মঙ্গলবার ● ২৭ অক্টোবর ২০২৬
১১ কার্তিক ১৪৩৩
শিল্প ও অর্থনীতির গতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
ড. সুলতান মাহমুদ রানা ।।
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ২৭.১০.২০২৬ ১:২৩ এএম |

শিল্প ও অর্থনীতির গতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
বাংলাদেশের শিল্প খাতের সাম্প্রতিক সংকেতগুলোকে আলাদা কিছু পরিসংখ্যান বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গত ১০ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘শিল্প খাতে পতন, গতিহারা অর্থনীতি’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ২.৮৬ শতাংশে নেমেছে; ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিল ৮.১৮ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সূচক (চগও) নেমেছে ৪৮.৬-এ, আর উৎপাদন খাতের সূচক ৪৪.৮। ৫০-এর নিচে চগও সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে ৪.৪৭ শতাংশে নেমেছে। প্রতিবেদনটির ভাষ্যে, ১৯৯৩ সালের পর এটা সর্বনিম্ন। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও ভারী সরঞ্জাম আমদানিও কমেছে। এগুলো একসঙ্গে বলছে, ব্যবসা শুধু ধীর হয়নি; ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্য দরকারি বিনিয়োগও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এমন সমস্যার পেছনে রয়েছে একাধিক চাপ-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। উচ্চমূল্যস্ফীতি ও সুদ, বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতা, দুর্বল ব্যাংকব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা। বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবরের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে ঋণ২৬ ও ঋণ২৭-দুই বছরেই ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, বিনিয়োগ নরম হয়েছে, রপ্তানির গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যবসার খরচে চাপ দিচ্ছে; আর ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ অবস্থায় প্রথম কাজ হওয়া উচিত উৎপাদন চালু রাখার বাধাগুলো সরানো। কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য, তা ব্যবসায়ীরা আগে থেকে জানতে চান। জ্বালানি সরবরাহের বাস্তবসম্মত সূচি প্রকাশ, শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকারভিত্তিক নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং সরবরাহে বিঘ্ন হলে দ্রুত প্রতিকার–এসব ব্যবস্থা উৎপাদন পরিকল্পনাকে সহজ করতে পারে। একই সঙ্গে বন্দরে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি খালাস, কর-শুল্ক পরিশোধ, লাইসেন্স ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার। নতুন ঋণ ঘোষণার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন সচল করা, কার্যকর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধন জোগানো এবং রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
তবে ঋণ সহজ করতে গিয়ে দুর্বল ব্যাংকে জবাবদিহিহীন তারল্য ঢালা সমাধান নয়। খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাব, ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই, দায়ী ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে আইনসম্মত পুনর্গঠনের রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে। আমানতকারী ও সৎ উদ্যোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে ব্যাংক খাতের ক্ষতি কে, কীভাবে এবং কত সময়ে সামলাবে–সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আইএমএফও দুর্বল ব্যাংকে শর্তহীন তারল্য না দিয়ে সম্পদের মান যাচাই, তদারকি এবং স্বচ্ছ পুনর্গঠনের কথা বলেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি বিষয় সবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো এমন অবস্থা উত্তরণ এবং সে বিষয়ে জনগণের আস্থা ফেরানো যাবে কি না? এর উত্তরে প্রথমেই বলা যায়, কোনো আশ্বাস দিয়ে আস্থা ফেরানোর সুযোগ যেমন নেই, তেমনি সমাধানও সম্ভব হবে না। মূলত ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ফলাফলের মধ্যদিয়ে সমাধানটি করা যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি কমানোর বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কার্যকর নজরদারি, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব অগ্রগতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর কেন্দ্রে থাকা উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে এমনভাবে ঋণ সংকুচিত করা হলে যাতে উৎপাদন ও চাকরিও থমকে যায়, তাতে স্থিতিশীলতা আসবে না। আবার মূল্যস্ফীতির চাপ উপেক্ষা করে নির্বিচারে ঋণ বা সরকারি ব্যয় বাড়ালেও আস্থা ফিরবে না। নীতির ভারসাম্য, পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশ-এই তিনটি একসঙ্গে দরকার।
