হোদায়বিয়ার সন্ধির পর ষষ্ঠ হিজরির জিলহজ মাসে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরব উপদ্বীপে আশপাশের ছয় জন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা হলেন, পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস, হাবশার আশামা ইবনে আবজার, মিশরের শাসক মুকাওকিস, শামের গভর্নর বা শাসক হারিস বিন আবি শামার আল-গাসসানী এবং বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবনে সাওয়া।
পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের কাছে রাসুলুল্লাহর চিঠি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা আস-সাহমিকে (রা.)। মদিনা থেকে যাত্রা করে বেশ কয়েক দিনের সফরের পর তিনি পারস্যের রাজপ্রাসাদে পৌঁছেন, রাজদরবারে প্রবেশের অনুমতি চান এবং খসরুর নিরাপত্তারক্ষীদের জানান যে, তিনি মদিনার নবী মুহাম্মাদের (সা.) পক্ষ থেকে এক বিশেষ বার্তা বহন করে এনেছেন।
চিঠি নিয়ে মদিনার দূতের আগমনের খবর পেয়ে খসরু তার রাজকীয় দরবার অলংকৃত করার নির্দেশ দেন। সাম্রাজ্যের উজির, আমির ও সামরিক প্রধানদের উপস্থিতিতে দরবার পূর্ণ হলে আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফাকে (রা.) দরবারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। সাধারণ খসখসে জুব্বা পরা সত্ত্বেও আবদুল্লাহর (রা.) ঋজু ভঙ্গি ও সমুন্নত মস্তক পারস্যের সেই চোখধাঁধানো আড়ম্বরের মাঝে এক অদম্য ইমানি মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তিনি ধীর পায়ে হেঁটে সরাসরি সিংহাসনে সমাসীন খসরুর মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ান।
খসরু ইঙ্গিত দিয়ে তার এক অনুচরকে চিঠিখানা গ্রহণ করতে বললে আবদুল্লাহ (রা.) দৃঢ়কণ্ঠে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন চিঠিটি সরাসরি আপনার হাতে তুলে দিতে। রাসুলুল্লাহর (সা.) কোনো আদেশের বিরোধিতা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ দোভাষীর মাধ্যমে এ কথা শুনে খসরু তাকে কাছে যাওয়ার অনুমতি দেন। আবদুল্লাহ (রা.) খসরুর নিকটে গিয়ে চিঠিটি হস্তান্তর করেন। খসরু দোভাষীকে তা পাঠ করার নির্দেশ দেন।
দোভাষী চিঠির সিলমোহর উন্মোচন করে পড়া শুরু করেন, ‘পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্যের মহান সম্রাট খসরুর প্রতি। তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, যিনি সৎপথের অনুসরণ করেন...’
চিঠিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের নাম খসরুর নামের আগে লিখেছেন-কেবল এইটুকু শুনেই অহংকারী খসরুর মাথায় ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। তিনি দোভাষীর হাত থেকে চিঠিখানা কেড়ে নেন এবং বিষয়বস্তু না শুনেই তা ফালাফালা করে ছিঁড়ে ফেলেন। চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘আমার এক অধীনস্ত প্রজা হয়ে সে আমার আগে নিজের নাম লেখার সাহস পায় কীভাবে?’ এরপরই তিনি আবদুল্লাহকে (রা.) অবিলম্বে দরবার থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আব্দুল্লাহ (রা.) প্রাসাদ থেকে বের হয়ে সওয়ারিতে চেপে মদিনার পথ ধরেন। রাসুলুল্লাহর (সা.) চিঠি তিনি পারস্য-সম্রাটের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তার দায়িত্ব এইটুকুই ছিল। খসরুর রাগ কিছুটা প্রশমিত হলে তিনি দূতকে পুনরায় তার দরবারে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়, কিন্তু ততক্ষণে আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা (রা.) নাগালের বাইরে চলে গেছেন।
মদিনায় পৌঁছে আবদুল্লাহ (রা.) মহানবীকে (সা.) পুরো ঘটনা ও খসরুর চিঠি ছিঁড়ে ফেলার ঔদ্ধত্যের কথা জানান। শুনে আল্লাহর রাসুল (সা.) শুধু বলেন, ‘আল্লাহ তার রাজত্বকেও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিন!’
অন্যদিকে অহংকারী খসরু ইয়েমেনে নিযুক্ত তার গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দেন, যেন মদিনায় দুজন সশস্ত্র সৈন্য পাঠিয়ে এই ‘মুহাম্মদ’ নামের ব্যক্তিটিকে বন্দি করে তার দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। বাযানের পাঠানো দুই প্রতিনিধি যখন মদিনায় পৌঁছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের একদিন অপেক্ষা করতে বলেন। পরদিন সকালে মহানবী (সা.) তাদের ডেকে বলেন, ‘আপনারা আর কখনো খসরুর দেখা পাবেন না। কারণ, অমুক রাতে আল্লাহ তাআলা তার নিজের পুত্র ‘শিরওয়াইহ’-কে দিয়ে তাকে হত্যা করিয়েছেন।’
নবীজির (সা.) মুখে এই কথা শুনে দূতদ্বয় বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে ইয়েমেনে ফিরে যায় এবং গভর্নর বাযানকে পুরো ঘটনা জানায়। কয়েকদিনের মধ্যেই পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী থেকে ইয়েমেনে শিরওয়াইহের চিঠি এসে পৌঁছে যেখানে খসরুর শিরওয়াইহের হাতে নিহত হওয়া ও শিরওয়াইহের সিংহাসনে আরোহনের খবর জানানো হয়। বাযান বুঝতে পারেন, আরবের নবী আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত, ভণ্ড বা মিথ্যুক কোনো ব্যক্তি নন। এই ঘটনার পর ইয়েমেনের গভর্নর বাযান ইসলাম গ্রহণ করেন। বাযানের সভাসদ, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ইয়েমেনে বিপুল সংখ্যক পারসিক ও সাধারণ বাসিন্দাও ইসলাম গ্রহণ করে।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া
