শাহীন আলম ।।
গত দুই বছর ধরে পা ব্যাথার যন্ত্রণায় বিছানায় কাতরাচ্ছিলেন ইমন মিয়া। সকালে মাকে ডেকে বলছিলো, ‘মা, পায়ের ব্যথা সয্য করতে পারছি না, তোমরা আমাকে মেরে ফেল। না হয় আমি নিজেই আত্মহত্যা করব। ছেলের এমন কথা শুনে মা পিয়ারা বেগম বলেন, ‘আমি মা হয়ে তরে ক্যামেনে মারব?’ তুই পারলে আমারে মাইরা ফ্যালা, এর কিছুক্ষণ পরই দা নিয়ে নিজের মাকে কুপিয়ে হত্যা করে ছেলে ইমন। তাঁর চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে দৌড়ে আসে বড় ভাবি রাবেয়া বেগম। তার কোলে ছিলো ৮ মাসের শিশু সন্তান ইসরাত। ইমন রাবেয়া বেগমের কোল থেকে ইসরাতকে নিয়ে মাটিতে আছাড় দেন এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় শিশু ইসরাত। ঘরের মেঝেতে ছটফট করতে করতে মারা যান মা পিয়ারা বেগমও। শুধু মা ও ভাবিকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি ইমন, ভাবি রাবেয়া বেগমকেও লাকড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করে ইমন। রাবেয়ার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে রাবেয়া বেগম সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গতকাল সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর ইউনিয়নের বড়শালঘর গ্রামের দক্ষিণপাড়া মোস্তফা মাস্টারের বাড়িতে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পরে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ইমন মিয়াকে আটক করে পুলিশে দেয়।
এই ঘটনায় নিহতরা হলেন, বড়শালঘর গ্রামের মৃত ফরিদ উদ্দিনের স্ত্রী পিয়ারা বেগম (৬২) এবং তাঁর আট মাস বয়সী নাতনি ইসরাত জাহান। আহত রাবেয়া বেগম ইমনের বড় ভাই মো. সুজন মিয়ার স্ত্রী। তার সুমাইয়া আক্তার নামে ৯ বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।
এদিকে, সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে ইমন মিয়াকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সায়মা শরীফ নিশাতের ৪ নম্বর আমলী আদালতে হাজির করা হলে তিনি মা ও ভাগ্নিকে হত্যার দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। নিহত পিয়ারা বেগমের বড় ভাই মো. ফারুক হোসেন (মেম্বার) বলেন, ‘দুই বছর আগে ইমন ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পায়। পরে তাঁর পায়ে দুইবার অপারেশন করা হয়। কিন্তু অপারেশনের পরও পায়ের চিকিৎসা ভালো না না হওয়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে ইমন। সকালে এই ঘটনা শুনে বোনের বাড়িতে এসে দেখি আমার বোনের গলাকাটা মৃতদেহ মাটিতে আর শিশু ইসরাতের মৃতদেহ খাটের ওপর পড়ে আছে। এই ছাড়া আমি আর কিছু জানিনা।
রাবেয়া বেগমের স্বামী মো. সুজন মিয়া বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে, আমার আর কিছুই নাই। নিজের ভাই কিভাবে মাকে ও আমার মেয়েকে মারল। সকালে আমি কাজে ছিলাম, এই ঘটনা শুনে এসে দেখি আমার মেয়ে ও মায়ের লাশ পড়ে আছে। ইমন কেন তাদের মারল জানিনা, এরপর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দা রহুল আমিন বলেন, ‘ইমন আমার প্রতিবেশী, সে সব সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। সে যে এই ঘটনা ঘটাবে আমরা কেউ বিশ্বাস করতে পারছি না। দুই বছর আগে আমাদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পায়। এতদিন তার চিকিৎসা চলছিলো। পরশু দিন তার দ্বিতীয়বার পায়ের অপারেশন করা হয় এ নিয়ে সে প্রায়ই আমাকে বলত, আমি পায়ের এই যন্ত্রণা আর সয্য করতে পারছি না, আমার পা ভার হয়ে আসছে। আমি যেকোনো সময় আত্মহত্যা করব। আমরা এই কাজ ভালো না বলে তাকে বুঝাতাম। আজ সকালে শুনি এই ঘটনা।
সুরতহাল প্রস্তুতকারী দেবিদ্বার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বাঁধন চন্দ্র দাস বলেন, আমরা মৃতদের সুরতহাল সম্পন্ন করেছি। পিয়ারা বেগমের গলা, কপালে ও নাকে দায়ের কোপ রয়েছে। শিশু ইসরাতকে মাটিতে আছাড় দেওয়ায় তার গায়েও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এই ছাড়াও ঘরে যে যে আলামত রয়েছে তা সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ইমনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হলে সে আদালতে হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। নিহত দুজনের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তার পায়ে যে ব্যাথা তা সয্য করতে না পেরে সে আত্মহত্যা করতে চাইছিলো, তার মা আত্মহত্যা করতে বাধা দেয়। এতে প্রথমে মাকে কোপায় পরে ভাবি এলে ভাবিকে পিটিয়ে আহত করে এবং কোল থেকে ভাতিজিকে নিয়ে মাটিতে আছাড় দিয়ে হত্যা করে। এছাড়াও আর কোন কারণ আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।