
কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসাসেবার সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এখানে বন্দিদের জীবন যেন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কারাবন্দিরা। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন কারাগারে হাজতি কিংবা কয়েদির মৃত্যুর খবর আসছে। ফলে কারাগারের ভেতরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, চলতি বছরের সাড়ে আট মাসেই কমপক্ষে ১৩২ জন কারাবন্দি মারা গেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু চলতি মাসের ১৫ দিনে এ দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কারাগারের অভ্যন্তরে চিকিৎসাসেবার সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরেছে কারা অধিদপ্তর। বাস্তবতা বা চিকিৎসাসেবার সংকট যেমনই হোক, কারাবন্দি হলেও একজন মানুষ হিসেবে তার যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে না বলে ধরে নিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, চিকিৎসাসেবার ঘাটতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশের ৬৮টি কারাগারের জন্য ১৫১ চিকিৎসকের পদ থাকলেও বাস্তবে সারা দেশে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। এই দুজনও আবার প্রেষণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিযুক্ত। ডিপ্লোমা নার্সের পদ রয়েছে ১০৩টি, সেখানে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে কর্মরত রয়েছেন ৩২ জন। আরও ৫৫ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। ফার্মাসিস্ট পদের সংখ্যা সারা দেশে ৭৩টি, সেখানে ৬৮ জন নিযুক্ত রয়েছেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য সহকারী ও ল্যাব টেকনিশিয়ান পদেও তেমন কোনো লোকজন নেই। এ পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করা যায় যে, কারাবন্দিদের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবকিছুতেই তীব্র সংকট রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার অধিক বন্দি রাখা, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সংকট এবং একজন হাজতি বা সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির অধিকার-সবকিছুতেই মানবাধিকারের প্রসঙ্গটি উপেক্ষিত হচ্ছে। এখান থেকে তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাস ও অনাস্থা। সাজা শেষে একজন কয়েদি সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি না হয়ে উল্টো মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। দীর্ঘদিনের এসব অভিযোগ দ্রুত সমাধান করে কারাগারগুলোয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
কারাবন্দিদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু প্রায়ই জানা যাচ্ছে, কারাগারে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ হার দিন দিন বাড়ছে; যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ, চিকিৎসাসেবা, নিরাপত্তা ও কারা কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এর পেছনে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি বা চিকিৎসার ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। কারাবন্দিদের চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা দূর করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসাসেবার যে সংকটগুলো সামনে এসেছে, তা অচিরেই দূর করে কারাগারের অভ্যন্তরীণ সেবার মান যুগোপযোগী করতে হবে।আমরা আশা করি, সরকার বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে দেখবে এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
