
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। এমন পরিস্থিতিতে চলতি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। এ আশঙ্কার মধ্যেই তিন মাসব্যাপী সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে সরকার। অভিযান ১২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং এটি চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সরকারের মশক নিধন কার্যক্রম যাতে সফল হয়, সে বিষয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। বছরের শুরুতেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছিল, ডেঙ্গুর মৌসুম ঝুঁকিপূর্ণ ও ভয়াবহ হতে পারে। জুনে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়। তার পরও কেন সংক্রমণের মৌসুমে এসে বড় আকারের অভিযান শুরু করতে হলো? ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও নিয়মিত সোর্স রিডাকশন আরও জোরদার করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো বলেও মত দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।
স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে আগেই তা প্রতিরোধ করা কার্যকর-এ বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির হার দ্রুত বাড়ছে। এতে সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। সক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ হাজার ১৬৩ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৬৪ জন, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫০ হাজার ৯৪১ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছেন ৪ হাজার ৫৮ রোগী।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গুর বিস্তার দেখা দিয়েছে চলতি মাসে। ফলে মশক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা আইইডিসিআরের গবেষণার ভিত্তিতে মূলত ওয়ার্ডভিত্তিক হটস্পট নির্ধারণ করা হতো। এবার গত দেড় মাসে কোন কোন এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ১০০টি নির্দিষ্ট হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘১০০-তে ১০০’। লক্ষ্য ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে প্রতিদিন ১০০টি হটস্পট শতভাগ নির্মূল করা। এ কর্মসূচি চলবে ১০০ দিন।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দেরিতে হলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জনসম্পৃক্ততার উদ্যোগ ইতিবাচক পদক্ষেপ। তিন মাসের কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বছর নগর পরিচ্ছন্নতা, জলাশয় ও জলাধার থেকে বর্জ্য অপসারণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবনের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা, পকেট স্পেস ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানির উৎস চিহ্নিত করে তা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যে ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে কাজটি সফল করতে হলে তদারকি কার্যক্রম বাড়াতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে হবে। অবশ্য সরকারের তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচিতে জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।জনসচেতনতা বাড়িয়ে দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধের একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করতে পারলে কাজটি সফলতার মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ বা সংস্থার পাশাপাশি জনগণকেও সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।
