গাজীউল হাসান খান ।।
বর্তমান বিশ্বে বিরাজমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণগুলো দিনে দিনে আরও অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা সামাজিক গণমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের কারণে বিশ্ব পরিস্থিতি কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক দৃশ্যপট আরও দ্রুততর গতিতে দৃশ্যমান হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান পর্যায়ে এসে মূলত দুই ধারায় বিভক্ত গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব তাত্ত্বিক দিক থেকে আরও ব্যাপকতর হয়ে পড়েছে। মানবসমাজের কল্যাণে উদ্ভাবিত বিশ্বব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক কিংবা সমাজতান্ত্রিক নীতিমালার বিকাশ যেন দ্রুত এক চরম অদৃশ্য আধিপত্যবাদে রূপান্তরিত হচ্ছে। তাতে বিকাশমান মানবপ্রজাতি এমনকি প্রকৃতি এক চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদী ইসরায়েল তাদের আধিপত্য কিংবা কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য যুদ্ধ চায়। সে কারণে অস্ত্র উৎপাদন ও তার বিপণনকে তারা অত্যন্ত আবশ্যক বলে মনে করে। অথচ তারাই একদিন গণতন্ত্রকে সফল করার জন্য রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুশীলনকে অপরিহার্য বলে মনে করেছিল। কমিউনিস্ট ভাবধারা অনুযায়ীও এক সময় সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে জনগণের চিন্তাধারা পরিবর্তনের আন্দোলন বলে মনে করত। কারণ, প্রগতির ধারাকে অগ্রসর করতে না পারলে তাকে তাদের আদর্শগত দুর্গতি বলে মনে করত। রাষ্ট্রীয় জীবনে সে সাংস্কৃতিকচর্চা ও বিকাশের অভাবে সমাজে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন শোষণ-শাসনের পরিমাণ লাগামহীন হয়ে পড়ে বলে প্রগতিবাদীদের ধারণা। প্রকৃতি ও মানবপ্রজাতি বিকাশশীল। তার মধ্যে সংস্কৃতিও বিকাশশীল বলে মনে করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। তার মতে, লেলিন ও মাও জেদংয়ের নেতৃত্বে মার্কসবাদের সঙ্গে এক সময় সংস্কৃতির মার্কসীয় ধারণাও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা সমাজব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা এবং অর্থনীতিকে সমৃদ্ধশালী করা। কারণ, অর্থনৈতিক শোষণ-শাসন কিংবা দুর্নীতিই মূলত রাষ্ট্র কিংবা বৃহত্তরভাবে সমাজকে অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র করে তোলে।
মৃত্যুর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের মাঝামাঝি অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আধিপত্য বা ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে না হোক, পরোক্ষভাবে অনেক কথা লিখেছেন। দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার ও ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে বাংলাদেশের অবস্থানও এক সীমাহীন দুর্গতির মধ্যে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। এর মধ্যে গুম, খুন ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশের প্রগতিশীল লেখক-সাংবাদিকরা অনেক কথা লিখেছিলেন। এখন প্রায় সব রাজনৈতিক দলই রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং বিশেষ করে সম্পদের সুষম বণ্টনসহ অর্থনৈতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছেন অত্যন্ত সরবভাবে। দেশে করোনাভাইরাসসহ ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব, বাইরে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গণহত্যাসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্বের অর্থনীতি এখন এক বিশাল বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। তার প্রভাব থেকে কোনো মতেই মুক্ত নয় বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত সংকটের মুখে পড়েছে। এর আরেকটি অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক জ্বালানি সরবরাহ-সংক্রান্ত সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে উৎপাদন, যোগাযোগব্যবস্থা ও রপ্তানি-বাণিজ্য এক মহাসংকটে পড়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসেছে এক নতুন নির্বাচিত সরকার। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা যেমন খারাপ তেমনি চাকরির বাজারও অত্যন্ত সংকটাপন্ন। ব্যাংকিং, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের পরিসর অত্যন্ত সীমিত। তাতে অর্থনীতি আরও দুর্বল হওয়ারই কথা। নবনির্বাচিত সরকার ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছে। তার মধ্যেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির খবর বেরিয়ে আসছে। শহর, নগর ও গ্রাম পর্যায়ে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ আরও সমস্যা ও সংকটের মধ্যে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে আমাদের অর্থনীতি এক বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। তাতেও সাম্রাজ্যবাদী কিংবা আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিবর্তন হচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলোর। তারা সম্প্রসারণবাদী ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে লোকচক্ষুর অন্তরালে ক্রমাগত আশকারা দিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু আরব রাষ্ট্র ইয়েমেনের হুথিদের নিয়ে খেলছে এক ধ্বংসাত্মক খেলা।
