আখতার হামিদ খান ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন ১৯৩৬ সালে। কিন্তু পোষালোনা। ১৯৪৩ এ পঞ্চাশের মন্বন্তরে দেশবাসীর চরম দুর্ভোগ ও মৃত্যু তাকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে বীতস্পৃহ করে তোলে, খাদ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা খান সাহেব কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। ঈড়ষড়হরধষ ইঁৎবধঁপৎধপু সহ্য হলো না বুঝতে পারলেন ইঁৎবধঁপৎধঃহওয়া তাঁর কপালে লেখা নেই। অতএব প্রত্যাখান। সালটা ১৯৪৫। ইন্ডিয়ান সিভিল সারভেন্ট ঢুকে গেলেন এক তালার কারখানায় আলিগড়ের কাছাকাছি, ৭ টাকা বেতনে। উদ্দেশ্য মেহনতি মানুষকে কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করা। প্রান্তিক গোষ্ঠীর জীবন, তাদের দারিদ্র্য, আশাকাক্সক্ষা, তাদের অসহায়ত্ব পরবর্তী কালে গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমবায় পদ্ধতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাঁকে অভিজ্ঞতা জুগিয়েছিল। বরাবরই ছিল একটা সুংঃরপ মন, সূফীবাদের দিকেও ঝুঁকেছিলেন। চেয়েছিলেন একটা নিশ্চিত, নিরুপদ্রব জীবন। এজন্যই বেছে নিলেন শিক্ষকতার পেশা। সেটা ১৯৪৭ সাল। তিন বছর পর থিতু হলেন পাকিস্তানে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে যোগ দিলেন প্রিন্সিপাল হিসেবে। সালটা ১৯৫০ সেখানে প্রায় আট বছর ছিলেন।
আমরা তখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে, প্রথম বর্ষের ছাত্রী। জনাব আখতার হামিদ খান অধ্যক্ষ হয়ে এসেছিলেন তার আগেই। ঋজু, মেদহীন একহারা চেহারা, সামান্য রুক্ষতার ছাপ প্রখর ব্যক্তিত্বে। একটু ঝুঁকে হেঁটে চলা মানুষটা যখন নিবিষ্টমনে কিছু চিন্তা করতে থাকতেন তখন আশেপাশে কিছু তাঁর নজর কাড়ত না। কাছে যেতে ভয় হোত, কিন্তু একবার তাঁর ব্যক্তিত্বের বলয়ে ঢুকে পড়তে পারলে দেখা যেত একটা শিশুসুলভ মন অসাধারণ সারল্যে সুন্দর।
মাঝেমধ্যে আমাদের ইংলিশ ক্লাশ নিতেন। কোন কোন নীরস পাঠ তাঁর পড়ানোর নিপুণ ভঙ্গিমায় সরস হয়ে উঠত, আমরা মগ্ন হয়ে শুনতাম। ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করতেন সহজ শব্দ দিয়ে, যার জন্য বিষয়বস্তু যথেষ্ট প্রাঞ্জল হয়ে মগজে ঢুকে যেত। বাংলাও বলতেন সরল বাক্যে। উচ্চারণে অবাঙ্গালীসুলভ টান থাকলেও সঠিক শব্দ প্রয়োগের ও প্রাচুর্যের ঘাটতি ছিল না। প্রসঙ্গত বলা যায় ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায়, বাংলা পত্রে প্রথম হয়েছিলেন। গর্ব করে বলতেনও সেকথা।
পড়াতেন, পড়া ধরতেনও। ক্লাসে প্রশ্ন করতেন, মেয়েদেরও রেয়াত করতেন না। বেঞ্চের সামনে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতেন। ছয় ফিট দু ইঞ্চি লম্বা শালপ্রাংশু একলোক মোটা গলায় ইংরেজি হাঁকাচ্ছে সে এক সর্বনেশে ব্যাপার। আমরা এমনিতেই ইংলিশে কাঁচা, তারপরে ইংরেজি বইয়ের মলাটের রং কেমন তাও চোখে দেখিনি। ফলে যা হবার তাই হোল। দুর্ঘটনা ঘটল একদিন। অত্যন্ত অভিজাত বনেদী বাড়ীর মেয়ে, যে বোরখা পরে কলেজে আসত সে প্রশ্ন শুনে হঠাৎ দুম করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। হৈ চৈ গন্ডগোলের মধ্যে দিয়ে তাকে পুকুরপাড়ের ক্লাসরুম থেকে বয়ে