শুদ্ধতা, প্রগতি ও সৃজনশীলতার বাতিঘর অধ্যাপক শেখর রঞ্জন সাহা-
দেখতে দেখতে পাঁচটি মাস কেটে গেলো অথচ মনে হয় এই তো সেদিন। মাত্র এক মাসের সংক্ষিপ্ত ও আকস্মিক অসুস্থতায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করলেন আমার জীবন সঙ্গী কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবংস্বনামধন্য বিজ্ঞানমনষ্কও সৃজনশীল লেখক শেখর রঞ্জন সাহা। তাঁর এই হঠাৎ চলে যাওয়া আমার জীবনে যে বিশাল শূন্যতা আর মানসিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে তা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। এক তীব্র নিঃসঙ্গতা এখন আমার জীবনের প্রতিটি মূহূর্তকে যেনো গ্রাস করে ফেলতে চাইছে। এই অবসাদগ্রস্থতা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে ফিরছি প্রতিনিয়ত। কোথায় কিভাবে কোন কাজে নিজেকে ব্যস্তরাখলে এই মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারবো যে পথ খুঁজতে খুঁজতেই মনে হলো হয়তো এই স্মৃতিলিখন আমাকে আমার যাপিত জীবনের যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি দিতে পারে।
স্বনামখ্যাত শিক্ষক, লেখক শেখর রঞ্জন সাহার সাথে আমার স্মৃতিময় পথচলার সূচনা হয়েছিল ১৯৮১ সালে।সেসময়ে আমি সরকারি মহিলা কলেজে বি.এসসি শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি। আর তিঁনি তখন সবেমাত্র ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মহিলা কলেজে বদলী হয়ে এসেছেন। আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন তিঁনি। প্রতিটি ক্লাসে তাঁর পড়াবার ধরণ ছিলযাদুকরী, মোহময়। সত্যি বলতে কি ক্লাসে কথা বলবার সময়তাঁর অবয়বের মধ্যে এক অনুকরণীয় আভিজাত্য, অদ্ভূত সৌন্দর্য ফুটে উঠত। এমনিতে তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী। কিন্তু ক্লাসে বা ক্লাসের বাইরে প্রমিত বাংলায়, বিশুদ্ধ উচ্চারনে যখন তিনি কথা বলতেন চারপাশের পরিবেশ যেন অপূর্ব এক স্নিগ্ধ আভিজাত্যে ভরে উঠতো। তাঁর এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েই আমি ওনার প্রতি আকৃষ্ট হই। তিনি কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না ছিলেন অনুকরনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এক অনন্যসাধারণ সত্ত্বা। প্রকৃতির সাধারণ নিয়মেই সবাইকে সবাই আকৃষ্ট করতে পারে না। সবাইকে সবার ভালো লাগে না-লাগতে পারেনা। রুচি ও মনের মিল যেখানে হয়, পরস্পরের প্রতি আস্থা আর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই সেখানে জন্ম নেয় ভালোবাসার অনুভূতি। আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তার ব্যতয় ঘটেনি। আমাদের পছন্দের অপছন্দের অপূর্ব সাযুজ্য ছিল। তিনি ক্রিকেট অনুরাগী ছিলেন, আমিও তাই। তখন তো লাইভ খেলা দেখার মতো সুযোগ ছিল না। রেডিওতে আমরা কমেন্ট্রি শুনতাম। এভাবেই হাসি-আনন্দে, আদরে-শাসনে আমাদের সম্পর্কসূত্র গভীর থেকে গভীরতর হয় দিনে দিনে। চলার পথে অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে ১৯৮৭ সালে আমাদের বিয়ে হয়। তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরতা এতটাই মনোমুগ্ধকর ছিলো যে আমাদের ৩৯ বছরের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে কোনদিন কোন বিষয়ে আমাদের মধ্যে সামান্য মতানৈক্য কিংবা কলহ হয়নি। বিরক্তি কিংবা বৈকল্য আসেনি। তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক রয়ে গেছে প্রথম দিনটির মতোই মুগ্ধতায় ভরা, অনাবিল