামনে তাই নতুন সম্পদ খোঁজার চেয়ে বিদ্যমান সম্পদের সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবাসী আয়কে বিনিয়োগে, তরুণদের দক্ষতায়, বঙ্গোপসাগরকে শিল্প ও বাণিজ্যে এবং বন্দরকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগের শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে অর্থনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। জাপানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং বিগ-বি সেই পরিবর্তনের কার্যকর ভিত্তি হতে পারে, যদি ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কর্মসংস্থানের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা যুক্ত হয়।
বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক উত্থান শুধু আরও বেশি প্রবাসী আয়, রপ্তানি ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করবে না। সাফল্য নির্ভর করবে অর্থ, মানবসম্পদ, সমুদ্র ও যোগাযোগব্যবস্থাকে কতটা কার্যকরভাবে একই উৎপাদন কাঠামোয় যুক্ত করা যায় তার ওপর। বাংলাদেশের সামনে সম্পদ ও সম্ভাবনা দুটোই রয়েছে। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, জাপানের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা এবং প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দেওয়ার দৃঢ়তা।
লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক।














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২