মঙ্গলবার ● ১৩ অক্টোবর ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বপ্নের মায়াজালে কুমিল্লা
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৮ এএম আপডেট: ১৩.১০.২০২৬ ১:৫০ এএম |

স্বপ্নের মায়াজালে কুমিল্লা

শোন বন্ধু শোন, এই শহরে ইতিকথা।
ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুন মর্মব্যথা।।
আমরা অর্থাৎ কুমিল্লাবাসী যে সব স্বপ্ন দেখে না, আমাদের প্রিয় নেতারা আমাদের নতুন নতুন স্বপ্ন দেখান। যেমন মাননীয় মন্ত্রী সজ্জন জনপ্রিয় হাজী ইয়াছিন সাহেব মন্ত্রী হয়েই টাউন হল মাঠে বইমেলা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে স্বপ্ন দেখালেন- তিনি কুমিল্লায় একটি কৃষি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি কৃষিমন্ত্রী। আমরা হাততালি দিয়ে সমর্থন জানালাম। জানি না এ স্বপ্ন পূরণ কবে হবে। তবে আশাবাদী। তিনি বলেছেন-ইনশাল্লাহ।
বলি- বার্ডে একটি সমবায় কলেজ আছে। এ কলেজের কাজ কি জানি না। এ কলেজটিকে কি নতুন পরিকল্পনায় বিশ^বিদ্যালয় করা যায় না ? বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন মাননীয় মন্ত্রী। আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য স্বপ্ন দেখালেন গোমতী নদীতে লঞ্চ চলবে। তা তো স্বপ্নপুরীর কথা। এই গোমতী একসময় কুমিল্লা শহর ও ময়নামতি সেনানিবাসকে আতংকে রাখত, রাতের ঘুম হারাম করে দিত। পরে আয়ুব আমলে গোমতী প্রবাহ খাল কেটে আরও উত্তরে বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া-দেবিদ্বার-মুরাদনগরের দিকে ধাবিত করে শহর ও সেনানিবাস রক্ষা করল। কুমিল্লাবাসী স্বস্তি পেলো। এখন গোমতী নদী দিয়ে লঞ্চ দিয়ে কোথায় যাব ? সব যে পাকা রাস্তা-ব্রীজ হয়ে গেছে, নৌকারও প্রয়োজন নেই। গোমতীকে উত্তরে সরিয়ে নেয়ার ফলে যে অববাহিকা বা চর জেগে উঠেছে, এ সম্পত্তির মালিক কে ? শহর কেন উত্তরে সম্প্রসারিত হয় না। এ সম্পত্তি কারা ভোগ করছে- তা বৈধ, না অবৈধ ? প্রশ্ন করতে চাই না, জানতে চাই। বলতে চাই- কুমিল্লা শহরের লোকসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষায় বা সরকারি প্রতিষ্ঠান অথবা পর্যটন সেন্টার বা জোন তৈরি করলে লঞ্চ চালানোর চেয়ে নান্দনিক হয় না? কুমিল্লাবাসীও উপকৃত হয়, শহর বা জনপদটিও সমৃদ্ধ হয়। তাও ভেবে দেখতে পারেন।
তাহলে আমার বা আমাদের আপাতত প্রত্যাশা কি ? এ কথাটি বলার জন্য কাসন্দি তৈরি।
১. আমাদের কুমিল্লায় একজন মহীয়সী মহিলা নওয়াব আছেন। তিনি নিজ গুণেই গুণবতী, দানশীলা, শিক্ষাব্রতী, প্রজাবান্ধব ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর বাড়ি লাকসাম পশ্চিমগাঁও। আমরা চিনি-জানি, বাংলাদেশের মানুষ নাম শুনেছে, তারাও জানে-চিনে। উপমহাদেশের জ্ঞানী-গুণীরাও তাঁকে নিয়ে গর্ব করে, গবেষণা করে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে তাঁকে শুধু নওয়াব উপাধিই দেয়নি দিয়েছে যথাযোগ্য মর্যাদা ও সম্মান, তাঁর রচিত ‘রূপজালাল’ ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত, যা বাংলাদেশে কোথাও ছিল না। কুমিল্লার গুণিজন শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস হার্বার্ড বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে তা আবিষ্কার করেন, জেরস্ক করে সম্পাদনা করে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ করে আমাদের হাতে তুলে দেন। আমরা এই মহীয়সী নারী নওয়াব ফয়জুন্নেছাকে (১৮৩৪-১৯০৩) একজন বাংলা সাহিত্যে সুলেখিকা হিসেবে পেয়ে যাই। তাঁকে কি আপন যোগ্য আসনে রাষ্ট্রীয় বা জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া যায় না ? দাবি রলো। প্রত্যাশা করি। আমি তাঁর একজন গুণগ্রাহী, তাঁকে নিয়ে আমি গবেষণামূলক গ্রন্থও রচনা করেছি। তাঁকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে কুমিল্লাও গৌরবান্বিত হবে।
