
নোবেল পুরস্কার বিশ্বব্যাপী অন্যতম সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মান হিসেবে বিবেচিত; পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, শরীরতত্ত্ব বা চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য, শান্তি এবং অর্থনীতি-এই ক্ষেত্রগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রতি বছর এটি প্রদান করা হয়। নোবেল পুরস্কার নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত এমন এক সম্মাননা, যা “মানবজাতির জন্য সর্বাধিক কল্যাণসাধন”-এর নীতি অনুযায়ী প্রদান করা হয়। সুইডিশ ও নরওয়েজীয় কমিটিসমূহ এই পুরস্কার প্রদান করে।
সুইডিশ রসায়নবিদ, প্রকৌশলী, ‘আলফ্রেড নোবেল’ এ পুরস্কার প্রবর্তন করেন। জীবদ্দশায় তাঁর নামে ৩৫৫টি পেটেন্ট ছিল; এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ১৮৬৭ সালে ডিনামাইট আবিষ্কার। একটি ফরাসি সংবাদপত্রে ভুলবশত তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করে তাঁকে ‘মৃত্যুর সওদাগর’ হিসেবে অভিহিত করার পর, নোবেল তাঁর ভাবমূর্তি বা উত্তরাধিকার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৯৫ সালে করা তাঁর শেষ ইচ্ছাপত্রে তিনি তাঁর বিপুল সম্পদের ৯৪ শতাংশ (প্রায় ৩ কোটি ১০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা; ২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও শান্তিতে বার্ষিক পুরস্কার প্রদানের জন্য উৎসর্গ করে যান। আলফ্রেড নোবেল তার উইলে স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন যে, এই পুরস্কার তাদেরই দেওয়া হবে যারা পূর্ববর্তী বছরে “মানবজাতির সবচেয়ে বড় উপকার”করেছেন। আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সভেরিগেস রিক্সব্যাংক ষষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করে। ১৯০০ সালের ২৯ জুন একটি বেসরকারি সংস্থা হিসেবে নোবেল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর কাজ হলো নোবেল পুরস্কারের অর্থ ও প্রশাসনিক বিষয়াবলি পরিচালনা করা। ২০২৬ সালের জন্য প্রতিটি পূর্ণাঙ্গ পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪,৭৯,৭৬,৩৮০ বাংলাদেশী টাকা (প্রতি ১ সুইডিশ ক্রোনা = প্রায় ১২.৩৩ টাকা)।
১৯০১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে, মোট ৬৩৩ বার ১,০১৮ জন ব্যক্তি ও সংস্থাকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে; পাঁচজন ব্যক্তি এবং দুটি সংস্থা একাধিকবার নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র সর্বাধিক সংখ্যক নোবেল পুরস্কার জিতেছে; দেশটিতে নোবেলজয়ী ব্যক্তির সংখ্যা ৪২৫ থেকে ৪৩২-এর বেশি। পাকিস্তানের মানবাধিকার ও শিক্ষা কর্মী মালালা ইউসুফজাই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০১৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের জন বি. গুডএনাফ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল পুরস্কার জয়ী ব্যক্তি। তিনি ৯৭ বছর বয়সে ২০১৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এবার দেখা যাক ২০২৬ সালে কারা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
পদার্থবিজ্ঞান : রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসন এর পদার্থবিদ ফ্রান্সিস হালজেন-কে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করেছে। তিনি আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে তার অসামান্য অবদানের জন্য এই পুরস্কার অর্জন করেন। মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো কণা (যা ‘ভূতুড়ে কণা’ হিসেবেও পরিচিত) আবিষ্কার ও গবেষণার জন্য তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। নিউট্রিনো সর্বত্রই রয়েছে, কিন্তু তারা নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় না। আমাদের অগোচরেই এরা পৃথিবী এবং আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে অনায়াসে চলে যায়। খুব কদাচিৎ কোনো একটি নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সাথে বিক্রিয়া করে; আর ঠিক এই ঘটনাটির কারণেই উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। অত্যন্ত উচ্চ শক্তির নিউট্রিনোগুলো অন্যান্য ধরনের কণার মতোই একই পরিবেশে উৎপন্ন হয়। তবে অন্যান্য কণার বিপরীতে, নিউট্রিনোগুলো কোনো দিক পরিবর্তন বা শক্তি না হারিয়েই আমাদের কাছে পৌঁছায়। এর অর্থ হলো, এগুলো এমন সব তথ্য প্রদান করতে পারে যা অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া সম্ভব নয়। আইসকিউব কর্তৃক নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগৃহীত নিউট্রিনো মিথস্ক্রিয়াগুলো গবেষকদের এমন সব চরম ও উত্তাল পরিবেশ সম্পর্কে অভিনব জ্ঞান জোগাবে যেখানে উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো সৃষ্টি হতে পারে-এমনকি এর মাধ্যমে মহাজাগতিক কোনো অজানা ঘটনারও উন্মোচন ঘটতে পারে।
