সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩
সমস্যা সমাধানে সুচিন্তিত পদক্ষেপ জরুরি
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৬ এএম |

সমস্যা সমাধানে সুচিন্তিত পদক্ষেপ জরুরি
ঢাল-তলোয়ার ছাড়াই কোনো এক ‘নিধিরাম সর্দার’ যুদ্ধে গিয়েছিল বলে বাংলা প্রবাদে উল্লেখ আছে। অস্ত্রহীন অবস্থায় যুদ্ধে নামলে পরিণতি কী হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র সেই ‘নিধিরাম সর্দারের’ চেয়ে কিছুমাত্র সুবিধাজনক মনে হয় না। আমরা শিক্ষকসংকট নিয়েই শিক্ষার এক দীর্ঘ যুদ্ধে নেমেছি। হাতে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আছে পাঠ্যবই, আছে পরীক্ষা ও মূল্যায়নের নানা আয়োজন; কিন্তু শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই ঘাটতি। যোগ্য ও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব ভয়াবহ।
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩ লাখ ৮৩ হাজারের মতো। এর মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি পদ শূন্য। প্রায় ৩৮ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদও দীর্ঘদিন খালি। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়েই প্রায় ৭৮ হাজার পদ শূন্য। দুর্গম চরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি আরও করুণ-কোথাও কোথাও শিক্ষক আছেন নামমাত্র।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের ৬৯৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮৩টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ে ৩ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। সরকারি কলেজের সংখ্যা ৩১৬। এসব প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি হলেও মাউশির হিসাবে শূন্য পদ রয়েছে ৩ হাজার ৭৫৪টি। এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাতেও বছরের পর বছর শিক্ষকসংকট চলছে।
শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ যে একেবারেই নেই, তা নয়। সর্বশেষ সপ্তম গণবিজ্ঞপ্তিতে ৬৭ হাজার ২০৮টি শিক্ষক ও প্রভাষক পদে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ১১ হাজার ৭১৩ জন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক পদ থাকলেও সেই অনুপাতে প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক; এসব প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকের বেশি পদেই শিক্ষক নেই বলে জানা যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষকতা পেশার প্রতি তরুণদের আগ্রহ কমছে কেন? এর একটি বড় কারণ আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তা। দায়িত্বের তুলনায় বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আকর্ষণীয় না হওয়ায় মেধাবী তরুণদের অনেকে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাচ্ছেন না। কেউ সুযোগ পেয়েও শিক্ষকতায় আসছেন না, আবার কেউ শিক্ষকতা শুরু করার পরও অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে শিক্ষকসংকট শুধু সংখ্যার সমস্যা নয়; এটি মানসম্মত শিক্ষক ধরে রাখারও সংকট।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। একজন শিক্ষকের ওপর অতিরিক্তসংখ্যক শিক্ষার্থীর দায়িত্ব পড়লে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থীকে বাড়তি সহায়তা এবং নিয়মিত মূল্যায়ন—সবই ব্যাহত হয়। শিক্ষক না থাকলে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা দুর্বল হয়, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি বাড়ে। এতে তরুণ প্রজন্ম উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করতে হয় পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেই। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি–সবই নির্ভর করে একটি শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠীর ওপর। কিন্তু শিক্ষার সূচনা পর্বেই যদি তাদের সুশিক্ষিত করে না তোলা যায়, তাহলে দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির আশা করাও বৃথা।
‘ঢাল-তলোয়ার’ ছাড়া যেমন যুদ্ধ করা চলে না, তেমনি শিক্ষক ছাড়াও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়া যায় না। তাই শিক্ষক নিয়োগকে কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক পরিকল্পনা, প্রতিযোগিতামূলক বেতন-ভাতা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক ধরে রাখার বিশেষ সুবিধা এবং দ্রুত নিয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ শ্রেণিকক্ষেই তৈরি হয়। সেই শ্রেণিকক্ষ যদি শিক্ষকশূন্য থাকে, তাহলে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্নও একসময় ফাঁপা স্লোগানে পরিণত হবে। এখনই শিক্ষকসংকট দূর করার কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, উপহাসে পরিণত হবে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন।













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২