২. শচীন কর্তাকে আমরা কে না চিনি ? কুমিল্লায় একটিই রাজবাড়ি। নবদ্বীপ দেববর্মণ ত্রিপুরার রাজা হওয়ার কথা ছিল, রাজবাড়ির ষড়যন্ত্রে হেরে গিয়ে মা ও স্ত্রীদের (৪জন) প্রাণ বাচাতে পালিয়ে গোমতী নদী দিয়ে কুমিল্লায় এসে চর্থায় ৬০ বিঘার উপর রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র হলেন শচীনকর্তা। তাঁর জন্মভিটা চর্থার বাড়ি। ইউসুফ স্কুল-জিলাস্কুল-ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশুনা করে বি,এ পাশ করেন। জন্ম ১লা অক্টোবর ১৯০৬, মৃত্যু ৩১ অক্টোবর ১৯৭৫। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুরসম্রাট ও সঙ্গীতজ্ঞ। এই শচীনকর্তার বাড়িটি কিছুটা জায়গা সরকার উদ্ধার করে, অনেকটা বেদখল। এ বাড়িতে পশুদপ্তরের অফিস, একেবারে সম্মুখে। তাই বাড়িটি সংস্কার করা হলেও পেছন দিয়ে ঢুকতে হয়। যে বাড়িতে পেছন দিয়ে দেয়াল ডিঙিয়ে ঢুকতে হয়, যারা ঢুকেন তাদেরকে কেউ ভালো লোক বলে না। আমরা এভাবেই ঢুকি। তাই মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছি যে, পশু দপ্তর বা মৎস্য অফিসটি যেন স্থানান্তর করে শচীনকর্তার বাড়ি ও স্মৃতিকে দৃষ্টিনন্দন এবং সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করে আমাদের স্বপ্ন পূরণ করেন। তিনি কথা দিয়েছেন, চেষ্টাও হয়ত করেছেন, হয়ত সময়ের এবং সিদ্ধান্তের দাপ্তরিক বিষয়-আশয়।
৩. শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লার অহংকার, বাংলাদেশের প্রথম সারির স্বাধীনতার সৈনিক। বিস্তৃত না বলেও এতটুকু বলছি আজ আমরা স্বাধীনতা ভোগ করছি, তার সূচনা তো ১৯৪৮ সালের ২৩ শে জুন, যখন দত্তমশায় বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য গণপরিষদে দাবি তুলেছিলেন। তার স্বার্থক সুফল কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা নয় ? তবে তাঁর বাড়িটির এ হাল অবস্থায় কেন ? এরূপ কেন ? তিনি ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে শহিদ। তাঁর রক্তের ঋণ প্রতিটি বাঙালি অবশ্যই দায় স্বীকার করতে বাধ্য। সংক্ষেপে দাবি জানাচ্ছি- মাননীয় মন্ত্রী-মাননীয় সংসদ সদস্য-আপনারা শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটি উদ্ধার করে দৃশ্যমান একটা কিছু জাতীয় বা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির ব্যবস্থা করুন। আমাদের স্বপ্ন পূরণ করুন। আমরা কৃতজ্ঞ থাকব অন্তত আপনাদের দু’জনের কাছে। আপনাদের প্রতি বিশ^াস ও প্রত্যাশা অফুরন্ত ।
৪. আমরা জানি বলেই দাবি করছি যে, ১৯২১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লায় এসেছিলেন। প্রথম মহাযুদ্ধ ফেরতা এ অসামান্য কবি ১৯২৩ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচবার কুমিল্লায় এসেছিলেন, তাঁর স্মৃতি কান্দিরপাড়ে ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়ি, বসন্তকুমার মজুমদারের বাড়ি, কাত্যায়নী কালীবাড়ি ইয়ং ক্লাব, মহেশ প্রাঙ্গণ, ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রাবাস, ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষের বাসা, চর্থা রাজবাড়ি তথা