আনন্দময়। আপাদমস্তক বই পাগল এই মানুষটি দিনের অধিকাংশ সময়েই বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতেন। নিরলস লেখালেখি করতেন। আর আমার কাজ ছিল তাঁর জ্ঞান চর্চার পথকেপ্রতিদিন একটু একটু করে গতিময় করা, আনন্দময় করা। তাঁর এই বই পড়া, লেখালেখি, সহকর্মী/ছাত্র/বন্ধুদের সাথে প্রিয় বিষয়ে আলোচনা, পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর সন্তানসম শিক্ষার্থী, আত্মীয়দের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়ে গাইডেন্স করার যে প্রাত্যহিক রুটিন সেটার সাথে নিজেকে আত্মীকরণ করে নেওয়াতেই ছিল আমার তৃপ্তি। শুধুমাত্র সন্তানসম শিক্ষার্থী, আত্মীয়দেরই নয় আমাদের দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি আমার চমৎকার জীবন সঙ্গীই হিসেবেই নয়, আমার পড়ালেখা ও ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড়ো মেন্টর এবং সচেতন অভিভাবক। আমি নিজেও কুমিল্লা শহরের একটি স্বনামধন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলাম। আমার শিক্ষকতা জীবনের পুরোটা জুড়েই তাঁর অবদান ছিলো অপরিসীম। ক্লাসেরপাঠ্যক্রম বা একাডেমিক যে কোনো বিষয়ে সাহায্যের প্রয়োজন হলে তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে অতি সহজে নিখুতভাবে সমস্যাটির সমাধান করে দিতেন। সব ব্যাপারে তাঁর কাছে আমি এতটাই ঋণী যে তা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আমার নেই। উনার এই দিকনির্দেশনা আর ছায়া সরে যাওয়ায় আজ আমি নিজেকে বড্ড অসহায় ও বড় একা হিসেবে আবিষ্কার করছি। আমার পথ চাওয়ার যে ক্ষণ গত চারমাস আগে শুরু হয়েছে তা যেনো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।
শেখর রঞ্জন সাহার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় ছিল কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ ও নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা। ফরিদপুরের অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও বংশীয় আভিজাত্যের অহংকার তাঁকে কখনো স্পর্শ করেনি। বরং জীবনের বাস্তবতা ও প্রতিকূলতাই তাঁকে ছোটবেলা থেকে গড়ে তুলেছিল একজন আত্মপ্রত্যয়ী, পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী মানুষ হিসেবে।
বিভিন্ন সময়ে বাবার ব্যবসায়িক অবস্থার অবনতি হওয়ায় শৈশবেই তাঁকে জীবনের নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো নিজের পড়াশোনার প্রতি সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা থেকে বিচ্যুত হননি। মেধা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং কঠোর পরিশ্রমকে পুঁজি করে তিনি বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে ভালো ফলাফল অর্জন করেছেন। শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিক সাফল্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে এম.এসসি. পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন।
