
সাম্প্রতিক সময়ে ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে ভয়াবহ গ্যাসসংকটের কবলে পড়েছে দেশ। বিশেষ করে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও ধুঁকছে গ্যাসসংকটে। চলমান গ্যাসসংকট তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করেছে। যে কারখানাগুলো দিনে সাধারণত ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা সচল থাকে, গ্যাসসংকটের কারণে সেগুলোর উৎপাদন এখন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। গ্যাসসংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাক ও রপ্তানিমুখী শিল্প খাত এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সময়মতো পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তাদের পূর্বনির্ধারিত অর্ডার বাতিল করছেন এবং নতুন অর্ডার নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এ পরিস্থিতিতে পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে গভীর হতাশা বিরাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস-তেলের অনুসন্ধান সেভাবে হয়নি। দেশীয় উৎস থেকে যতটা সম্ভব বেশি গ্যাস-তেল আহরণের চেষ্টা করতে হবে। সর্বোপরি দেশীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা জরুরি। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, দেশীয় খনি অনুসন্ধান ও কূপ খনন। বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা বাংলাদেশের অংশ। সেখানে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের বিশাল সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া দেশের অনেক এলাকা আছে যেখানে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাপেক্সকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগাতে হবে। ইতোপূর্বে বাপেক্স সফলতা দেখিয়েছে। অর্থ ও জনবল দিলে বাপেক্স সফলতা দেখাতে পারবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। দেশের প্রাকৃতিক খনি থেকে জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হলে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি-নির্ভরতা কিছুটা কমে আসবে। আমদানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি খাতকে সেবা খাতে রূপান্তর করতে হবে। গ্যাসসংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে দর্শনগত ও নীতিগত জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। ইতোপূর্বে জ্বালানি খাতকে বেপরোয়াভাবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। অতি মুনাফা করার চেষ্টা হয়েছে। এ অবস্থার আবসান ঘটাতে হবে। জ্বালানিসংকট সমাধানে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। অবশ্য অতীতে নতুন নতুন প্রকল্পের নামে এখান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে দুর্নীতি না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। বিগত সরকার গ্যাসসংকট সমাধানের ভার বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়েছিল। বিদেশিদের দিয়ে কূপ খনন কোনো সঠিক পদক্ষেপ নয়। সরকারকে এ কাজ নিজে করতে হবে। পেট্রোবাংলা ও তিতাসের মতো বড় মাপের প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দেশে বর্তমানে গ্যাসসংকট দূর করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। গ্যাসসংকটের কারণে দেশে নানামুখী সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সংকট নিরসনে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একটি সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর গ্যাস ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে সংকট অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