রসায়ন : ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার যৌথভাবে প্রদান করা হয়েছে- ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদ, ফ্রান্স এর রসায়নবিদ হেনরি বি. কাগান, টোকিও ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স, জাপান এর রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই-কে। তাঁদের এ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে “অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে অ-রৈখিক প্রভাব এবং স্ব-অনুঘটক প্রক্রিয়ার আবিষ্কারের জন্য”। তাঁরা অণুর ‘আয়না-ছবি’ বা কাইরালিটি সংক্রান্ত শতবর্ষ পুরোনো একটি রহস্যের সমাধান করেছেন। এই আবিষ্কার নিরাপদ ওষুধ তৈরি এবং রাসায়নিক শিল্পে বিপ্লব এনেছে, কারণ অনেক ওষুধের একটি রূপ উপকারী হলেও অন্য রূপটি ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এ আবিষ্কার রসায়নবিদদের এমন সব রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানোর সক্ষমতা দিয়েছে যার ফলে ‘হোমোচিরালিটি’ বা অণুর একমুখী বিন্যাস তৈরি হয়। ঔষধ তৈরির জন্য রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রণয়নকারী রসায়নবিদদের কাছে তাঁদের আবিষ্কারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান: ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞান বা শারীরবৃত্তীয় বিষয়ে যৌথভাবে ৩ জনকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করেছে: কার্ল ডাইসেরথ, হাওয়ার্ড হিউজ মেডিকেল ইনস্টিটিউট এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র; পিটার হেগেম্যান, হামবোল্ট ইউনিভার্সিটি অফ বার্লিন, জার্মানি; গেওর্গ নাগেল, ইউনিভার্সিটি অফ উর্জবার্গ, জার্মানি। ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং ‘অপটোজেনেটিকস’ আবিষ্কারের জন্য। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যার সাহায্যে আলো ব্যবহার করে মস্তিষ্কের একক স্নায়ুকোষ বা নিউরনকে খুব নিখুঁতভাবে চালু কিংবা বন্ধ করা যায়। স্নায়ুরোগ, মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী, স্মৃতি ও আচরণ কীভাবে কাজ করে তা বোঝার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার নতুন যুগের সূচনা করেছে। এই পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞানীরা স্নায়ুবিজ্ঞানের জগতে এক নতুন যুগের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। অপটোজেনেটিক্স মস্তিষ্ককে এমনভাবে মানচিত্রায়িত করার সুযোগ করে দেয়, যা একসময় কেবল কল্পনাই করা যেত।
সাহিত্য: ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার কানাডীয় লেখিকা অ্যান কারসনকে প্রদান করা হয়েছে, তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সৃষ্টিকর্মের জন্য-যা ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সাথে এক কৌতুকপূর্ণ ও সৃজনশীল মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমসাময়িক সাহিত্যের জন্য নতুন সব রূপ সৃষ্টি করেছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শব্দের উৎপত্তি ও ইতিহাস নিয়ে গভীর অনুসন্ধান আর নতুন অর্থ খোঁজার চেষ্টা। শব্দের ব্যুৎপত্তিকেই তিনি নিজের সব কাজের শুরুর জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর লেখায় প্রাচীন গ্রিক পুরাণ, দর্শন ও আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির মেলবন্ধন দেখা যায়। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ-বিভিন্ন সাহিত্যরীতির সীমানা পেরিয়ে তিনি নিজস্ব লেখার ধরন তৈরি করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হচ্ছে ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত 'অটোবায়োগ্রাফি অব রেড পদ্য উপন্যাস।
শান্তি: শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি নাভানেথাম “নাভি” পিল্লাইকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করেছে। তিনি অসাধারণ সাহস ও সততার সাথে একটি অধিকতর সামগ্রিক বৈশ্বিক আইনি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ বছরের পুরস্কার বিজয়ী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সার্বজনীন আইনি নীতির প্রতি অবিচল নিষ্ঠা এবং দৃঢ় নৈতিক অবস্থান নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার (অ্যাপার্থেইড) সময় ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এক পরিবারে জন্মগ্রহণকারী পিল্লাই একজন আইনজীবী ও