শিক্ষাজীবনের এই অসামান্য সাফল্যের পর তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাঁর বর্ণাঢ্য ও গৌরবময় কর্মজীবনÑযে জীবনের ভিত্তি ছিল জ্ঞান, নিষ্ঠা, সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর পারিবারিক দায়িত্ববোধ ছিল অতুলনীয়। বাবার মৃত্যুর পর অতি তরুণ বয়সেই তিনি মা, ভাই-বোনসহ পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে ভাই-বোনদের লেখাপড়া করিয়েছেন, তাঁদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জীবনের অনেকটা সময় তিনি নিঃস্বার্থভাবে পরিবারের দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন জীবনসঙ্গী হিসেবে কাছ থেকে তাঁর এই আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁর এই বিশাল হৃদয়, গভীর মানবিকতা এবং আপনজনদের জন্য নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মানসিকতাই তাঁকে সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিল। আমার কাছে তাঁর সম্মান প্রতিদিন বেড়ে গিয়েছে বহুগুণে।
তাঁর সবচেয়ে বড় গুণগুলোর একটি ছিলÑতিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নির্মোহ ও অবৈষয়িক একজন মানুষ। টাকা-পয়সা কিংবা পার্থিব সম্পদের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র লোভ বা আসক্তি ছিল না। জীবনের নানা প্রয়োজনে অর্থের প্রয়োজনীয়তা তিনি বুঝতেন, কিন্তু অর্থ কখনোই তাঁর জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠেনি। জাগতিক সমস্ত বৈষয়িক চিন্তা ও মোহের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সারাজীবন নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন বইয়ের অতল সাগরে। বই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী, জ্ঞান ছিল তাঁর আনন্দ, আর জ্ঞান অর্জন ছিল তাঁর জীবনের এক গভীর সাধনা।
পেশাগতভাবে তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার পরিধি কখনোই শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিষয়ভিত্তিক বইয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস ও পরিবেশ নিয়ে তিনি লিখেছেন। তাঁর অসাধারণ কিছু বইয়ের মধ্যে রয়েছেÑ মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো, বইয়ের কথা, হাসতে তাদের মানা, কোথায় যাব আমরা, ফিরে দেখা, একটু ভাবুন, জীববিজ্ঞানের পাঁচ মহানায়ক, কালজয়ী মানুষের গল্প, বই পড়ার আনন্দ, জীব ও জৈব প্রযুক্তির গল্প, ডাইনোসরের লেডি মেরি অ্যানিংÑইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
তাঁর লেখা বইগুলো গভীর সাহিত্যমনস্কতা, চিন্তার গভীরতা ও মননশীলতার পরিচয় বহন করে। বইয়ের প্রতি তাঁর যে গভীর ভালোবাসা ছিল, তা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি চাইতেন অন্যরাও বই পড়ুক, জ্ঞানের আনন্দে সমৃদ্ধ হোক। বিশেষ করে শিশুদের মনের খোরাক জোগাতে তিনি চমৎকার সব শিশুতোষ লেখা লিখেছেন। ঢাকা থেকে প্রচুর বই এনে তিনি নিজের কাছে জমিয়ে রাখতেন এবং শিশুদের বই উপহার দিতে ভীষণ ভালোবাসতেন। কোনো শিশুর হাতে একটি বই তুলে দিতে পারলে তাঁর চোখেমুখে যে আনন্দ ফুটে উঠত, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার এই আনন্দ ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অনন্য সৌন্দর্য।
উচ্চতর অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর রচিত বায়োলজি ডিকশনারি ও উদ্ভিদবিজ্ঞান ডিকশনারি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য অবদান। জ্ঞানকে সহজ ও সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে গভীর তাগিদ তাঁর মধ্যে ছিল, এই বইগুলো তারই বহিঃপ্রকাশ। আর তাঁর আরেকটি অসাধারণ ও মূল্যবান সৃষ্টি হলো তাঁর আত্মজীবনী বা বায়োগ্রাফিমূলক বইটি। বইটি শুধু তাঁর জীবনের ঘটনাপ্রবাহ নয়; এটি তাঁর জীবনবোধ, সংগ্রাম, চিন্তা, দর্শন ও মূল্যবোধের এক জীবন্ত দলিল।