নিয়ে আসা হোল কমনরুমে। পাখারে, পানিতে করে মেয়ে তো কিছুটা সুস্থ হোল। কিন্তু অধ্যক্ষ বিব্রত হলেন যথেষ্ট, তারপর লায়লা আপা (অধ্যাপিকা লায়লা নূর) যৎপরোনাস্তি ভর্ৎসনা করলেন খান সাহেবকে। বেচারা লজ্জিত মুখে শুনলেন। তিনি সম্ভবত ভাবতেই পারেননি যে তাঁর সামান্য জিজ্ঞাসার ফল এত মারাত্মক হতে পারে। এর একটাই সুফল হোল এরপর থেকে তাঁর ক্লাস নেয়ায় ভাঁটা পড়ল। যদিও দৈবাৎ নিতেন, কদাচ আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করতেন না। আর কুফল হোল ভয় সত্ত্বেও যা শিখতে পারছিলাম সে সময়টায় সেটা চাপা পড়ে গেল। পরে অবশ্যি কুমিল্লা একাডেমিতে চাকরীর সুবাদে সেটা খানিকটা পুষিয়ে নিয়েছিলাম।
এদিকে কলেজ ছাড়লাম, চলে এলাম ঢাকায় পড়তে। মাঝেমধ্যে কুমিল্লা গেলেও যোগাযোগ রাখা হয়নি। খানসাহেবও কুমিল্লা ছেড়ে চলে গেলেন।
এরপরের পটভূমিকা পল্লী উন্নয়ন একাডেমী।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যোগ দিয়েছিলাম ইস্পাহানী স্কুলে, তখন অবশ্যি নাম ছিল ক্যান্টনমেন্ট স্কুল। বছরতিনেক কাজ করার পর আর ভাল লাগল না। খান সাহেবের তিন বাচ্চাই এই স্কুলে পড়ত তখন। তার মধ্যে আম্মাকে দিয়ে একটু সময় চেয়ে নিলাম তাঁর কাছ থেকে। বাড়ীতে দেখা হোল। তারপরেই ফরমাল ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি নিলাম একাডেমীতে।
কুমিল্লা একাডেমী যখন শুরু হয় সে সময়টা ছিল ১৯৫৯ সালের মাঝামাঝি। এ দেশে সমবায় পদ্ধতি এবং ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। পরে আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক হয়েছিল তাঁর কর্মযজ্ঞ। নানা দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলেন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ লোকজন। দারিদ্র্য, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা, কৃষি ব্যবস্থা ইত্যাদি সার্বিক গ্রামীণ উন্নতির জন্য তিনি নিরলস চেষ্টা করে গিয়েছিলেন এদেশে।
সে সময়টায় অসম্ভব ব্যস্ত থাকতেন খান সাহেব। একাডেমীতে বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং, প্রকল্প ও প্রোগ্রামের পরিচালনা ও পরিদর্শন, অর্থের সমন্বয় ও সরকারের সঙ্গে নিয়মিত লিয়াজোঁ রাখা, বিদেশি পরিদর্শকদের সঙ্গে বৈঠক ইত্যাদি বহুবিচিত্র কাজে দিনের অধিকাংশ সময় নিবেদিত ছিল তাঁর।
তাছাড়া নান্য সভাসমিতি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে বক্তৃতা করতে হোত এবং একাডেমীয় তরফ থেকে সেগুলোর রেকর্ড করার নিয়ম ছিল। আমার কাজ ছিল বক্তৃতা গুলোকে ঃৎধহংপৎরনব করা এবং মোটামুটি সম্পাদনা করে পুস্তিকাকারে বের করা। সে সময় তাঁর ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে থেকে তাঁকে দেখেছি। প্রত্যক্ষ ছাত্রী হওয়ার সুবাদে তাঁর কাছে আমায় যথেষ্ট প্রশ্রয় ছিল। তাছাড়া কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আমার বাবা অধ্যাপক সুধীর সেন ছিলেন তাঁর সহকর্মী। বাবাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন আখতার হামিদ খান। সবকিছু মিলিয়ে আমার জন্যে তাঁর একটা স্নেহকোণ তৈরি হয়েছিল, যেটার সদ্ব্যবহার আমি প্রায়ই করতাম। তাঁর সস্নেহ অনুমোদনে ফেকাল্টি মিটিংয়ে