আজ ৯ অক্টোবরড. আখতার হামিদ খানের মৃত্যুবার্ষিকী। গ্রামীণ উন্নয়নচিন্তার ইতিহাসে এই দিনটি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার মতো একটি দিন। ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ইন্ডিয়ানাপলিসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু একজন উন্নয়নচিন্তক ও কর্মী হিসেবে তাঁর রেখে যাওয়া দর্শন, প্রতিষ্ঠান ও মাঠভিত্তিক অভিজ্ঞতা আজও দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের উন্নয়নকর্মীদের অনুপ্রাণিত করে।
ড. আখতার হামিদ খান ছিলেন এমন একজন উন্নয়নচিন্তক, যিনি উন্নয়নকে কেবল অর্থ, অবকাঠামো কিংবা সরকারি প্রকল্পের বিষয় হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘মানুষ, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব এবং মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা’। আর এই চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছিল তৎকালীন কুমিল্লা।
কুমিল্লা: একটি নতুন গ্রাম উন্নয়নচিন্তার পরীক্ষাগার
১৯৫০-এর দশকে কুমিল্লায় যে গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমের বিকাশ ঘটতে শুরু করে, তা পরবর্তীতে ‘কুমিল্লা মডেল’ নামে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করে। ড. আখতার হামিদ খান এই প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান স্থপতি ও চিন্তানায়ক ছিলেন।
তাঁর উন্নয়নদর্শনের একটি মৌলিক বিষয় ছিল-‘গ্রামের মানুষকে উন্নয়নের দর্শক নয়, বরং অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।’
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থা, সমবায়, প্রশিক্ষণ, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন না রেখে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিশেষ করে কৃষকদের সংগঠিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, যেগুলো নিজেদের সমস্যা নিজেরাই চিহ্নিত ও সমাধানের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে।
এই চিন্তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল- ‘উন্নয়নকে বাইরে থেকে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না; উন্নয়নকে মানুষের সঙ্গে নিয়ে তৈরি করতে হয়।’
ইঅজউ: একটি ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
ড. আখতার হামিদ খানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারের একটি হলো কুমিল্লায় একটি শক্তিশালী ‘প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও কর্মপরীক্ষাভিত্তিক গ্রামীণ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান’ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া।
কুমিল্লার এই প্রতিষ্ঠানই পরবর্তীতে ‘ইধহমষধফবংয অপধফবসু ভড়ৎ জঁৎধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ (ইঅজউ)’ হিসেবে বিকশিত হয়। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইঅজউ আজ বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োগমূলক গবেষণার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান।
ইঅজউ-এর বিশেষত্ব শুধু তার অবকাঠামো বা দীর্ঘ ইতিহাসে নয়; বরং এর ‘গবেষণা-প্রশিক্ষণ-কর্মপরীক্ষা’ ভিত্তিক ঐতিহ্যে। ড. আখতার হামিদ খানের সময় থেকে কুমিল্লায় যে চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল-গবেষণা যেন মাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয় এবং প্রশিক্ষণ যেন বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কহীন না হয়।
অর্থাৎ, ‘গ্রামের সমস্যা থেকে গবেষণার প্রশ্ন, গবেষণা থেকে কর্মপরীক্ষা, কর্মপরীক্ষা থেকে শিক্ষা এবং সেই শিক্ষা থেকে উন্নয়ন মডেল-এই ধারাটিই ছিল কুমিল্লার উন্নয়নচিন্তার একটি শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য।’
এই জায়গাতেই ইঅজউ-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
ইঅজউ কেবল একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের ইতিহাসের একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। কুমিল্লা মডেলের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি, সমবায়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নচর্চায় ইঅজউ-এর ভূমিকা বাংলাদেশের উন্নয়ন-ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
মানুষকে ক্ষমতায়ন: ড. খানের দর্শনের মূল কথা
ড. আখতার হামিদ খানের উন্নয়নচিন্তার দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে-তিনি শুধু মানুষের জন্য কাজ করতে চাননি; তিনি চেয়েছিলেন ‘মানুষ যেন নিজের উন্নয়নের সক্ষমতা অর্জন করে।’
এখানেই তাঁর চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সময়ের ‘পড়সসঁহরঃু-নধংবফ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ’ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক উন্নয়ন ধারণার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আজ আমরা বলি-
* পড়সসঁহরঃু ঢ়ধৎঃরপরঢ়ধঃরড়হ,* ষড়পধষ ষবধফবৎংযরঢ়,* ংড়পরধষ পধঢ়রঃধষ,* রহংঃরঃঁঃরড়হধষ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ,* পধঢ়ধপরঃু নঁরষফরহম,* ংবষভ-ৎবষরধহপব,* ঢ়বড়ঢ়ষব-পবহঃৎবফ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ।
কিন্তু বহু দশক আগে কুমিল্লার মাঠে এসব ধারণার অনেকগুলোই বাস্তব উন্নয়নকর্মের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছিল।
তাঁর কাছে গ্রামের মানুষ কেবল দরিদ্র বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ছিল না; তারা ছিল ‘সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ’। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে প্রচলিত দাতানির্ভর বা ওপর থেকে নিচে নামানো উন্নয়ন পদ্ধতির বাইরে নিয়ে যায়।