শচীনকর্তাদের বাড়ি, দারোগাবাড়ির মার্গসঙ্গীত মোহাম্মদ হোসেন খসরুর আস্তানা, মৌলভীপাড়ার জানু মিঞার বাড়ি, কোতয়ালি থানা ঝাউতলা এবং কান্দিরপাড় থেকে মিছিল করে ব্রিটিশ যুবরাজের ভারত আগমনের প্রতিবাদ আরও কত কি । এছাড়াও মুরাদনগরের দৌলতপুর তো শ^শুর বাড়ি। এত কথা কেন ? এজন্য যে আমরা কান্দিরপাড়ের পূবালী চত্বর থেকে পশ্চিম দিকের রাস্তাটি নজরুল ইসলামকে স্মরণে রাখার জন্য ‘নজরুল এভিনিউ’ নামকরণ করে প্রমীলার বাড়িটি চিহ্নিত করতে চাচ্ছি। কাজটি করেছে একসময়ে দাবি ও আবেগের বশে কুমিল্লা পৌরসভা। আমরা এমনটি চাই না, চাইনি। প্রমীলা কুমিল্লার মেয়ে নয়। তাঁর বাবা বসন্তকুমার সেনগুপ্ত কুমিল্লায় তহশিলদার অফিসে চাকরি করতেন, কাকা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত কোর্টে চাকরি করতেন এবং কান্দিরপাড়ে নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। বসন্তকুমার সেনগুপ্ত প্রমীলার মতো গিরিবালাকে অধিক বয়সে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেন এবং প্রমীলার যখন সাড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর, তখন পিতা মারা যান। গিরিবালা দেবী ও প্রমীলা (পারিবারিক নাম আশালতা- দোলন বা দুলি) তাদের পৈতৃক বাড়ি মানিকগঞ্জের তেওতা গ্রামে থাকতেন। পিতার মৃত্যুর পর যুবতী বিধবা গিরিবালা ও শিশু দুলির সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না আর্থিক ও সামাজিক সংকীর্ণ কর্মকাণ্ডের জন্য, তাই ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত ও তাঁর মমতাময়ী স্ত্রী বিরজাসুন্দরী দেবীর বদান্যতায় তাঁরা কুমিল্লায় চলে আসেন। কুমিল্লার বাসায় প্রমীলা ১১ বছর ৭ মাস ছিলেন। পরে কলকাতায় ১৯২৪ সালে এপ্রিল মাসে নজরুলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। যে কথাটি বলতে চাচ্ছি প্রমীলাকে বিয়ে করে নজরুল কুমিল্লার জামাই নন। মুরাদনগরের দৌলতপুরে আলী আকবর খানের ভাগিনী নার্গিসকে বিয়ে করেই কবি কুমিল্লার জামাতা। এ নিয়ে অনেক কথা। বিয়ে হয়নি বা হয়েছে এ তর্কে যাব না। যখন বিয়ে অনুষ্ঠানের ১৫ বছরপর নার্গিসের বিয়ে হয় আজিজুল হাকিমের সঙ্গে, তখন নজরুলকে তালাকনামায় স্বাক্ষর করতে হয়েছে। যাক সেসব কথা।
৫. কাজী নজরুল ইসলাম এই কান্দিরপাড় অর্থাৎ কুমিল্লা শহরের রাজধানী কথিত পূবালী চত্বরের পথ ধরে কবি বহুবার যাতায়াত করেছেন। আমার আমাদের স্বপ্ন এ চত্বরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি স্মারক নির্মাণ করা হোক। দেশ বিদেশের লোকেরা দেখে যেন জানতে পারেন যে, কুমিল্লার সঙ্গে কবির কী সম্পর্ক ছিল, তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টি কিভাবে এখানে কাটিয়েছেন- তাঁর সৃষ্টিশীলতায় কুমিল্লার অবস্থান কতটুকু। খুব বড় কিছু চাইনি। স্বপ্নটা সম্ভবের মধ্যেই বাস্তবায়ন করার সামর্থ স্থানীয়ভাবেও করা যেতে পারে। শুধু উদ্যোগটা নিলেই হয়। স্বপ্নপূরণে এগিয়ে আসবেন কি ?
লেখার শিরোনাম ‘স্বপ্নের মায়াজালে কুমিল্লা’। যে স্বপ্নগুলোর কথা উল্লেখ করেছি, তা বাস্তবায়নে দিবা স্বপ্ন দেখছি না, বাস্তবেই দেখছি। এ স্বপ্নগুলো কিন্তু সত্যিকারভাবেই আমাদেরকে ঘুমুতে দেয় না। যথাস্থানে যথাব্যক্তির আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টা প্রত্যাশা করছি।
‘স্বপন পরের ডাক শুনেছি, জেগে তাই তো ভাবি-
কেউ কখনো খুঁজে কি পায় স্বপ্নগুলোকের চাবি।।’ 
(সমাপ্ত)












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২