গরহাজির হওয়া আমার নিয়মিত ব্যাপার ছিল। ফেকাল্টি মিটিং পরিত্যাগ করার আরও একটি সঙ্গত কারণ ছিল। কোন কাজ প্রত্যাশিত না হলে সিনিয়রদেরও ছেড়ে দিতেন না খান সাহেব। গালিগালাজ করতেন। সবসময় শালীনতার মাত্রা রক্ষিত হতো না। ইংরেজি একটা দুর্বচন প্রায়ই উচ্চারণ করতেন। হাসি চেপে রাখা দুষ্কর অথচ হেসে ফেলাটা ছিল সপ্ত বেয়াদবি। সেজন্য প্রায় সময়েই নিরাপদ দূরত্বে থাকার চেষ্টা করতাম। কোন একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম এত মুখ খারাপ করেন কেন। জবাবে বলেছিলেন- ‘দারোগার ছেলে যে।’
কাজে ফাঁকি দিয়ে অসংখ্য দিন তাঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছি গ্রাম গঞ্জে হাটে মাঠে। ক্ষেতের আলে বসে যখন চাষীদের সঙ্গে কথা বলতেন ওদের সঙ্গে পড়সসঁহরপধঃরড়হ এ কোন অসুবিধে ছিলনা তাঁর। আমিও মন দিয়ে শুনতাম। পরে জায়গামত সেগুলো উদ্ধৃত করেছি। কোরান শরীফের অনেক আয়াৎ ও এদের তর্জমা তাঁর কাছ থেকে আয়ত্ত করেছিলাম, সঠিক উচ্চারণে বলাটাও। আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি এবং সঠিক বিষয়ে সঠিক উদ্ধৃতি ছাড়াও অন্তত চারটি ভাষায় অনর্গল বলতে পারা বোধহয় একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল।
কখনো কখনো বিরল অবকাশে, সুফীবাদ, জালালউদ্দীন রুমি, ফিটজারেল্ডের ওমর খৈয়াম নিয়ে আলোচনা হোত, এবং বলা বাহুল্য রবীন্দ্রনাথও থাকতেন একটা বৃহৎ অংশ জুড়ে। নিজে কবিতা লিখতেন এবং পছন্দসই কবিতার আবৃত্তি শুনতে ভালবাসতেন। একবার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে ইন্দিরা রোডে উঠলেন। দেখা করতে গেছি, সঞ্চয়িতা থেকে তিনটে কবিতা পড়ে শোনাতে হোল। এরকম আরও অসংখ্যবার ঘটেছে। পরেরদিকে বৌদ্ধধর্ম নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন, এই দর্শনে বোধহয় একটা মানসিক সমতা এবং স্থৈর্য খুঁজে পেয়েছিলেন যা তাঁর জীবনকে প্রভাবিত করেছিল অনেকটা।
বাংলাদেশের জন্যে তাঁর একটা অকৃত্রিম ভালবাসা ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অবাঙ্গালী হয়েও তাঁর উদ্বেগ এবং পড়হপবৎহ আমাদের বিস্মিত করে। কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পরে আর স্থায়ীভাবে ফিরে আসেননি তিনি। সম্ভবত এই দেশ তাঁর অর্জনের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়নি। দুর্ভাগ্য আমাদের, মননে চেতনায় আমাদের একজন হলেও আমরা তাঁকে পর করে দিয়েছিলাম। এর ফলে ক্ষতি হয়েছে আমাদেরই, তাঁর নয়।
অধ্যক্ষ এবং কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর মহা পরিচালক আখতার হামিদ খান একটি শীর্ষস্থানীয় নাম। সে সময়কার পাকিস্তানেই শুধু নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর খ্যাতি ছিল পরিব্যাপ্ত।
এমন একটি বিরল প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ ও তাঁর ঘনিষ্ঠ জন তথ্যবহুল রচনা লিখবেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা অন্য একটা মাত্রা পেয়েছিল। তিনি একদিকে ছিলেন আমার শিক্ষক, অভিভাবক, উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অন্যদিকে ছিলেন স্নেহময় এক পরম আত্মীয়।
শ্রদ্ধেয় আখতার হামিদ খান-- তাঁর তুলনা একমাত্র তিনিই।
