
সমুদ্রসীমা বিজয়ের এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ বড় সাফল্য পায়নি। অথচ প্রতিবেশী দেশ সাগরে গ্যাস আবিষ্কারে অনেকখানি এগিয়ে গেছে।
আর এদিকে আমরা জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। এতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বেড়েই চলেছে। এমন বাস্তবতায় গভীর ও অগভীর সমুদ্র মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে অভিজ্ঞমহল। পত্রিকান্তরে খবরে বলা হয়, এরই মধ্যে বিদেশি বেশ কিছু বহুজাতিক কম্পানি এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে।
গত রবিবার পর্যন্ত সাতটি আন্তর্জাতিক কম্পানি পেট্রোবাংলার কাছ থেকে তথ্য প্যাকেজ ক্রয় করেছে। সংশ্লিষ্টজনরা আশা করছেন, এবার সফল্য আসবে।
খবরে বলা হয়েছে, এবার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন করে আগের তুলনায় আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে।
এর আগে ২০২৪ সালে সাতটি বিদেশি কম্পানি দরপত্র দলিল কিনলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কম্পানি দরপত্র জমা দেয়নি। তবে সেই সময় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যবেক্ষণ, পরামর্শ ও উদ্বেগ জানিয়েছিল। এবার সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে দরপত্রের বিভিন্ন শর্ত সংশোধন করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে গ্যাসের দাম নির্ধারণের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পিএসসি ২০২৬ অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের ১১ শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রে সাড়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালের পিএসসিতে উভয় ক্ষেত্রেই এই হার ছিল ১০ শতাংশ। এ ছাড়া সমুদ্র থেকে গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণের দায়িত্ব ঠিকাদারি কম্পানিকে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আমাদের বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাসের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে কলকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতে গ্যাসসংকট চরমে উঠেছে। গ্যাসসংকটের ধাক্কা লেগেছে কারখানার উৎপাদনে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘এখন সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানই আমাদের সবচেয়ে বড় আশা। কারণ স্থলভাগে ১০০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব কূপে আশানুরূপ গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।’
তবে সমুদ্রে অনুসন্ধান চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, জটিল এবং কারিগরিভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বিদেশি কম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণ করার পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত জরুরি। এই প্রক্রিয়ায় পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কারিগরি দক্ষতা বাড়ানো, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা আবশ্যক। চুক্তি সম্পাদনে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা অযৌক্তিক বিলম্ব না ঘটে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ তদারকি বজায় রাখতে হবে।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বঙ্গোপসাগরের বিশাল খনিজ সম্পদ আমাদের অর্থনৈতিক চিত্র আমূল বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তাই বহুজাতিক কম্পানিগুলোর আগ্রহকে সফলতা হিসেবে না দেখে এটিকে বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি বিস্তীর্ণ সাগরে যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে হবে।