জীবনের শেষ সময়েও তাঁর সৃষ্টিশীলতা থেমে থাকেনি। জীবনের শেষ সময়ে তিনি আটটি বইয়ের কাজ শেষ করে গিয়েছিলেন। কতটা আগ্রহ আর স্বপ্ন নিয়ে তিনি সেই বইগুলোর কাজ শেষ করেছিলেন, তা আমি জানি। কতবার যে তিনি সেগুলো নিয়ে কথা বলেছেন, কত পরিকল্পনা করেছেনÑতার হিসাব নেই। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় আফসোস, সেগুলো প্রেসে দিয়ে প্রকাশিত বইগুলো নিজের হাতে নিয়ে দেখে যেতে তিনি পারলেন না। এই আক্ষেপ আমার মনে সবসময়ই থেকে যাবে। তাঁর অপ্রকাশিত সৃষ্টিগুলো তাই আমার কাছে শুধু কিছু পাণ্ডুলিপি নয়; এগুলো তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য স্মারক, তাঁর শেষ স্বাক্ষর, তাঁর রেখে যাওয়া এক বিশাল উত্তরাধিকার।
শেখর রঞ্জন সাহার বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর আধুনিক ও প্রগতিশীল জীবনবোধ। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। সব ধরনের কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মুক্তভাবে চিন্তা করতেন। অন্ধবিশ্বাসের কোনো স্থান তাঁর চিন্তায় ছিল না। সমাজ ও জীবন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আধুনিক, যুক্তিনির্ভর ও প্রগতিশীল। আমাকে তিনি সবসময় স্বাধীন ও মুক্তচেতা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে জীবন কাটাতে গিয়ে আমিও তাঁর এই মুক্ত ও যুক্তিবাদী চিন্তার গভীর প্রভাব অনুভব করেছি।
জ্ঞানের তৃষ্ণা ছিল তাঁর সীমাহীন। শেষ জীবনে তিনি প্রায়ই বলতেন, ইন্টারনেটের কল্যাণে অনলাইনে লক্ষাধিক টাকার বই পড়ে তিনি শেষ করেছেন। বয়স তাঁকে কখনো জ্ঞান অর্জনের পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নতুন কিছু জানার, পড়ার ও বোঝার আগ্রহ তাঁর মধ্যে অটুট ছিল। জ্ঞান অর্জনই ছিল তাঁর জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। বইয়ের পাতায়, জ্ঞানের অনুসন্ধানে এবং নতুন কিছু জানার আনন্দেই যেন তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিতৃপ্তি খুঁজে পেতেন।
সত্যি বলতে গেলে, তিনি কেবল একজন অনুকরণীয় মানুষ বা শিক্ষকই ছিলেন না। তিনি ছিলেন সততা, নির্মোহ জীবনবোধ, প্রগতিশীলতা, বিজ্ঞানপিপাসা ও পাণ্ডিত্যের এক জীবন্ত কোলাজ। একজন স্ত্রী হিসেবে তাঁর দীর্ঘ জীবনের সহযাত্রী হয়ে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছিÑজমিদার বংশের আভিজাত্য পেছনে ফেলে কীভাবে তিনি প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম করে জীবনে শীর্ষস্থান অর্জন করেছেন; কীভাবে তরুণ বয়সেই নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে পরিবারের হাল ধরেছেন; কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে ভাই-বোনদের মানুষ করেছেন; কীভাবে জাগতিক লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে সারাজীবন জ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন; বইয়ের ভেতর দিয়ে ভূবনকে দেখে তাঁর জ্ঞানের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন; উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীদের জন্য মূল্যবান ডিকশনারি ও অমূল্য আত্মজীবনী রচনা করে ভবিষ্যতের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই তাই আমার কাছে এক একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বিজ্ঞানমনস্কতা, শুদ্ধ বাচনভঙ্গি এবং অবৈষয়িক জীবনদর্শনের এমন দুর্লভ সংমিশ্রণ বর্তমান সমাজে সত্যিই বিরল। তাঁর সঙ্গে জীবন কাটাতে গিয়ে আমি বুঝেছি, একজন মানুষ কতটা সরল, নির্মোহ অথচ একই সঙ্গে কতটা গভীর ও প্রজ্ঞাবান হতে পারেন। তিনি কখনো অর্থ-বিত্ত কিংবা পার্থিব প্রাচুর্যের পেছনে ছোটেননি; বরং জ্ঞান, বই, চিন্তা ও মানুষের কল্যাণের মধ্যেই জীবনের অর্থ খুঁজে নিয়েছেন। তাঁর এই জীবনদর্শন আজ আমার কাছে আরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছেÑবিশেষ করে তাঁকে হারানোর পর।