আইন-সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অগ্রদূত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং গভীর কাঠামোগত বৈষম্য, বর্ণভিত্তিক পৃথকীকরণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট, রুয়ান্ডা বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন এবং অতি সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতিত্ব করেছেন। বর্তমানে নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় একজন বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক সব মামলায় তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আইনি পদক্ষেপ যুদ্ধ ও সহিংসতার ঘটনা প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
অর্থনীতি: ২০২৬ সালে অর্থনীতিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই অর্থনীতিবিদ- স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট ই. হল এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল উডফোর্ড। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস ১২ অক্টোবর ২০২৬ সালে তাঁদের নাম ঘোষণা করে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী গবেষণার জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁরা নতুন ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করেছেন, যা সরকারের আর্থিক নীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিকে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করে। তাঁদের আবিষ্কৃত মডেলের ওপর ভিত্তি করে নীতি নির্ধারকরা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা মন্দা ও তীব্র অর্থনৈতিক ওঠানামার ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা মানবজাতির কল্যাণে এবং বিশ্বের অগ্রগতিতে অনন্য অবদান রেখেছেন। তাঁরা যখন তাঁদের গবেষণা, সাহিত্যকর্ম বা শান্তির পক্ষে কাজ শুরু করেছিলেন, তখন কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতির আশা নিয়ে করেননি; বরং তাদের চালিকাশক্তি ছিল এক পরম জ্ঞানপিপাসা, মানবপ্রেম এবং সমাজের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ। চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, অর্থনীতি বা সাহিত্যের আবিষ্কারগুলো আজ আমাদের জীবনকে সহজ, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ করেছে। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ল্যাবরেটরিতে কাটিয়ে দেন, সাহিত্যিকরা সমাজকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে লেখেন, আর শান্তিকর্মীরা নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। এই দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রায় নোবেল পুরস্কারের মতো কোনো বৈষয়িক লোভ তাদের লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে না। তারা পৃথিবীকে যেভাবে পেয়েছেন, তার চেয়ে আরও সুন্দর ও উন্নত করে রেখে যাওয়ার এক অন্তর্গত তাগিদ ও দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করেন। তাদের আবিষ্কার ও কাজ আজ সমগ্র পৃথিবীবাসীর যৌথ সম্পদ- তাঁদের আবিষ্কার এবং সৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বা সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না।
নোবেলজয়ীদের কাজের মূল স্পিরিট বা চেতনা হলো মানবতার কল্যাণ, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক সমস্যার টেকসই সমাধান খোঁজা। এই চেতনাকে নিজের জীবনে ধারণ করে একটি আলোকিত বিশ্ব গঠনে আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে পারি। সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজ থেকে কুসংস্কার ও অজ্ঞতা দূর করা সম্ভব হবে। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থানে সাহায্য করা দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করা, গাছ লাগানো ও অপচয় রোধ করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। বিভিন্ন সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী বা দাতব্য সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন দ্রুততর হতে বাধ্য। একটি আলোকিত ও সুন্দর বিশ্ব কোনো একক ব্যক্তি বা নেতার পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সমষ্টিগতভাবে আমাদের এই ছোট ছোট প্রচেষ্টাই একদিন একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। একথা অনস্বীকার্য যে, যখনই আমরা প্রত্যেকে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করব এবং অন্যের কল্যাণে হাত বাড়াব, তখনই নোবেলজয়ীদের সেই মহান স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করবে।
লেখক ঃ গবেষক, কলাম লেখক, সমাজকর্মী এবং একজন সরকারি কর্মচারী।
