নিজস্ব প্রতিবেদক: অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পেছনে দুটি ঘটনা ভূমিকা রাখতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তার মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম। তাঁর সন্দেহ, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে এক কিশোরের চাকরি নেওয়ার সঙ্গে এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কয়েকজন কিশোর অপরাধীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দুই কিশোরের প্রকৃত বয়স নিয়েও সন্দেহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম। এসব বিষয় তিনি তাঁর এক সহকর্মীকে জানিয়েছেন। সোমবার বেলা ১১টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজনে অপ্রতিম হত্যার বিচার ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে মানববন্ধন ও শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অপ্রতিমের মায়ের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি জানিয়ে নাহিদা বেগমের শিক্ষক সহকর্মী বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার। তিনি বলেন, নাহিদা বেগমের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। এর মধ্যেও তিনি কয়েকটি বিষয় নিয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছেন। তাঁর পক্ষ হয়েই মানববন্ধনে সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। কামরুন নাহার বলেন, অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সালমানপুর এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। অপ্রতিমের মা মনে করছেন, ওই কিশোরের সেখানে চাকরি নেওয়ার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা দরকার। তিনি আরও জানান, নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় স্থানীয় কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। অপ্রতিমের মায়ের দাবি, ওই কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিতেন মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯)। সেই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মানববন্ধনে ইউট্যাব কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তাঁরা কুমিল্লার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে দাবি করে তিনি এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক শামীমা নাসরিন বলেন, অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের জন্য বা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উদ্বেগের ঘটনা নয়, এটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি সংকটকেও সামনে এনেছে। তিনি প্রশাসনের প্রতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অপ্রতিমের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু দেশের আরও অনেক অপ্রতিমের জন্য কথা বলার কেউ নেই। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।
অপ্রতিম হত্যা মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, অপ্রতিম আমাদের সন্তান। আমরা আর কত মানববন্ধন করব? শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
মানববন্ধনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার, শিক্ষক সমিতির সদস্যসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও হলের প্রভোস্টরা উপস্থিত ছিলেন। মানববন্ধনের আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষকেরা শোকমিছিল করেন।
অপ্রতিম গত (১৮ সেপ্টেম্বর) শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
