আজ
শোকাবহ ১৫ আগস্ট। প্রতিবছর এই দিনে আমাদের মন বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়।
স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জননন্দিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী আজ। ১৯৭৫ সালের এই দিনে তাকে এবং তার
পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এটি চরম নিন্দিত ও ঘৃণিত কাজ।
বাংলাদেশের ইতিহাসের শীর্ষ পর্যায়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক সেই হত্যাকাণ্ড কোনো
বিপ্লব ছিল না। ছিল সেনাবাহিনীর একটা ক্ষুদ্র অংশের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত
হত্যাকাণ্ড।
সেই কাপুরুষোচিত ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার বঙ্গবন্ধু, তার
পরিবারের সদস্যসহ যারা সেদিন শহিদ হয়েছেন, আমরা তাদের সবাইকে গভীর
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। সবার আত্মার শান্তি কামনা করছি।
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ছিল সবচেয়ে বর্ণাঢ্য। একটি সুখী-সমৃদ্ধ,
গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে
সারা জীবন তিনি সংগ্রাম করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক রাজনৈতিক ও
অর্থনৈতিক মুক্তিই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান ও সাধনা। বঞ্চিত মানুষের অধিকার
আদায়ের সংগ্রামে তিনি ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের পুরো সময়ে অসীম সাহসের সঙ্গে
নেতৃত্ব দিয়েছেন।
স্বাধীনতার আগেই একটি জনসভায় জাতির পক্ষ থেকে তিনি
‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের পর্বটি ছিল আমাদের
ইতিহাসের অসামান্য অধ্যায়।
সেই সময়ের প্রধান ইতিহাস নির্মাতা বঙ্গবন্ধু।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
অসাম্প্রদায়িকতার বীজমন্ত্রে এবং ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে
বাংলাদেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। এ জন্য নানা সময়ে তাকে পাকিস্তানি
শাসকদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনিই
সবচেয়ে বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। মুক্তির সংগ্রামে তিনি হয়ে ওঠেন
আপসহীন নেতা। জাতির ক্রান্তিলগ্নে ঘোষণা করেন বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির
সনদ ছয় দফা। এই ছয় দফাকে ঘিরেই বাংলাদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতে থাকে সার্বিক
মুক্তির। আইয়ুব-ইয়াহিয়ার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে বাংলাদেশের
মানুষ। তিনি হয়ে ওঠেন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রধান প্রেরণা।
ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির মহানায়কের আসনে
অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দেখিয়েছিলেন
স্বাধীনতার স্বপ্ন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন
করে স্বাধীনতা।
১৯৭৫ সালের নৃশংস ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো জাতি।
তার শাসনকাল নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের
স্বাধীনতাসংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ভূমিকাকে অস্বীকার করা বাংলাদেশকে
অস্বীকার করার শামিল। সব সংকীর্ণতা ও দলীয় বৃত্তের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের
এই স্থপতিকে স্মরণ করা প্রয়োজন। তিনি কোনো দলের নন, তিনি সমগ্র জাতির। সবার
ঊর্ধ্বে স্মরণ করা প্রয়োজন তার স্বপ্নের কথা।
বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা
জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে, যে বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত, উদার গণতান্ত্রিক
বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা বাস্তবে রূপ দেওয়া। এমন একটি দেশ গড়ে
তোলা, যেখানে স্বাধীনতার এই মূল চেতনা বাস্তবায়িত হবে এবং
ধর্মগোত্র-নির্বিশেষে সব মানুষ সম-অধিকার ভোগ করবে। গণতন্ত্র, সামাজিক
ন্যায় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সেই কাজটি করা সম্ভব।
পরিবর্তিত
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এখন সেই ধারাতেই এগিয়ে চলেছে। দেশের
মানুষের স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর সেই বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন। রাষ্ট্র শাসনের
দায়িত্বভার যাদের ওপর ন্যস্ত আছে এবং ভবিষ্যতে যারা এই রাষ্ট্র পরিচালনার
ভার গ্রহণ করবেন, তাদের বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা মনে রাখা প্রয়োজন।
গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার
পূরণে গোটা জাতিকে উদ্যোগী হতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর একটি ব্রিটিশ
দৈনিকে যে কথা বলা হয়েছিল, সেই কথাটি আবার স্মরণ করছি, ‘সবকিছু সত্ত্বেও
বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ, তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো
অস্তিত্ব নেই।’
