
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের জাতীয় দুর্যোগ। প্রতিদিন পত্রিকান্তরে দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বেদনাদায়ক খবর চোখে পড়ে। এই অকালমৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই ধ্বংস করে না, ব্যাহত করে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রাকেও। গত শুক্রবার সিলেট, বগুড়া ও চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন, আহত হয়েছেন ৪০ জনের বেশি। গত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট প্রাণ হারিয়েছেন ৪৮ হাজার ৭১৩ জন। এর মধ্যে ৭ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী বলে সম্প্রতি প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সড়কে কেন এত মৃত্যু? এই মৃত্যু রোধ করার দায় কার বা উপায় কী? বগুড়ায় গত শুক্রবার যে বাসটি দুর্ঘটনায় পড়ে, সেটির কয়েকজন যাত্রী জানান, দুর্ঘটনার আগে বাসটি অতিরিক্ত গতিতে চলছিল এবং চালকের চোখে ছিল ঘুমঘুম ভাব। অর্থাৎ চালকের দায়িত্বহীনতা এবং অদক্ষতার কারণে ঝরে গেল সাতটি তাজা প্রাণ। চালকদের এমন দায়িত্বহীনতা ও অদক্ষতার বিষয়ে নজরদারির দায়িত্ব যেমন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ), তেমনি এ বিষয়ে জনগণেরও সচেতনতা দরকার।
আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং এটি বহুমুখী সমস্যার ফল। প্রধান কারণগুলোর একটিই হলো, চালকদের অদক্ষতা ও লাইসেন্সবিহীন গাড়ি। একই দিন সিলেটের ওসমানীনগরে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন অন্তত ২৪ জন। এ দুটি বাসের একটি হলো স্লিপার বাস, যাতে বিআরটিএর নিবন্ধন নম্বর থাকলেও সড়কে চলাচলের অনুমোদন নেই। সংশ্লিষ্টরা জানান, সক্ষমতার অতিরিক্ত ভার বহন করছে অননুমোদিত এসব স্লিপার বাস। স্লিপার বাসের এই একটি বিষয়ই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বিআরটিএ তাদের দায়িত্ব পালনে কতটা যত্নশীল। অনুমোদনবিহীন বাস সড়কে চলাচল করে কীভাবে!
দেশের একটি বড় অংশের চালকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। অনেকে জাল বা অবৈধ উপায়ে লাইসেন্স সংগ্রহ করে মহাসড়কে ভারী যানবাহন চালানো শুরু করেন, যাকে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশিক্ষণবিহীন এসব চালকের মধ্যে আগে যাওয়ার একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। নির্ধারিত গতিসীমা অমান্য করে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো এবং বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং করতে গিয়ে প্রায়ই মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে।
সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব না হলেও সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এটিকে অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, বিআরটিএকে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। প্রশিক্ষণবিহীন চালক বা অনুমোদনহীন যানবাহন যাতে সড়কে চলাচলের সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে তাদেরই। চালকদের এই প্রশিক্ষণে যেন কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি আশ্রয় না পায়। কঠোর ও স্বচ্ছ পরীক্ষার মাধ্যমে শুধু যোগ্যদের লাইসেন্স দিতে হবে। ট্রাফিক আইন অমান্যকারী বা গতিসীমা লঙ্ঘনকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া চলবে না। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দূরপাল্লার চালকদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বেঁধে দিতে হবে, যেন তারা ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালাতে না পারেন। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা। এ বিষয়েও উদ্যোগ নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সড়কে চলাচল সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে সাধারণ মানুষকে।
সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে পরোক্ষ হত্যাকাণ্ড। একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, পরিবহনমালিক, চালক এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং চালক ও পথচারীদের সচেতনতাই আমাদের সড়কগুলোকে নিরাপদ করে প্রতিদিনের এই মৃত্যুর মিছিল রোধ করতে পারে।
