শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬
৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করুন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৮ এএম |

শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করুন
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় লাখ লাখ পরিবারের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। এসএসসিতে প্রায় ৩৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। সংখ্যায় প্রায় ৭ লাখ। এবার শুধু পাসের হারই কমেনি, টানা চতুর্থবারের মতো কমেছে জিপিএ-৫প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা। গত সোমবার প্রকাশিত ফলের তথ্য অনুযায়ী, এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছে। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরীক্ষার্থীদের ৫০ দশমিক ৩৪ শতাংশ জিপিএ-৩-এর কম পেয়েছে। এমন খারাপ ফলাফলের পেছনে শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান বৈষম্যের বিষয়টি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাস করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশের প্রাপ্ত জিপিএ তুলনামূলক কম হওয়া শিক্ষার গুণগত মানের দিকে ইঙ্গিত করছে। ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করা এর প্রধান উদাহরণ।
দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা ও বিনিয়োগের অভাবকে এর জন্য দায়ী করছেন অনেকেই। অথচ এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে এসএসসি পর্যায় পর্যন্ত আনতে পরিবার ও রাষ্ট্রকে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে। ফেলের বৃত্তে আটকে পড়ে তারা এখন সমাজের বোঝা হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে লাখ লাখ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর। বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর এই অকৃতকার্যতা আগামী প্রজন্ম গড়ে তোলার সরকারি পরিকল্পনায় বেশ বড় ধরনের হোঁচট মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কেবল পরীক্ষার ফল নয়, এটি শিক্ষার মান, ভালো শিক্ষকের সংকট, শিক্ষায় গ্রাম-শহরের মধ্যে বৈষম্য, দারিদ্র্য বৃদ্ধিসহ বিদ্যমান সামাজিক সংকটেরও নির্দেশক। এ অবস্থায় শিক্ষকসংকট দূর করে গ্রাম ও শহরের শিক্ষাবৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের তথ্য বলছে, এসব শিক্ষার্থীর পড়াশোনার পেছনে পরিবার থেকে ১০ বছরে গড়ে ১৪ হাজার কোটি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের খরচের ফল এখন শূন্য। এ ছাড়া বেসরকারি গবেষণা সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম শ্রেণি থেকে এসএসসি (১০ বছর) পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর পেছনে গড় শিক্ষা ব্যয় ২ লাখ ৬ হাজার টাকার বেশি। এ খরচের সিংহভাগই ব্যয় হয় কোচিং, প্রাইভেট টিউটর এবং গাইড বইয়ের পেছনে। এই খরচ গ্রাম ও শহরভেদে ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। হিসাব কষলে দেখা যায়, চলতি বছরের এসএসসিতে অনুত্তীর্ণ ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর পেছনে গত ১০ বছরে পরিবারগুলো ব্যয় করেছে ১৪ হাজার ২৩৪ কোটি টাকার বেশি। এডুকেশন ওয়াচের গড় হিসাব (শিক্ষার্থীপ্রতি ২ লাখ ৬ হাজার ১১০ টাকা) এই বিশাল অঙ্কের অপচয়টি উঠে আসে।
এবার গণিত ও ইংরেজিতে বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তান ও সুযোগবঞ্চিতরাই বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। এর পেছনে আর্থিক অক্ষমতা ছাড়াও রয়েছে আরও বহুবিধ কারণ। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, পাস, ফেল সব ক্ষেত্রেই বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, যা ভালো করতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। ক্যাডেট কলেজের পেছনে সরকারের বরাদ্দ আর একটি সরকারি স্কুলের পেছনে সরকারের বরাদ্দের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। পাসের হার ও ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তফাত দেখা যায়। বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমাদের সন্তানরা জীবন দিয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয়নি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, বৈশ্বিকভাবে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বছরে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কমেছে। ইউএসএইড তাদের সম্পূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। ইউকেএইড, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তাদের সাহায্য অর্ধেক করেছে। বিশ্বব্যাংক ও কিছু দাতা সংস্থা ঋণ দিলেও তাতে অনেক শর্ত থাকে। এই মুহূর্তে সরকারের বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের সুযোগ নেই।
শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলগুলোতে বিনামূল্যে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আশা করছি, সরকার অবস্থার উন্নয়নে কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২