তবে এখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নটি অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে শুধু রাস্তায় সংঘাত না থাকলেও সেটা বোঝানো যায় না। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা যেন বুঝতে পারেন, আগামী মাসে করনীতি, আমদানি নিয়ম, বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থাপনা বা অনুমোদনের শর্ত হঠাৎ বদলে যাবে না। শ্রমিক যেন মজুরি ও নিরাপত্তা নিয়ে ন্যায্যভাবে কথা বলতে পারেন; ব্যবসায়ী যেন আইনের আশ্রয় পান; আর সরকার যেন বিরোধী মত, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নীতি নিয়ে সংলাপ করে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও আইনের পূর্বানুমেয় প্রয়োগ রাজনৈতিক আস্থারই অংশ। নতুন প্রকল্প বা প্রণোদনার চেয়ে অনেক সময় এই নিশ্চয়তাই বিনিয়োগের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু রাষ্ট্রের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটে গভীর মন্দায় পড়েছিল। ১৯৯৮ সালে দেশটির অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি হয়েছিল। আইএমএফের বিশ্লেষণে পুনরুদ্ধারের পেছনে ছিল ব্যাংক ও করপোরেট খাতের পুনর্গঠন, আর্থিক বাজারে আস্থা ফেরানো, রপ্তানির জোরালো প্রত্যাবর্তন এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। সরকার, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকপক্ষের ত্রিপক্ষীয় সমঝোতাও সামাজিক ঐকমত্য তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল।
কোরিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা, কোনো সহজ ফর্মুলা নয়। কোরিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, রপ্তানি কাঠামো ও সংকটের ধরন বাংলাদেশের থেকে আলাদা ছিল। তবু মিলটি গুরুত্বপূর্ণ। আস্থা ফেরাতে শুধু ঋণ বা প্রণোদনা যথেষ্ট হয় না; আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার, নীতির ধারাবাহিকতা এবং সরকার-শ্রমিক-ব্যবসায়ীর মধ্যে সমঝোতা দরকার। দ্রুত সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তনও মানুষের জীবনে সংকটের ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে মুছে দেয় না। তাই সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানকে পুনরুদ্ধারের অংশ করতে হয়।
বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তাই কয়েকটি পরস্পর-সম্পর্কিত পদক্ষেপে গড়তে হবে। উৎপাদনমুখী জ্বালানি সরবরাহ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংক সংস্কার, মূল্যস্ফীতি কমানোর বিশ্বাসযোগ্য নীতি, ব্যবসার প্রশাসনিক বাধা কমানো, কার্যকর ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য। এগুলোর সঙ্গে চাই রাজনৈতিক সংলাপ ও নীতির পূর্বানুমেয়তা। সরকার অগ্রগতি মাপতে পারে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও ঋণপ্রবাহের কয়েকটি প্রকাশ্য সূচক ধরে এবং নিয়মিত জানাতে পারে কোন প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কেন।
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি কোনো একক উদ্যোগে কিংবা ঘোষণায় ঘটবে না। উদ্যোক্তা তখনই ঝুঁকি নেবেন, যখন বিদ্যুৎ পাবেন, ঋণ ও কাঁচামাল জোগাড় করতে পারবেন এবং নিয়মের ধারাবাহিকতা নিয়ে নিশ্চিত হবেন। মানুষ তখনই আস্থা রাখবে, যখন বাজারদর, চাকরি ও দৈনন্দিন জীবনে উন্নতি টের পাবে। আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনই অর্থনীতির সম্পদ হবে, যখন তা ন্যায়সঙ্গত নিয়ম, সংলাপ এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতির ভিত তৈরি করবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২