মঙ্গলবার ● ১৩ অক্টোবর ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা: গোটা জাতির বিবেক নাড়িয়ে দিলো
মুহাম্মদ মাহমুদ শরীফ
প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২২ এএম আপডেট: ১২.১০.২০২৬ ২:১৪ এএম |

 কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা: গোটা জাতির বিবেক নাড়িয়ে দিলো
সম্প্রতি কুমিল্লায় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড গোটা জাতির বিবেক নাড়িয়ে দিয়েছে।
একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার মতো তুচ্ছ লালসায় যেভাবে তেরো বছরের একটি শিশুকে লালমাই পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে তারই চলার সঙ্গীরা পিটিয়ে হত্যা করলো, তা কেবল একটি অপরাধ নয় বরং আমাদের সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চরম অবক্ষয় ও নৈতিক দেউলিয়াত্বের এক প্রকৃষ্ট দলিল। এই নির্মম ঘটনা চোঁখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এক ভয়ানক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একজন মানুষের জীবনের চেয়েও একটি লোভনীয় বস্তুর মূল্য অনেক বেশি।

মানুষের চেয়ে দামি যখন আইফোন:

২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার উঁচু জঙ্গলে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র পুত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। সেদিনও জুম্মার নামাজ আদায় শেষে স্বাভাবিকভাবে বাসায় ফিরে অপ্রতিম। বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার তাঁর আদুরে ছেলে অপ্রতিমকে নিজ হাতে খাইয়ে দেন দুপুরের খাবার।
বলেন, “বাবা আজ তুমি বাইরে যেওনা, বাসায় একসাথে মুভি দেখবো আর বিকেলে তোমার জন্য একটা গিফট আছে।”
কিন্তু, বন্ধুভাবাপন্ন এলাকার এক বড় ভাইয়ের একের পর এক ফোনকল ও ম্যাসেজে প্রভাবিত হয়ে বাবার কথা না শুনে ছবি তোলার জন্য মায়ের আইফোনটি সাথে নিয়ে অগত্যা বাসা থেকে বের হয়ে যায় অপ্রতিম।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এলাকার পূর্বপরিচিত একটি ছেলের সাথে অপ্রতিম অত্যন্ত আপন মনে হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী লালমাই পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধা, একাধিক ফুটেজ পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, অপ্রতিম কাদের সাথে যেনো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পেরিয়ে সানন্দার দিকে গিয়েছে।
পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, বিকেল পাঁচটার পর সানন্দার লালমাই পাহাড়ের উঁচুতে অপ্রতিমের কাছ থেকে তাঁর দীর্ঘদিনের সাথীরাই ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং অপ্রতিম এতে বাধা দিলে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে অপ্রতিমের হাতে থাকা তাঁর মায়ের ব্যবহৃত আইফোন সেভেনটিন প্রো ম্যাক্সটি কেড়ে নিতে উন্মত্ত ঘাতক সাইফুল ইসলাম তুহিন অপ্রতিমের মাথার পেছন দিকে শক্ত বাঁশের লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অপ্রতিম। তারপর অপর ঘাতক ফাহাদ ও কামরুলও অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর আইফোনটি নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তারা।

হত্যার পর ঘাতকদের স্বাভাবিক আচরণ ছিলো স্তম্বিত হওয়ার মতো:

ঘাতকরা অপ্রতিমকে বন্ধুত্বের সমস্ত বিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে একে একে ফেসবুকে অপ্রতিমের সন্ধান চেয়ে পোস্ট দিতে থাকে এমনকি অপ্রতিমের মৃতদেহ উদ্ধারের পর শোক জানিয়েও তারা স্ট্যাটাস দেয়।
ঘাতক ফাহাদ অপ্রতিমের বাবার মালিকানাধীন কম্পিউটার এক্সেসোরিজের দোকানে চাকরি নেয় বেশ ক'দিন আগে। ফলে দোকানের কর্মচারী হিসেবে তার সহযোগিতা নিয়ে অপ্রতিমকে খুঁজে পেতে ফাহাদকে ডেকে নেয় অপ্রতিমের পরিবার। সন্ধার কিছু পর অপ্রতিমের মায়ের কলিগ ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় বেশ কিছু সিসিটিভি ফুটেজ হাতে আসে। সেই ফুটেজে অপ্রতিমের সাথে হেঁটে যাবার দৃশ্যে একটি যে ছেলেটিকে দেখা যাচ্ছে, সে কে? অপ্রতিমের বাবার এমন প্রশ্নে সঙ্গে সঙ্গেই ফাহাদ জানায়, যার সঙ্গে অপ্রতিম হেটে যাচ্ছে, ছেলেটি তাদের বন্ধু তুহিন।
অপ্রতিমের বাবার কথা মতো ফাহাদ তাৎক্ষণিক তুহিনকে কল করে এবং জানতে চায় অপ্রতিম তার সাথে আছে কিনা? তুহিন জানায় অপ্রতিম তার কাছে আসেনি, এমনকি তুহিন এই মুহূর্তে তার নিজের বাসায়ই আছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দশটা।
দায় এড়াতে ও দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পরদিন সকালে মূল ঘাতক তুহিন তার এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে অপ্রতিমের বাবা-মাকে বাসায় এসে সান্ত্বনা দিয়ে যায় এবং অপ্রতিমকে খুঁজে পেতে যা যা করার সবই করবে বলেও জানায় তুহিন। এদিকে তখনও অপ্রতিমের নিথর দেহ পড়ে আছে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে।
এদিকে পরদিন সকালে পুলিশের হাতে আসা এক ফুটেজে অপ্রতিমের সাথে ফাহাদকেও দেখা যাচ্ছিলো।
সকাল এগারোটার কিছু পর খবর আসে অপ্রতিমের মৃতদেহ সানন্দা পাহাড়ের জঙ্গলে পাওয়া গেছে। অপ্রতিমের পরিবার তখন ফাহাদকে বলে, “অপ্রতিমের লাশ পাওয়া গেছে সানন্দা পাহাড়ের জঙ্গলে, আমাদের সাথে চলো। ফাহাদ তখন অপ্রতিমের পরিবারের সাথে সানন্দা পাহাড়ের দিকে এগোতে থাকে। অর্ধেক পথ যাবার পর ফাহাদ জানায় তার অন্য দিকে কাজ আছে, এখন যেতে পারবে না।” অর্ধেক পথ গিয়ে আর এগিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানানো ফাহাদ অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের মুহূর্ত নিজের ফেসবুক লাইভে শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখে “আইফোন?”
পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজের উপর ভিত্তি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা উনিশ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়া অপর দুই ঘাতক ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেপ্তার করে। আটক তিনজনই পুলিশের নিকট দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছে।
এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের বয়স কম বেশি যাই হোক তাদের অপরাধের নৃশংসতা আজ প্রাপ্তবয়স্ক পেশাদার কিলারদেরও হার মানিয়েছে।
একটি মোবাইল ফোনের তুচ্ছ মোহ কীভাবে অনুভূতির সমস্ত পারদ কে ভষ্মীভূত করে একজন মানুষকে রীতিমতো জল্লাদে পরিণত করতে পারে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড তার সবচেয়ে বড় এবং ভয়ানক উদাহরণ।
ইসলাম এই পাষণ্ডত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্খলনকে গোড়াতেই চিনেছে। রসূলুল্লাহ (স.) অসৎ সঙ্গের কু-প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, “মানুষ তার বন্ধুর জীবনধারা দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকেরই খেয়াল রাখা দরকার, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” (আবু দাউদ- ৪৮৩৩)

ডিজিটাল অনৈতিকতার বিষাক্ত ছোবল:

সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, কমেন্ট এবং ভিউ বাড়ানোর প্রবণতা ও এহেন লাইফস্টাইলে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়ে আজকের কিশোরদেরকে বড্ড বিকারগ্রস্ততার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন কেড়ে নেওয়ার লোভও কিন্তু এই ডিজিটাল দুনিয়া অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও নিজের সস্তা আভিজাত্য বাড়ানোর সংস্কৃতিরই অংশ। তারা প্রযুক্তিকে জ্ঞানার্জনের মাধ্যম না বানিয়ে, অসুস্থ বিনোদনের হাতিয়ার বানিয়েছে।
ইসলাম অপচয়, অহংকার এবং অন্যের সম্পদের প্রতি অবৈধ ও লোভাতুর দৃষ্টি দেয়াকে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন, “তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।” (বাকারাহ, আয়াত: ১৮৮)
সোশ্যাল মিডিয়ার গোলকধাঁধায় তৈরি হওয়া এই তীব্র লোভ ও হিংসার বিষাক্ত ছোবল থেকে সন্তানদের দূরে রাখার মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত পাহারাদারী অভিভাবকদেরই নিশ্চিত করতে হবে।

সন্তানের বড় হবার সময়ে অভিভাবকদের সচেতনতা:

সন্তানের নৈতিক অবক্ষয়ের পেছনে প্রথম এবং প্রধান দায় বর্তায় তার পরিবারের ওপর। আমরা সন্তানকে দুনিয়াবি সফলতার চূড়ায় দেখতে চাইরেও আখিরাতকেন্দ্রিক মানসিকতা ও ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করতে বেমালুম ভুলে যাই। অপ্রতিমের হত্যাকারী কিশোরদের পরিবার যদি তাদের সন্তানদের চলাচলের গতিবিধি ও নৈতিকতার ন্যূনতম খোঁজ রাখতো, তবে হয়তো এই ট্র্যাজেডি এড়ানো যেতো।
গণমাধ্যম মারফতে জানা যায়, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের আরো কিছুদিন আগে ঘাতক তুহিন তারই এক বন্ধুর একটি মোটরসাইকেল অভিনব কায়দায় চুরি করে। মোটরসাইকেল চুরি করার ঘটনাটিও ঠিক যেনো অপ্রতিমের আইফোন নিয়ে বের হবার সেদিনের ঘটনার মতোই ছিলো।
উভয় ঘটনাতেই ঘাতক তুহিন তার ওই বন্ধু এবং অপ্রতিমকে মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে কিংবা ফোনে কথা বলার মাধ্যমে রাজি করিয়ে ঘর থেকে বের করতে সক্ষম হয়। উভয় ঘটনায় পার্থক্য হলো, অপ্রতিমকে খুন হতে হয়েছে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করায় আর মোটরসাইকেল চুরির ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ব্যক্তি প্রতিবাদ না করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলো তাই সে প্রাণে বেঁচে যায়।
কিন্তু, তুহিনের পরিবার যদি সন্তানের চুরির এই ঘটনার পর সন্তানকে নিয়ে সতর্ক হতো তাহলে তুহিন আজ অপ্রতিমকে হত্যা করার মতো সুযোগ ও সাহস পেতোনা।
ইসলাম পরিবারকে সন্তানের প্রথম পাঠশালা হিসেবে ঘোষণা করেছে। রসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন,
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক, সে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহি করবে।” (বুখারী, হাদিস নং- ২৫৫৪)
হযরত লোকমান (আ.) যেভাবে তাঁর সন্তানকে বিনয়, নামাজ ও সৎ কাজের উপদেশ দিয়েছিলেন তা এ সমাজের প্রতিটি পিতা-মাতার জন্য আদর্শিক ও অনুকরণীয় মডেল হওয়া জরুরি।

নতুন আইন নয়, চাই চলমান আইনের সঠিক প্রয়োগ:

মোটরসাইকেল হারানো ছেলেটি তার পরিবারের মাধ্যমে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ বলেছিলো মামলার পরিবর্তে জিডি করতে। প্রশ্ন হলো, পুলিশ কেনো ভিক্টিমের মামলা না নিয়ে জিডি করতে বাধ্য করেছিলো?
এমনকি একাত্তর টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেই উঠে এসেছে যে, “তুহিনের বিরুদ্ধে মামলা কিংবা জিডি, কোনো তদন্তই আগানো যাবেনা মর্মে ভিক্টিমের পরিবারকে জানায় সদর দক্ষিণ থানা পুলিশ। কারণ হিসেবে জানায়, তুহিনের পেছনে একজন প্রভাবশালী নেতার হাত রয়েছে।”
পুলিশ প্রশাসনের এহেন আচরণে প্রতীয়মান হয় যে, যদি সেই মোটরসাইকেলের মামলা আমলে নিয়ে সঠিক তদন্ত করে তথাকথিত প্রভাবশালী নেতার হাতকে সূত্র ধরে সুনিপুণ তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে পারতো, তাহলে পরবর্তীকালে এই তুহিনের দ্বারা অপ্রতিমকে খুন করা সম্ভব হতোনা।
পুলিশ প্রশাসন তার প্রফেশনালিজমের জায়গা থেকে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়ায় আমাদের সমাজে এভাবেই একের পর এক তুহিনদের জন্ম হচ্ছে আর অপ্রতিমদের হারাতে হচ্ছে। শেষমেশ সঠিক বিচারও নিশ্চিত হচ্ছেনা।

দেশজুড়ে ‘কিশোরগ্যাং’ এর ভয়াবহ পরিস্থিতি:

সারাদেশের পাড়া-মহল্লায়, অলিতে-গলিতে ‘কিশোরগ্যাং’ এর যে বিস্তৃতি আমরা দেখছি, তা রীতিমতো এক সামাজিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে।
নোংড়া হিরোয়িজম, মাদক সেবন, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ই আজ কিশোরদের ভযঙ্কর দানবে পরিণত করছে। তারা সারা দেশে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ছিনতাই, রাহাজানি, ইভটিজিং এবং গ্যাংরাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভয়াল ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে।
আজকের কিশোররা যখন ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক ন্যূনতম অনুশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গ্যাং কালচারে হরহামেশাই জড়িয়ে যায়, তখন তাদের ভেতরের মানবিকতা কর্পূরের মতো উড়ে যায়।

প্রয়োজন ফলাফল নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন:

আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ফলাফল নির্ভর এক অন্ধ ও গাণিতিক প্রতিযোগিতায় নিমজ্জিত। একজন শিক্ষার্থীকে কীভাবে জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, কীভাবে নিজের রাগ-ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ (অহমবৎ গধহধমবসবহঃ) করবে, কিংবা অসৎ বন্ধুদের অসাধু আহবানকে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে শিখবে, তার কোনো পরিচ্ছেদ নেই।
অপ্রতিম ছেলেটি যে অত্যন্ত মেধাবী ও চঞ্চল প্রকৃতির, একথা তাঁর পরিবার থেকে শুরু করে পরিচিতজন সকলেই অবলীলায় স্বীকার করেন। কিন্তু শান্ত-শীতল অপ্রতিমের মনে এ আশঙ্কা ঘুর্ণাক্ষরেও জন্মায়নি যে, তাঁর চিরচেনা বন্ধুরা বিশ্বস্ততার আড়ালে জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়ার মতো নির্মম ফাঁদ পাততে পারে। সে বুঝতে পারেনি তাঁর পরিচিত মুখগুলোর আড়ালেই লুকিয়ে ছিলো হিংস্র নেকড়ে।
ভারতের বিখ্যাত দার্শনিক স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “শিক্ষা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার প্রকাশ। যে শিক্ষা মানুষকে চরিত্রবান হতে সাহায্য করে না, তা প্রকৃত শিক্ষা নয়।”
শিক্ষার সাথে নৈতিকতার যে অগাধ সমন্বয়, তা আজ আমাদের বিদ্যাঘর থেকে প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।

‘ভিক্টিম ও অপরাধী’ দুই পরিবারই বিধ্বস্ত:

অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম পেশায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি আপন মমতায় সন্তানতুল্য সহস্র শিক্ষার্থীকে পাঠ্যরুমে আলোর দিশা দেখিয়েছেন, অথচ কে জানতো? সহসাই তার নিজের কোলটাই শূন্য করে দেওয়া হবে চিরতরে?
একটি হত্যাকাণ্ড কেবল একটি প্রস্ফুটিত গোলাপ কে ডাল থেকে ছিঁড়ে ফেলে দেয়াই নয় বরং পুরো পরিবারটিকে এক জীবন্ত লাশে পরিণত করে।
আবার অন্যদিকে অপরাধী কিশোরদের পরিবারগুলোও সামাজিক অপবাদ ও অপরাধবোধের চরম গ্লানিতে নিক্ষিপ্ত হয়। এই দ্বিমুখী ক্ষত সমাজকে এক দীর্ঘস্থায়ী ট্রমার দিকে নিয়ে যায়।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের প্রস্তাবনা:

শুধুমাত্র পুলিশি ভয় দেখিয়ে কিংবা গ্রেফতার করে এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাধি পুরোপুরি নিধন সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী সামাজিক আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় স্তরসমূহের বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
এক. শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মূল্যবোধ সংযোজন: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু ফলাফল নির্ভর প্রতিযোগিতা বন্ধ করে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে। কেনোনা, “জ্ঞানহীন আমল যেমন ক্ষতিকর, তেমনি নৈতিকতাহীন শিক্ষাও সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক।”
দুই. পারিবারিক সচেতনতা: প্রতিটি পরিবারে কিশোরদের ক্ষতিকর গেমস্ ও সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট থেকে দূরে রাখতে হবে। বাবা-মাকে সন্তানের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটাতে হবে। সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, “শিশুর মন হলো একটি শূন্য স্লেটের মতো, অভিভাবকরা যা লিখবে, শিশু তা-ই শিখবে।”
তিন. সামাজিকভাবে প্রতিরোধ: প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সিনিয়র সিটিজেন, শিক্ষক ও সমাজকর্মীদের দিয়ে ‘কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করতে হবে। যারা কিশোরদের আড্ডার ওপর তীক্ষè নজর রাখবে।
চার. রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করে যথাযথ আইনের প্রয়োগ: কিশোরগ্যাং এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করা ও তথাকথিত বড় ভাইদের আধিপত্য বিস্তারের মতো সেন্সেটিভ ইস্যু।
সমস্ত প্রভাব-প্রতিপত্তিকে চিহ্নিত করে যেকোনো ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে আইনের যথাযথ প্রয়োগই এমন ভয়ংকর পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধে নিদারুণভাবে কাজ করতে পারে।
অপরাধী কিশোর হলেও অপরাধের ধরন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে অন্য কেউ এ জাতীয় কাজের পুনরাবৃত্তি করার সাহস না পায়। প্রয়োজনে কিশোর অপরাধ আইন সংশোধন করে হলেও, কেনোনা ইসলামে সংশোধনমূলক শাস্তির বিধান রয়েছে, যা সমাজকে কলুষমুক্ত রাখতে রাষ্ট্রকে কঠোর হওয়ার অধিকার দেয়।

আর কত অপ্রতিমের রক্তে ভিজবে এই মাটি?-

অপ্রতিমের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে আজ গোটা বাংলাদেশ। কিন্তু এই কান্না যেনো তিন দিনের শোকে হারিয়ে না যায়। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি অন্যয়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করলো, সে যেনো পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করলো।” (মায়েদা- ৩২)
যখন একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণহীন দেহ পাহাড়ি জঙ্গলে ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে পড়ে থাকে, তখন আসলে মৃত্যু ঘটে আমাদের জাতীয় সামাজিক মূল্যবোধ ও সামগ্রিক বোধ ও বিবেকের।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড কেবল একটি নিষ্পাপ শিশুর শারীরিক মৃত্যুই নয়, এটি আমাদের জাতীয় জীবনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
আসুন, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার; সবাই, সবাই একসঙ্গে জেগে উঠি। আওয়াজ তুলি, এই মুহূর্ত থেকে আর কোনো শিশুকে অপ্রতিমের মতো আমরা হত্যা হতে দিতে পারি না।
অনুভব করি, অপ্রতিম এখন আর শুধু তার বাবা-মায়ের সন্তান নয়, অপ্রতিম আমাদের সকলের।
লেখক: সোশ্যাল এক্টিভিস্ট ও সংগঠক
ফোন- ০১৬২৮৪৭৫৭৮০












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২