
ডব্লিউএইচও’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ^ জুড়ে ৫ থেকে ৯ বছরের প্রায় ৭ কোটি শিশু স্থূলতায় ভুগছিল। একই সময়ে ১০ থেকে ১৯ বছরের প্রায় ১০ কোটি কিশোর-কিশোরী স্থ’ূলতায় ভুগছিল। ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে স্থূলতার হার গত কয়েকদশকে উল্লেখ্যযোগ্য হারে বেড়েছে। ১৯৯০ সালে এদের মধ্যে স্থূলতার হার ছিল প্রায় ২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ডব্লিউএইচও’র পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ডা. লুজ মারিয়া দে রেগিল বলেন, বিশে^র সব অঞ্চলেই শিশু কিশোরদের স্থূলতার হার বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ প্রবণতা বেশি। তাঁর মতে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্থূলতার চিকিৎসার ভিত্তি ঔষুধ বা অস্ত্রোপচার নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক আচরণগত পরিবর্তনের সুযোগ নিশ্চিত করাই এর মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশে একদিকে অপুষ্টি এখনও শিশুস্বাস্থ্যের বড় হুমকি, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে শিশু-কিশোরদের অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার প্রবণতা বাড়ছে। গত এপ্রিলে ইউনিসেফের ‘ফিডিং প্রফিট হাউ ফুড এনভারনমেন্টস আর ফেইলিং চিলড্রেন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি পরিস্থিতির এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছে। আগে তুলনামূলকভাবে উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বেশি দেখা গেলেও এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের মধ্যেও এ প্রবণতা বাড়ছে। ভাজাপোড়া, ফাষ্টফুড, মিষ্টি বিস্কুট ও কোমল পানীয় এর মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে পুষ্টির অভাবে দেশের গ্রামীন অঞ্চলের প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতিতে ভুগছে। ফলে বাংলাদেশে অপুষ্টির ডাবল বার্ডেন বা দ্বৈত বোঝা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে Ñএকদিকে অপুষ্টি, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা।
স্থূলতা মোকাবেলায় এ প্রথমবারের মত বৈশি^ক নির্দেশনা এসেছে, এতে জনপ্রিয় ওজন কমানোর ঔষধের বদলে খাদ্যাভাস, ব্যায়াম ও পরামর্শ দেয়ার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বয়টার্স জানায়, জাতিসংঘের শিশু তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ^জুড়ে স্কুলশিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অপুষ্টির সবচেয়ে সাধারণ ধরণ কম ওজনকে ছাড়িয়ে গেছে স্থূলতা। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী স্থূল কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে ওজন কমানোর ঔষধ ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে আগে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। সেসব পদ্ধতি কাজ না করলেই কেবল ঔষধের ব্যবহারের কথা ভাবা যাবে। সংস্থাটি আরো বলেছে, গুরুতর স্থূলতায় আক্রান্ত শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপক্ক কিশোর কিশোরীদের ক্ষেত্রে ওজন কমানোর অস্ত্রোপচার বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এর আগে অন্তত ছয় মাস চিকিৎসা দিয়ে ফল না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। ১০ বছরের কমবয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে স্থূলতার ঔষধ, অস্ত্রেপচার বা অন্য কোন যন্ত্র ব্যবহারের বদলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, শারীরিক কার্যক্রম এবং আচরণগত সহায়তার সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক ডা. লুজ মারিয়া দে রেগিল বলেন, ‘শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্থূলতা চিকিৎসার মূল ভিত্তি ঔষধ বা অস্ত্রোপচার নয়, বরং এমন পূর্ণাঙ্গ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরী, যাতে তারা স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পারে, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যকর আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে।
ডঐঙ বলেছে, স্বাস্থ্যকর খাবার ও শারীরিক কার্যক্রম সবার জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হতে হবে। শুধু চিকিৎসার মাধ্যমে স্থূলতা বাড়ার প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়। কিছু জিএলপি-১ ঔষধ এরই মধ্যে কমবয়সী রোগীদের ওজন কমানোর জন্য অনুমোদিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় ইউনিয়নে ১২ বছর বা তার বেশি কিছু কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে নভো নরডিক্সের ওয়েগোভী ও সাক্সেন্ডা ব্যবহার করা যায়। ইউরোপিয় ইউনিয়নে ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী কিছু শিশুদের ক্ষেত্রেও সাক্সেন্ডা ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। ডঐঙ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ১০ বছরের কম বয়সের শিশুদের স্থূলতার চিকিৎসায় ওজন কমানোর ঔষধ, পাকস্থলীতে অস্ত্রোপচার বা ওজন কমানোর কোন যন্ত্র যেন ব্যবহার করা না হয়। তবে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জীবনযাত্রা পরিবর্তনের কর্মসূচীতে কাক্সিক্ষত ফল না এলে অনুমোদিত ঔষধ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। গুরুতর স্থূলতার সঙ্গে স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকলে নির্দেশিত শর্তে ব্যারিয়াট্রিক সার্জারিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
