বাংলাদেশের
রাজনীতিতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের জীবন ও কর্ম কেবল একটি
রাজনৈতিক দলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও সংসদীয়
ব্যবস্থার বিকাশে তাঁদের অবদান জাতির সম্পদ হয়ে ওঠে। সাবেক স্পিকার, সাবেক
শিক্ষামন্ত্রী, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও বিএনপির
স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন তেমনই
একজন প্রাজ্ঞ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক
অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
৯৪ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হলেও কর্মময়
জীবনের উত্তরাধিকার দীর্ঘদিন ধরে দেশকে পথ দেখাবে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে
তিনি সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং আন্তর্জাতিক
পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদীয়
গণতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক চর্চায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে সমকালীন
রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
১৯৩১ সালের ১
ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় জন্ম নেওয়া জমির উদ্দিন সরকার ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং পরে আইনশাস্ত্রে
ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে যুক্তরাজ্যে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে দেশে
ফিরে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হন। সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি
আইনের একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন
থেকেই তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা শুরু। সময়ের পরিক্রমায় তিনি জাতীয়তাবাদী
রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখে পরিণত হন। বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলটির
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
রাজনীতিতে শালীনতা, ভদ্রতা, সহিষ্ণুতা এবং সাংবিধানিক রীতিনীতির প্রতি তাঁর
অঙ্গীকার ছিল সুস্পষ্ট।
সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাঁর অভিজ্ঞতা
ছিল বহুমাত্রিক। তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন, পররাষ্ট্র, ভূমি, শিক্ষা,
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শিক্ষা খাতের উন্নয়নে তাঁর অবদান স্মরণীয়। অষ্টম
জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনায় তাঁর নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা
সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধান অনুযায়ী
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের
সময়ও তিনি স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী আইনজীবীদের অন্যতম ছিলেন।
স্বাধীনতার পর দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার
প্রচেষ্টায় তাঁর ভূমিকা ছিল ধারাবাহিক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি একাধিকবার
বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
পঞ্চগড়ের উন্নয়নেও তাঁর অবদান
বিশেষভাবে স্মরণীয়। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন জনপ্রতিনিধিই
ছিলেন না, বরং একজন অভিভাবক ও উন্নয়নের রূপকার হিসেবে বিবেচিত হতেন। শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক নানা কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রত্যক্ষ
ভূমিকার কারণে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন।
একজন লেখক
হিসেবেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। গণতন্ত্র, সংসদীয় কার্যপ্রণালী,
আন্তর্জাতিক আইন ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত
হয়েছে, যা গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য মূল্যবান তথ্যভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত
হতে পারে।
আজকের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের যে
সংস্কৃতি ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে, সেখানে জমির উদ্দিন সরকারের জীবন আমাদের
অন্য এক রাজনৈতিক চর্চার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও
পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শালীন আচরণ, সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য এবং
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার যে রাজনৈতিক দর্শন তিনি ধারণ
করেছিলেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়।
একজন রাজনীতিকের প্রকৃত
মূল্যায়ন তাঁর পদ-পদবিতে নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজে রেখে যাওয়া ইতিবাচক
প্রভাবের মধ্যেই নিহিত থাকে। ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার সেই
অর্থে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর প্রস্থান একটি
যুগের অবসান হলেও তাঁর আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক চেতনা ভবিষ্যৎ
প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
কীর্তিমান মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁদের
কর্ম ও অবদান ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক
ইতিহাসে ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের নামও তেমনি সম্মান ও
শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
লেখক: প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
আব্দুল মতিন খসরু সরকারি কলেজ, বুড়িচং, কুমিল্লা
