‘আঙ্কেল আমার বাবাকে ফেরত দিতে পারবেন, যত টাকা লাগে আমি দেব, তবুও আমার বাবাকে ফেরত চাই। আমার কলিজা ফাইট্টা যাইতেছে আঙ্কেল, আমার বাবা আর আসবে না। বিকালে ভাত খাইতে বসছিল, আমার পা ভাঙা তাই বাবা আমাকে শেষবারের মতো লোকমা দিয়ে ভাত খাওয়াইছে। তখন লিমন কাকা কী একটা জিনিস দেওয়ার কথা বলে বাবাকে ডেকে নেয়। এরপর ছুরি দিয়ে বাবাকে কোপাতে থাকে। আমি চিৎকার করে বলছি, “লিমন কাকু, আমার বাপেরে আর মাইরো না।” কিন্তু কাকা আমার কথা শোনেনি। আমার চোখের সামনে বাবাকে মাইরা ফেলছে।’ কথাগুলো বলতে বলেই হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠে ১০ বছরের সাদিয়া আক্তার। বাবাকে হারানোর শোক যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে সে। কথা বলার সময় কখনো মায়ের দিকে কখনো গ্রামের মানুষের মুখের তাকাচ্ছে। কাঁদছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেলে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের বারুর গ্রামে সাদিয়ার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। ভাঙা পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে উঠানে বসে আছে সাদিয়া আক্তার। কিছুদিন আগে গাছ থেকে পড়ে তার ডান পা ভেঙে যায়। এর মধ্যেই বাবাকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়েছে সে। সাদিয়া বারুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়ে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। বাড়ির এক কোণে বসে বিলাপ করছিলেন সাদিয়ার মা নারগিছ বেগম। আর বাবাকে হারিয়ে দুই ভাই সামিউল ও ইমন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। পুরো বাড়িজুড়ে তখন নেমে এসেছিল শোকের ছায়া।
গত বৃহস্পতিবার (১অক্টোবর) বিকালে সাদিয়ার সামনেই তাঁর বাবা সফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিবেশী এনামুল হক লিমন তার ভাতিজা এমদাদুল হক নিশাদসহ আরও কয়েকজন। নিহত সফিকুল ইসলাম (৪০) ওই গ্রামের মৃত মোয়াজ উদ্দিনের ছেলে। সে বাঁশ ও বেত শিল্পের কারিগর ছিলো। এই ঘটনায় পুলিশ এনামুল হক লিমন ও নজরুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে।
সাদিয়ার মা নারগিছ বেগম বলেন, আমার আয়ের আর কোন রাস্তা নেই, তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোন রকম কষ্ট করে সংসার চালাইছি, এখন আমার সব পথ বন্ধ। আমার স্বামীকে চোখের সামনে কুপিয়ে মারছে। কতজনকে ডাকলাম কেউ বাঁচাতে আসলো না, কেউ যদি আগাইয়া আসতো আমার স্বামী মরে না, বেঁচে যেতো, কিন্তু তারার ভয়ে কেউ আগাইয়া আসেনি। আমার সন্তানদের এতিম করলো, এখন তাদের কে দেখবে ? ছোট্ট ছেলেটা (দুই বছরের সামউল) শুধু বাবা বাবা করে ডাকে, বাবাকে খোঁজে, আমি তাকে বাবা এনে দেব কোথায় থেকে ? আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি, সন্তানরা তাদের বাবাকে হারিয়েছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই। যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে, তাদের ফাঁসি চাই।’
অভিযুক্তদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে উত্তেজিত গ্রামবাসি :
এদিকে, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সফিকুল ইসলামের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে খোদাইচর বটতলা এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে বারুর ও বারেরা-খোদাইচর এলাকার বাসিন্দারা। মানববন্ধন শেষে গ্রামের উত্তেজিত কয়েক’শ মানুষ অভিযুক্ত এনামুল হক লিমন ও নজরুল ইসলামের বাড়ি- ঘর ভাঙচুর চালায়। দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উত্তেজিত জনতা ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর ও লুটাপাট করে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায়। ভাঙচুরের সময় লিমনের বৃদ্ধা মা ছাড়া ঘরে কেউ ছিলেন না। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে দেবিদ্বার-বিপাড়া (সার্কেল) সহকারি পুলিশ সুপার মো.শাহীন ও দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)সহ একদল পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো.মনিরুজ্জামান বলেন, সফিকুল ইসলাম হত্যাকাÐের ঘটনায় পুলিশ দুজনকে আটক করেছে। এই ঘটনায় আরও যারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার মানববন্ধন শেষে অভিযুক্ত আসামী এনামুল হক লিমন ও নজরুল ইসলামের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এখন ক্ষতিগ্রস্থদের পক্ষ থেকে যদি কেউ মামলা করতে চায় তাদেরকেও আইনগত সহায়তা দেয়া হবে। তবে এখনও পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দিতে থানায় আসেনি।
