উত্তাল সমুদ্র, চার থেকে ছয় ফুট উঁচু ঢেউ, নৌকায় পানি প্রবেশ আর খাবার-পানির সংকট–এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রায় পাঁচ দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসেছিলেন ৪৬ বাংলাদেশি। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ঝড়ের কবলে পড়ে দিক হারানো তাদের অবশেষে ১৯ সেপ্টেম্বর মিশরের সিদি বারানি উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ উদ্ধার করে।
কায়রোর বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের এক কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা বর্তমানে মিশরের আলামাইন পুলিশ স্টেশনে রয়েছেন।
তাদের অবস্থা ও সমুদ্রযাত্রার ঘটনা জানতে রোববার (১১ অক্টোবর) সেখানে পরিদর্শন করেন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে এবং শ্রম উইংয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের সাক্ষাৎকার নেন।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানান, গত ১৪ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে একটি রাবারের নৌকায় যাত্রা করেন ৫৪ জন। তাদের মধ্যে ৪৬ জন বাংলাদেশি, সাতজন সুদানি ও একজন মিশরীয় নাগরিক ছিলেন।
যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নৌকাটি প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রায় এক রাত ও এক দিন চলার পর দিক হারিয়ে ফেলে নৌকাটি। এরপর কয়েক দিন সাগরে ভাসতে থাকেন যাত্রীরা। আশপাশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের কাছে একাধিকবার বিপদসংকেত পাঠান তারা।
প্রায় পাঁচ দিন খাবার ও সুপেয় পানির অভাবে তাদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে এবং ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে যে কোনো মুহূর্তে নৌকাটি ডুবে গিয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দেয়।
অবশেষে ১৯ সেপ্টেম্বর একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের বিপৎসংকেতে সাড়া দেয়। মিশরের সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে জাহাজটি তাদের উদ্ধার করে সিদি বারানি ও উপকূলে নিয়ে আসে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জাহাজটির নাম নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে মিশরের দৈনিক আল-আহরাম পত্রিকার ১৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে একটি এশীয় দেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের অভিযোগ, ইউরোপে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে দালালচক্র তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি প্রায় সাত লাখ থেকে ৪৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন। তাদের অনেকে লিবিয়ার তথাকথিত ‘গেমঘর’-এ ১৫ দিন থেকে সর্বোচ্চ নয় মাস পর্যন্ত আটক ছিলেন।
এই অর্থ জোগাড় করতে কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, কেউ বসত বাড়ি বিক্রি করেছেন, আবার কেউ ধারদেনা করেছেন বলে জানিয়েছেন। উন্নত জীবনের আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে যাত্রা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন পড়েছিল চরম ঝুঁকির মুখে।
দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সমুদ্রযাত্রার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে উদ্ধার হওয়া অনেক বাংলাদেশি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের ভাষ্য, প্রতিকূল আবহাওয়া, নৌকায় পানি প্রবেশ ও উদ্ধারের অপেক্ষায় কাটানো সময় ছিল জীবন-মৃত্যুর চরম অনিশ্চয়তায় ভরা।
দূতাবাসের এই কর্মকর্তা আরও জানান, উদ্ধারের পর থেকেই স্থানীয় পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি, ইমিগ্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে দূতাবাস। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মিশরের প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তাদের দ্রুত নিরাপদে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান দুতাবাসের শ্রম উইং এর এই কর্মকর্তা।
