
এবারের এইচএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, যা শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে সৃষ্টি করেছে গভীর উদ্বেগ। সর্বশেষ অভিযোগ উঠছে, উত্তরপত্র বিতরণ এবং পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে জানা যায়, অর্থের বিনিময়ে নিয়ম ভেঙে কিছু পরীক্ষককে অতিরিক্ত উত্তরপত্র দেওয়া হচ্ছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, একজন পরীক্ষককে প্রতি বিষয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্বদেওয়ার কথা। কিন্তু ঘুষের বিনিময়ে কেউ কেউ ৭০০ পর্যন্ত উত্তরপত্র পাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একজন পরীক্ষককে সাধারণত উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য ১২ থেকে ১৫ দিনের মতো সময় দেওয়া হয়। এই সীমিত সময়ের মধ্যে ৫০০ বা ৭০০ উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন, প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। একটি উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হলে শিক্ষার্থীর উত্তর বিশ্লেষণ, নম্বর প্রদান এবং ভুলত্রুটি যাচাই করতে পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন। অতিরিক্ত খাতার চাপে মূল্যায়নের মান নষ্ট হতে বাধ্য। এর ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেমন প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত হবে, তেমনি দুর্বল শিক্ষার্থীরা পেয়ে যেতে পারে অনেক বেশি নম্বর। ফলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রটি মেধাবীদের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকদের বাদ দিয়ে অনেক অনভিজ্ঞ শিক্ষককে উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্বদেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা বোর্ডের পক্ষথেকে বলা হয়, পরীক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, একাডেমিক ফলাফল, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র যদি এর বিপরীত হয়, তাহলে পরীক্ষার পুরো মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুটি ভিডিও ঘিরেও ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক পরীক্ষক নিজে উত্তরপত্র মূল্যায়ন না করে একজন শিক্ষার্থীকে দিয়ে খাতা দেখাচ্ছেন। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক পরীক্ষক চায়ের দোকানে সঙ্গীদের সঙ্গে বসে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছেন। এসব ঘটনা শুধু দায়িত্বহীনতাই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের প্রতি চরম উদাসীনতার উদাহরণ।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা থাকার পরও এই সময় পরীক্ষা আয়োজন করা হয়। পরে সেই আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হয়েছে। দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিতও করতে হয়। অসময়ে পরীক্ষা গ্রহণের কারণে পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি এবার প্রবল বিতর্ক তৈরি হয় প্রশ্নপত্রে ভুল নিয়ে। বিষয়টি নিয়ে ইতিপূর্বে আমরা মতামতও ব্যক্ত করেছি।
এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে উচ্চশিক্ষার পথ, পেশাগত জীবনের প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা। তাই এই পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ-প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন পর্যন্ত-সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন সর্বোচ্চ সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা। যেকোনো দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। এই তরুণদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষাকে যদি অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে এর ক্ষতি শুধু কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে পুরো সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের ওপর।
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি পরীক্ষক নিয়োগ, উত্তরপত্র বণ্টন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ যাতে কোনো ধরনের অবহেলার সুযোগ না পায়, তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা অবহেলা কাম্য হতে পারে না। কারণ আজকের এই শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের দেশ নির্মাতা। তাদের ভবিষ্যৎ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। আমরা আশা করি, সরকার সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে।
