
জনপ্রিয় দৈনিক ‘কুমিল্লার
কাগজ’ পত্রিকার ফেসবুক অনলাইনে, আজকের পত্রিকায়ও (৩.৮.২০২৬) সংবাদ দেখলাম,
‘কুমিল্লা বিভাগ’ হওয়ার পথে অ নে ক দূ র এগিয়েছে! কবে থেকে যে কুমিল্লা
ঐদিকে হাঁটতে শুরু করেছে সেটা প্রায় ভুলতে বসেছি! মনে হয়, দেখতে হলে আর
কিছুদিন পরে দূরবীণ লাগতে পারে। কেবল শুনতে পাই, ‘বিভাগ মহোদয়’ কেবল এগিয়েই
যাচ্ছে। এগিয়েই যাচ্ছে। খবরটি পড়ে মনে করছি, যতদূরে গেছে, খোলা চোখে তাকে
দেখা যাচ্ছে তো ? এবং যে জায়গায় গিয়ে ‘তিনি’ মানে ‘বিভাগ মহোদয়’ মানে
‘ফাইল’ থামবেন অথবা সম্মতি পাবেন, সেই ফাইলটির মুখ কবে খুলবে কিংবা আলোর
মুখ দেখবে তো!
আশাবাদীরা বলবেন, অপেক্ষা কর। আমি অপেক্ষা করে আছি। উর্দূ
লেখক কৃষণ চন্দর’র ‘লাল ফিতা’ গল্পটির কথা আমার মনে পড়ছে। আমি অপেক্ষা করে
আছি। আর আমার বালক বেলায় পড়া ছবিসহ ঐ কবিতাটির কথা মনে পড়ছে। আমি অপেক্ষা
করছি, আর আমার প্রিয় রম্য লেখক শিবরাম চক্রবর্তীর একটি ‘রস রচনা’র কথা মনে
পড়ছে।
আমি নৈরাশ্যবাদী নই। তবে কোন কিছুর জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে
গেলে আমার হাসফাঁস লাগে। সন্দেহ হয়! আশ্বাসে বিশ্বাস নষ্ট হবে কিনা সন্দেহ
হয়! যাই হোক, আজ খবরটি পড়ে গেল বলে প্রথমে ঐ কবিতাটির কথা বলি। কবিতাটির
মনে নেই। বিষয়টি ছিল এমন।
‘এক লোকের একটি গাধা ছিল। গাধাটি এত দৃর্বল
ছিল যে, সে মনিবকে নিয়ে হাঁটতে চাইত না। মনিব পিঠে বসলে কোন মতেই তাকে
হাঁটতে যেতে বাধ্য করা যেত না। পিটুনি দিলেও না। শেষে মনিব এক উপায় বের করে
বেশ ভাল ফল পেল। কবিতাটির পাশে ‘প্রাণেশ মণ্ডল’র আঁকা একটি ছবিও ছিল।
ছবিতে দেখা গেল, মনিবের নাক খুব লম্বা। মনিব পিঠে বসলে গাধার মুখ থেকেও ওর
নাকের ডগা হাত খানেক বড়, এমন লম্বা। তো, সে করল কি, গাধার পিঠে চড়ার আগে
নিজের নাকের ডগায় একটা মূলো ঝুলিয়ে বসল। এবার গাধাটা আর মনিবকে পিঠে নিয়ে
দাঁড়িয়ে থাকল না। মূলোটাকে মুখে পাবার আশার সে এগোচ্ছে! এগোচ্ছেৃমূলোও
এগুচ্ছে! মনিবও অনেক দূর যাচ্ছে! যাচ্ছে! বুদ্ধিটা দারুণ না!
এবার কৃষণ চন্দর। এই প্রখ্যাত লেখকের ‘লাল ফিতা’ একটি বিখ্যাত গল্প।
পিডব্লিউডি
আর রোডস এণ্ড হাই ওয়েজের রাস্তার মাঝখানে এক রাতের প্রবল ঝড়ে এক লোক একটি
গাছের নিচে আটকে চাপা পড়ে আটকে আছে। তার অর্ধেক শরীর দুই ভাগে দুই দিকের
সীমানায় পড়ে আছে। গাছটিও তেমনি। সকালে আর্ত চিৎকার শুনে লোকজন জড় হল বটে,
তবে, কেউ গাছটি সরিয়ে মুমূর্ষু লোকটাকে উদ্ধার করছে না। তার কারণ হল, গাছটি
যে দুই প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে পড়েছে! এখন এই গাছ সরাবার দায়িত্ব কার ? এ
বলে তোমার, ও বলে তোমার! শুরু হলো ফাইল চালাচালি। চলছে চলছে চলছে এই টেবিল
থেকে ঐ টেবিলে। ঐ টেবিল থেকে এই টেবিলে! কর্মকর্তাদের পরিদর্শন হচ্ছে,
অবলোকন, বিশ্লেষণ, আশ্বাস, নোট চালাচালি, মিটিং, চা-নাস্তা, বিল-ভাউচার
ইত্যাদি শেষে যখন ‘সিদ্ধান্ত’ লোকটির কাছে এগিয়ে এল তাকে উদ্ধারের সংবাদ
শোনাতে, তখন দেখা গেল, লোকটা মারা গেছে! ঐ যে, ট্রান্সলেশন কর : ডাক্তার
আসিবার পূর্বেই রোগি মারা গেল!