গবেষণা শুধু কাগজে নয়, মাঠেও
ড. আখতার হামিদ খানের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো ‘ধপঃরড়হ ৎবংবধৎপয’ বা কর্মভিত্তিক গবেষণার গুরুত্ব।
গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে শুধু অফিসে বসে পরিকল্পনা করা নয়-বরং মাঠে গিয়ে সমস্যা দেখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, নতুন পদ্ধতি পরীক্ষা করা, ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে আবার নতুন পরিকল্পনা তৈরি করা-এটি ছিল তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এ কারণেই কুমিল্লার অভিজ্ঞতা শুধু একটি স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প হয়ে থাকেনি। তা হয়ে উঠেছিল ‘একটি শেখার প্রক্রিয়া’।
আজ যখন উন্নয়ন বিশ্বে বারফবহপব-নধংবফ ঢ়ড়ষরপু, ঢ়রষড়ঃ ঢ়ৎড়লবপঃ, রহহড়াধঃরড়হ, রসঢ়ধপঃ ধংংবংংসবহঃ এবং ংপধষরহম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়, তখন ড. আখতার হামিদ খানের কাজের দিকে ফিরে তাকানো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
কুমিল্লা থেকে বিশ্বে
ড. আখতার হামিদ খানের উন্নয়নচিন্তার প্রভাব কুমিল্লার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের করাচিতে ‘ঙৎধহমর চরষড়ঃ চৎড়লবপঃ (ঙচচ)’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে নতুন ধরনের অংশগ্রহণমূলক মডেল গড়ে তোলার কাজ করেন।
এখানেও তাঁর দর্শনের একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়-মানুষের সমস্যাকে কাছ থেকে বোঝা, স্থানীয় সক্ষমতাকে কাজে লাগানো এবং স্থানীয় জনগণকে সমাধানের অংশীদার করা।
অর্থাৎ, কুমিল্লা কিংবা করাচি-স্থান ভিন্ন হলেও তাঁর উন্নয়নচিন্তার কেন্দ্রে ছিল ‘মানুষ ও তার সক্ষমতা’।
এই কারণেই ড. আখতার হামিদ খান শুধু বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন; তিনি উন্নয়নচিন্তার আন্তর্জাতিক ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য নাম।
আজকের বাংলাদেশের জন্য তাঁর শিক্ষা
প্রায় সাত দশক পর আমরা যখন বাংলাদেশের গ্রামকে দেখি, তখন বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে। যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বাজারব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
কিন্তু একই সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে-যুব বেকারত্ব, মাদক, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির পরিবর্তন, সামাজিক বৈষম্য, সরকারি সেবা সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা এবং গ্রামীণ তরুণদের সঙ্গে স্থানীয় সমাজের সম্পর্কের দুর্বলতা।
এই নতুন বাস্তবতায় ড. আখতার হামিদ খানের দর্শন আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্ন করতে শেখায়:
‘আমরা কি গ্রামের মানুষের জন্য উন্নয়ন করছি, নাকি গ্রামের মানুষকে উন্নয়নের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করছি?’
এই প্রশ্নটি আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ অবকাঠামো নির্মাণ করা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, অর্থ বরাদ্দ করা যায়; কিন্তু মানুষের মধ্যে ‘নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, জ্ঞান, সংগঠন এবং আত্মনির্ভরতার সক্ষমতা’ তৈরি না হলে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।
ইঅজউ-এর জন্যও এটি একটি চলমান দায়িত্ব
ড. আখতার হামিদ খানের উত্তরাধিকার স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় শুধু তাঁকে নিয়ে আলোচনা করা নয়; বরং তাঁর উন্নয়নচিন্তাকে নতুন সময়ের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা।
ইঅজউ-এর মতো একটি প্রতিষ্ঠান এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আজকের ইঅজউ-এর সামনে তাই একটি বড় সুযোগ রয়েছে- ‘কুমিল্লা মডেলের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর গ্রাম উন্নয়নের নতুন মডেল তৈরি করা।’
নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব, প্রযুক্তি, সামাজিক উদ্ভাবন, জলবায়ু সহনশীলতা, স্থানীয় সরকার, সামাজিক উদ্যোক্তা, নারী ও যুব নেতৃত্ব এবং পড়সসঁহরঃু-নধংবফ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ-এসব নতুন বাস্তবতাকে কুমিল্লার ঐতিহাসিক উন্নয়নচিন্তার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
কারণ ড. আখতার হামিদ খানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প বা কাঠামো নয়; বরং ‘একটি উন্নয়নদর্শন-শেখো, পরীক্ষা করো, মানুষের সঙ্গে কাজ করো এবং মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে আবার নতুনভাবে শেখো।’
শেষ কথা
ড. আখতার হামিদ খান ১৯৯৯ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু কুমিল্লার গ্রামীণ জনপদ, ইঅজউ-এর প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের গ্রাম উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর চিন্তার ছাপ আজও স্পষ্ট।
তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে তাঁর নাম উচ্চারণের পাশাপাশি তাঁর একটি মৌলিক বিশ্বাসকে নতুন করে ধারণ করা- ‘গ্রামকে উন্নত করতে হলে গ্রামের মানুষকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।’
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি। একই সঙ্গে কুমিল্লার মাটি থেকে বিকশিত সেই মানুষকেন্দ্রিক, অংশগ্রহণমূলক ও কর্মভিত্তিক উন্নয়নচিন্তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও আমাদের।
ড. আখতার হামিদ খান নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্নের গ্রাম উন্নয়নের দর্শন এখনো জীবন্ত।আর সেই দর্শনের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে -ইঅজউ।
লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