তাঁর চলে যাওয়া কেবল আমার জীবনে এক চরম নিঃসঙ্গতা তৈরি করেনি; মনে হয়েছে, আমার জীবনের সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গাটিই যেন হঠাৎ শূন্য হয়ে গেছে। যে মানুষটির সঙ্গে জীবনের এতগুলো বছর, এত স্মৃতি, এত কথা, এত স্বপ্ন ভাগ করে নিয়েছি, আজ তিনি নেইÑএই সত্য মেনে নেওয়া আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন। একই সঙ্গে মনে হয়, সমাজ থেকেও যেন একটি প্রদীপ্ত আলোর স্তম্ভ হারিয়ে গেল। আজ চারপাশজুড়ে এক গভীর হাহাকার, এক অদ্ভুত নিঃশব্দতা। তাঁর অনুপস্থিতি প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে তাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর এই চিরবিদায় আমার জন্য মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন।
তবু এই গভীর শোক ও নিঃসঙ্গতার মধ্যেও আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি যে অপ্রকাশিত বইগুলো রেখে গেছেন, সেগুলো প্রকাশের দায়িত্ব এখন আমার। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোকে পূর্ণ করার চেষ্টা করাই হবে তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার একটি ছোট্ট প্রতিদান। তিনি যে সৃষ্টিগুলো রেখে গেছেন, সেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে হয়তো মনে হবে, তিনি তাঁর চিন্তা, তাঁর জ্ঞান, তাঁর লেখা এবং তাঁর জীবনদর্শনের মধ্য দিয়েই আমাদের মাঝেই বেঁচে আছেন।
তাঁর মহান গুণাবলি, আদর্শ, সততা, নির্মোহ জীবনবোধ এবং জ্ঞানপিপাসা আমার বেঁচে থাকার একমাত্র পাথেয় হয়ে থাকবে। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, তাঁর বলা কথা, তাঁর জীবনযাপন এবং তাঁর চিন্তার জগৎ আমার জীবনের প্রতিটি দিনকে পথ দেখাবে। তাঁর অনুপস্থিতির শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু তাঁর আদর্শকে ধারণ করে বেঁচে থাকাই হবে তাঁর প্রতি আমার সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা।
তিনি যে অমূল্য সৃষ্টিগুলো রেখে গেছেন, তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি যেন একদিন আলোর মুখ দেখেÑএটাই আমার একান্ত কামনা। তাঁর বইগুলো যেন মানুষের হাতে পৌঁছায়, নতুন প্রজন্ম তাঁর লেখা পড়ে, তাঁর চিন্তা ও আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নেয়Ñএই স্বপ্ন আমি বুকে ধারণ করে রাখব। তাঁর জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার আলো যেন দীর্ঘদিন মানুষের পথ দেখায়, তাঁর পবিত্র আত্মা যেন অনন্তকালের জন্য পরম শান্তিতে বিশ্রাম পায়Ñএই আমার একান্ত প্রার্থনা। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি আমার সঙ্গী ছিলেন; এখন তাঁর স্মৃতি, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর বই আর তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য সৃষ্টিগুলোই আমার নিত্যসঙ্গী। জীবনের বাকি পথটুকু তাঁর স্মৃতি ও আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করেই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে।
বিনম্র শ্রদ্ধা, গভীর ভালোবাসা ও অশ্রুসিক্ত স্মৃতিতে-
গৌরী দাস
প্রাক্তন সহ: শিক্ষক
প্রয়াত অধ্যাপক শেখর রঞ্জন সাহার সহধর্মিণী