এবার শিবরাম চক্রবর্তীর রস রচনা। এই গল্প
শুনে ডাক্তার ভাই-বন্ধুরা রাগ করবে না যেন! গল্পটা মনে পড়ল এ জন্য যে,
এইসব কর্মকাণ্ডের মানে তো ‘ফাইল’? নাকি! তো, দেখতে পাচ্ছি, সে অনেকদূর
এগিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘ফাইল’র মুখ খুলবে কিনা তা নিয়ে এই রচনার
বয়ান।
‘ওরা দুই ভাই। হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন। হর্ষবর্ধন ডাক্তার।
গোবর্ধনের স্ত্রী প্রেগনেন্ট। ব্যথা উঠেছে। সে দৌড়ে গেল ডাক্তার ভাই
হর্ষবর্ধনের কাছে। কিন্ত ভাই বেঁকে বসেছে। সে যাবে না। কেন? কেন? কারণ কি?
কারণ
হল, হর্ষবর্ধন একদিন গোবর্ধনের বাড়ির সামনে দিয়ে আসার সময় ওর রাজহাঁস তাকে
দেখে ‘কোয়াক’ ‘কোয়াক’ বলেছে! হর্ষবর্ধনের প্রশ্ন : আমি কি ‘হাতুড়ে’
(ইংরেজি ‘কোয়াক’) ডাক্তার ?
ভাইয়ের রাগের কারণ বুঝতে পেরে গোবর্ধন এর
একটি সুরাহা করবে আশ্বান দিলে হর্ষবর্ধন আসতে রাজি হল। ডাক্তরি ব্যাগ হাতে
নিয়ে ডাক্তার হর্ষবর্ধন পিছে গোবর্ধন আগে হাঁটছে। রাজহাঁস এবার আর ‘কোয়াক’
বলল না। লম্বা গলা নুইয়ে রাস্তা থেকে সরে গেলে হর্ষবর্ধন প্রণাম করেছে মনে
করে খুশি হল। তো, বাসায় পৌঁছে ব্যাগ হাতে হর্ষবর্ধন গোবর্ধনের স্ত্রীর
কক্ষে ঢুকে সবাইকে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। ঘরের বাইরে উৎকণ্ঠিত
গোবর্ধন অস্থির। উঠোনে পায়চারি করছে।
কিছুক্ষণ পর হর্ষবর্ধন দরজা খুলে
গলা বের করে জিজ্ঞেস করল, হাতুড়ি আছে? একটা হাতুরি দাও তো! গোবর্ধন ছুটে
গিয়ে বড় ঘর থেকে হাতুড়ি এনে দিল।
কিছুক্ষণ পর আবার হর্ষবর্ধন দরজা খুলে গলা বাড়িয়ে বলল, ছুরি আছে? একটা ছুরি দাও। থাকলে একটা বাটালিও দিও। তাও দেওয়া হল।
আবার কিছুক্ষণ পর ডাক্তার হর্ষ গলা বাড়িয়ে বলল, কাঁচি আছে? কাঁচি? একটা কাঁচি দাও। জলদি।
স্ত্রীর অবস্থা খুব খারাপ মনে করে কাঁদতে কাঁদতে গোবর্ধন তাও এনে দিল।
এদিকে
বন্ধ দরজার বাইরে গোবর্ধন চিন্তায় অস্থির! কী জানি কি হয়! হাতুড়ি, ছুরি,
কাঁচি, বাটালি এসব লাগছে কেন! ওর স্ত্রী বাঁচবে তো! যাই হোক, তারও অনেকক্ষণ
বাদে হর্ষবর্ধন ঘর্মাক্ত কলেবরে হতাশ চেহারা নিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে
এল। গোবর্ধন দৌড়ে গিয়ে হর্ষবর্ধনকে জিজ্ঞেস করল, কী হল ভাই? কী খবর? গিন্নী
বেঁচে আছে তো? কী হয়েছে? ছেলে না মেয়ে?
হর্ষবর্ধন হাত নেড়ে ভাই গোবর্ধনের কাঁধে দুই হাত রেখে হতাশ কণ্ঠে বলল, আরে নাহ, সব ঠিক আছে। আমি তো আমার ব্যাগটাই খুলতে পারলাম না!
তো, শেষ পর্যন্ত ‘ফাইল’র মুখ খুলবে তো! আমি আশাবাদী। অনেক দূ র এগিয়েছে। অ নে ক দূ র...
