রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
প্রসূতির মৃত্যু:
চিকিৎসাসেবার নামে অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চাই
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪১ এএম |


চিকিৎসাসেবার নামে অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চাই
প্রসূতি ও নবজাতকের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। অথচ কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর এক তরুণ প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ সেই দায়িত্ববোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘটনাটির সঙ্গে হাসপাতালের বৈধ অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পেশাগত যোগ্যতা এবং অস্ত্রোপচারে তাঁর ভূমিকা নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
মোসা. পপি আক্তারের বয়স মাত্র ২১ বছর। সন্তান জন্মদানের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের আগে অভিজ্ঞ গাইনি চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলা হলেও পরে ভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়নরত একজন চিকিৎসক অস্ত্রোপচারে যুক্ত ছিলেন। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই। প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও পেশাগত তদন্ত।
আরও উদ্বেগের বিষয়, হাসপাতালটির বৈধ লাইসেন্স ও অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না, এসব বিষয় নিয়মিতভাবে তদারক করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা সক্ষমতা ছাড়াই চিকিৎসাসেবা ও অস্ত্রোপচার পরিচালনা করে থাকে, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; রোগীর জীবন ও নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি।
এ ঘটনায় স্বজনদের পক্ষ থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকায় বিষয়টি মীমাংসার অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি এবং পুলিশ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থ লেনদেন বা সমঝোতার অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এমন অভিযোগ যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন সেটিও যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। কোনো রোগীর মৃত্যুর পর আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ছে কি না, এ প্রশ্নেরও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগীর জীবন ও নিরাপত্তা। চিকিৎসায় জটিলতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটতেই পারে। কিন্তু চিকিৎসকের যোগ্যতা, হাসপাতালের অনুমোদন, অস্ত্রোপচারের প্রক্রিয়া, রোগীর অবস্থা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম বা অবহেলা ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কোনো অভিযোগ উঠলেই চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে অভিযোগ তদন্তহীন থেকে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে। এই তদন্ত কমিটির ওপর এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শুধু কাগজপত্র পর্যালোচনা নয়, রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, অস্ত্রোপচারের বিবরণ, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের যোগ্যতা ও নিবন্ধন, হাসপাতালের অনুমোদন, ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোগীর ছাড়পত্র এবং পরবর্তী সময়ে দেওয়া চিকিৎসার তথ্য-সবকিছু পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া উচিত।
একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফল যেন দীর্ঘসূত্রতার কারণে আড়ালে না পড়ে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। তদন্তে যদি কোনো অনিয়ম, অবহেলা, অনুমোদনহীন চিকিৎসাসেবা বা পেশাগত বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের কোনো অংশ সত্য না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। এতে যেমন ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচারের পথ তৈরি হবে, তেমনি নির্দোষ চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অযথা জনমত তৈরি হবে না।
পপির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বজন হারানোর ঘটনা নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার তদারকি কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর অনুমোদন, চিকিৎসকের যোগ্যতা, অস্ত্রোপচার পরিচালনার সক্ষমতা এবং রোগীর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়মিতভাবে পরিদর্শন করা হচ্ছে কি না-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
একজন তরুণীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং দায় নির্ধারণই এখন প্রধান বিষয়। এ ক্ষেত্রে আবেগ, প্রভাব কিংবা অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা নয় প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। পপির পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায় এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে একই ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২