বুধবার ● ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
লাকসামের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ
সৈয়দ মুজিবুর রহমান দুলাল, লাকসাম ।।
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:০১ এএম আপডেট: ৩০.০৯.২০২৬ ১:৪১ এএম |

  লাকসামের প্রাথমিক  শিক্ষা কর্মকর্তার  বিরুদ্ধে অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহা. দেলোয়ার হোসেন মজুমদারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে। গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সভাপতি মো. আবুল কালামের উপস্থিতিতে উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত উপজেলা আইনশৃংখলা কমিটির এবং উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভায় নশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. মুহাম্মদ নুর উল্লাহ রায়হান নশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন সহকারী শিক্ষক সংযুক্তির ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা উৎকোচের গ্রহণের বিষয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ উত্থাপন করেন। 
ওইদিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নার্গিস সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ডা. মুহাম্মদ নুর উল্লাহ রায়হানের অভিযোগ করেন, ২০ হাজার টাকা উৎকোচের বিনিময়ে অতি সম্প্রতি উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর শিবাখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. ফরিদ হোসেনকে পৌরশহরের নশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। 
এ সময় সভার প্রধান অতিথি এমপি আবুল কালাম তাৎক্ষণিক ওই অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার সুষ্ঠ তদন্তসহ প্রয়োজনীয় আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) নির্দেশ প্রদান করেন। 
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিকে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষক বদলীর আবেদন বা সংযুক্তিতে উৎকোচ গ্রহণ, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরিতে বানিজ্য, ক্ষুদ্র মেরামতসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়, একটি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করা। নানাহ অজুহাতে কৌশলে ওই শিক্ষকের মাধ্যমে অনৈতিকভাবে লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ওই সহকারী শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের পরিবর্তে তাঁর কার্যালয়ে রাখেন। আবার ওই শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকেও হাজিরা বহিতে নিয়মিত স্বাক্ষর করেন। 
এ ছাড়া, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী শিক্ষকদের অহেতুক তাঁর কার্যালয়ে এনে দীর্ঘ সময় ধরে বসিয়ে রাখা এবং তাঁদের সঙ্গে অশোভন আচরণেরও অভিযোগ রয়েছে। 
এদিকে ওইদিন (২৪ সেপ্টেম্বর) উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় জাতীয় সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে ২০ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ্যে উত্থাপিত ও ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পর রাতেই ওই শিক্ষক মো. ফরিদ হোসেনকে ডেকে নিয়ে গ্রহণকৃত উৎকোচের ২০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 
অপরদিকে গত রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ওই শিক্ষককে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁর কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে নশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্তি প্রদান বিষয়ে কোনও রকম উৎকোচ লেনদেন হয়নি মর্মে ইউএনও বরাবর একটি লিখিত আবেদন দিতে বাধ্য করেন। 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৭-৮ মাস আগে গোবিন্দপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর শিবাখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. ফরিদ হোসেন পৌরশহরের দৌলতগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্তির জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন। ওই সময় তিনি শিক্ষা কর্মকর্তার প্রিয়ভাজন অপর এক শিক্ষকের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা উৎকোচ প্রদান করেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওই শিক্ষককে পৌরশহরের দৌলতগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে না দিয়ে নশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্তি প্রদান করেন। 
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে প্রান্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করবেন। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একযোগে প্রশ্নপত্র তৈরি করে সকল বিদ্যালয়ে সরবরাহ করেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থী থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক অর্থ আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। 
অভিযোগ রয়েছে, কোনো বিদ্যালয়ে পাঁচজন বা তারও কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত থাকলে ওইসব বিদ্যালয় থেকে বদলির বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু এসব বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করেননি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। তিনি মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়নের কামড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাবেয়া আক্তারকে পৌরশহরের রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং গোবিন্দপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর শিবাখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. ফরিদ হোসেনকে পৌরশহরের নশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্তি প্রদান করেন। 
একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের যে কোনো ক্ষুদ্র মেরামত কাজের বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে এবং নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত বিদ্যালয়গুলোর সংস্কার বরাদ্দ থেকেও অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি বিভিন্ন দরখাস্তের রিসিভ কপি না দেওয়া, প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি এবং ফাইল অনুমোদনে অর্থ নেওয়ার বিষয়েও কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। 
লাকসাম উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহা. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার তাঁর বিরুদ্ধে আণীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রশ্নপত্র প্রস্তুত ও সরবরাহ করা হয়েছে। তাছাড়া, কামড্ডা ও শ্রীরামপুর শিবাখোলা বিদ্যালয়ের দু'জন শিক্ষককে অন্য বিদ্যালয়ে সংযুক্তি করা হয়েছে। এটি সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমেই হয়েছে। অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগটি তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। 
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিদ্যালয়ের মেরামতের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামতের বিল অনুমোদন বাবদ অনৈতিকভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন। 
তিনি দরখাস্তের রিসিভ কপি না দেওয়া প্রসঙ্গে বলেন, তাঁর কার্যালয়ে লোকবলে চরম সংকট। ছয়জন স্টাফের মধ্যে মাত্র একজন দিয়ে সকল কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। রিসিভ কপি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও লোকবল সংকট এবং অফিসের প্রচলিত ব্যবস্থায় সকল দরখাস্তের রিসিভ কপি দেওয়া সম্ভব হয় না; গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কিছু রিসিভ কপি দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। 
এই ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও শিক্ষা কমিটির সভাপতি নার্গিস সুলতানা বলেন, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির ও মাসিক সভায় উত্থাপিত অভিযোগ স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশক্রমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতণ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাক্রমে তদন্ত সাপেক্ষ প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২