
স্টাফ রিপোর্টার: কুমিল্লার মানুষের তীব্র ক্ষোভ উপেক্ষা করে এবারও কুমিল্লায় জুয়া মেলা খ্যাত বাণিজ্য মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এবার এ মেলা আয়োজন করা হচ্ছে কুমিল্লা বিমানবন্দরের রানওয়েতে। যে বিমানবন্দর চালুর জন্য কুমিল্লার গণমানুষ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিল। সেই বিমানবন্দরের রানওয়ে ধ্বংস করে চলছে বিভিন্ন রাইড স্থাপনের কাজ। এতে বিমানের সংকেত প্রদানের প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত আপত্তিও জানিয়েছে কুমিল্লা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে কুমিল্লা দোকান মালিক সমিতিও তীব্র প্রতিবাদের পাশাপাশি জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়েছে। জুয়া মেলা আয়োজনের খবরে নেটিজেনরাও তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। কিন্তু জনমানুষের ক্ষোভ উপেক্ষা করে 'বিশেষ শক্তির' সমর্থনে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
জানা গেছে, জনৈক আমির হোসেন গতবারের মতো এবারও একই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দুই মাসের জন্য কথিত বাণিজ্য মেলা আয়োজনের অনুমতি নেন। সে মেলার স্থানীয় তদারকি করেন বিল্লাল হোসেন। মেলায় প্রবেশ মূল্যের নামে কুপন ছাপিয়ে লটারির মাধ্যমে দামি উপহার দেওয়ার নামে চালানো হয় লটারি বাণিজ্য। যা ইতিমধ্যে কুমিল্লার মানুষের কাছে জুয়া নামে পরিচিতি পায়। সেই সঙ্গে মেলায় নিম্নমানের পণ্য বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে প্রতারিত হন ক্রেতারা। কুমিল্লার বিভিন্ন অঙ্গনের প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে চলে এ মেলা। আর মেলা অনুমোদনকারীরা বাড়তি প্রাপ্তির আশায় মানুষের ঘৃণা উপেক্ষা করে দেন মেলার অনুমতি।
উল্লেখ্য, বিতর্কিত এ জুয়া নামক বাণিজ্য মেলার বিরুদ্ধে গত বছর কুমিল্লার আলেম সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে মেলাটি নির্ধারিত সময়ের কিছু দিন আগে বন্ধ করতে বাধ্য হয়। না হয় জনরোষের শিকার হতে হতো মেলা কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু সে অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে এবারও মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, মেলা উপলক্ষে বিভিন্ন রাইড নির্মাণ করায় বন্দরের ভিওআর সিগন্যাল প্রদান ব্যাহত হতে পারে। এতে কুমিল্লার আকাশ দিয়ে চলাচলকারী বিমানগুলো সংকেত পাবে না। সংকেত 'এরর' দেখাতে পারে। ফলে অভিজ্ঞ পাইলটরা চলে যেতে পারলেও নতুন পাইলটদের বিড়ম্বনায় পড়তে পারে। সেই সঙ্গে রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে বসানো হয়েছে টাওয়ার ও স্থাপনা। অথচ শুধু রানওয়ে কার্পেটিং করলে এই রানওয়েতে প্রশিক্ষণ বিমান ওঠানামা করতে পারতো। বিমানবন্দরের এই বিপত্তি সম্পর্কে লিখিতভাবে মেলা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কর্ণপাত করেনি। সেই সঙ্গে আমলে নেয়নি দোকান মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের কুমিল্লার লিখিত আপত্তিও। পরে তারা কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করেন।
কুমিল্লা দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল খন্দকার জানান, আমরা মেলা অনুমোদন দেওয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছি। সব বলেছি। তারা মেলা আয়োজনে অনড়। পরে স্মারকলিপি দিয়েছি।
মেলার আয়োজক মোঃ বিল্লাল হোসেন এক সাংবাদিককে জানান, রানওয়ে কি আছে নাকি? কোথায় রানওয়ে? তার এই দম্ভোক্তির মাধ্যমে কুমিল্লা বিমানবন্দরের রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগের প্রক্রিয়ায় বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এদিকে, বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, নগরীর দেশপ্রিয় কনভেনশন হলের ৫০১ নম্বর হলে বিভিন্ন জনকে মেলা পরিচালনায় ম্যানেজ করা হচ্ছে।
বিতর্কিত এ বাণিজ্য মেলা আয়োজনে পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি রয়েছে কিনা জানতে চাওয়া হলে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বলেন, বিমানবন্দরের রানওয়েতে বাণিজ্য মেলার আয়োজন হচ্ছে এবং তা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভও রয়েছে, সেটি আমরা গণমাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। তবে মেলা আয়োজক কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনুমতির জন্য আবেদন করেনি। জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হলেও পুলিশ প্রতিবেদন কিংবা গোয়েন্দা রিপোর্টের জন্য সে আবেদন পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আসবে। কিন্তু আমরা এই মেলার বিষয়ে কোনো ধরনের আবেদন পাইনি। মেলা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা অনুমতির আবেদন না পেলে আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিভাবে পুলিশ দিব।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বিমানবন্দরের রানওয়েতে বাণিজ্য মেলার আয়োজন করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে শুনছি। তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কোনো ধরনের আবেদন করেনি। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় বলা আছে, কোনো মেলা আয়োজনের পূর্বে স্থানীয় জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হবে মেলা আয়োজনের পূর্বে। আমাদের কাছে কোনো আবেদন করা হলে আমরা সেটি পুলিশ সুপার কার্যালয়ে গোয়েন্দা রিপোর্টের পাঠিয়ে থাকি। তদন্তের শেষে পরবর্তীতে ওই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আয়োজনের জন্য অনুমতি দিয়ে থাকি। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা কোনো ধরনের আবেদন পাইনি। তবে এই মেলা বন্ধে জেলা দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। আমরা সেটি গ্রহণ করেছি এবং পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।