রুশ-ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে গাজা ভূখণ্ড নিয়ে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, এখনো তার অবসান না হলেও এভাবে আর কেউই বেশি দূর এগোতে পারছে না। আগামী নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বিশ্ব রাজনীতি একটি গঠনশীল ধারায় প্রবাহিত হতে বাধ্য হবে। ততদিনে ইহুদিবাদী ইসরায়েলে ও নেতানিয়াহু সরকারের পরিবর্তন ঘটতে পারে। রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আসতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানসহ বিশ্বের বহু দেশ সে আশায় অপেক্ষা করে রয়েছে। নতুবা এ অবস্থা আর চলতে দিলে ইউরোপের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে বাধ্য হবে। তাতে পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র যে সংকটমুক্ত হবে, তা নয়। পতন ঘটতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। ইউক্রেন ও ইসরায়েলের কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ক্রমে ক্রমে ভেঙে পড়ছে শান্তিপূর্ণ বিশ্বসমাজ ও সংস্কৃতি। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ত্বরিত অবসান চান। তার পরিবর্তে বিশ্ববাণিজ্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থে তিনি চান সব সমস্যার আশু সমাধান এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ও বিভিন্নভাবে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে জোরদার করতে। এ কথা ঠিক যে, সমগ্র বিশ্ববাসী অবিলম্বে একটি পরিবর্তন দেখতে চায়। অন্যায় যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যাকাণ্ড কিংবা সংঘর্ষ আর নয়। আর্থ-সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্ববাসীর অভিপ্রায়। তারা সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ কিংবা সম্প্রসারণবাদসহ আর কোনো অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চলতে দিতে রাজি নয়। সে কারণেই বিশ্বব্যাপী তারা চায় এক নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে পর্বতপ্রমাণ কোনো অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ-শাসন ও ব্যবধান থাকবে না। সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও অগণতান্ত্রিক সব ব্যবস্থার অবসান ঘটবে।
অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক অনাচারের ফলে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা ক্রমে ক্রমে ভেঙে পড়েছিল। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নবনির্বাচিত সরকার দেশে একটি দ্রুত পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর। তার জন্য প্রশাসন, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও বলিষ্ঠ ও কঠোর হতে হবে। দলীয়ভাবে দুর্নীতি ও লুটপাটের অর্থ ভাগাভাগির সব গোপন ও প্রকাশ্য ব্যবস্থা ভেঙে দিতে হবে। বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট করে বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করতে হবে। নতুবা সরকার টিকবে না। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে না। সমাজের চলমান অবক্ষয় কিংবা দারিদ্র্য রোধ করা যাবে না। তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সে অবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হবে এবং দেশে ঘটবে অনাক্সিক্ষত ও মর্মান্তিক ঘটনাবলি। দেশের মানুষ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনাকে কেন্দ্র করে আর প্রাণহানি ও রক্তপাত দেখতে চায় না। উন্নতি কিংবা উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছার মতো যথেষ্ট গুণাবলি বাংলাদেশের রয়েছে। তা ছাড়া, নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রতি রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপুল সমর্থন। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত সামান্য অংশের সমর্থন ছাড়াও সরকার সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নতুন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত চিহ্নিত মানুষ ঢুকে পড়েছে বলে অভিযোগ থাকলেও সরকার তাদের উচ্ছেদ করতে সক্ষম। তাদের বাদ দিলে সরকার সাফল্যজনকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
