কুমিল্লা প্রতিনিধি।।
কুমিল্লায়
সালিশে যুক্ত থাকায় মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষক মো. গোলাম রসুল
মজুমদার লিটনকে (৪৮) কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকান্ডের দুই বছর পর
আদালতে আসামির স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর হত্যার রহস্য উদঘাটন
করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। থানা পুলিশ এই মামলার
চার্জশিট দিলেও আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না থাকা এবং এজাহারনামীয়
অপর আসামির সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত না হওয়ায় মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা
তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে পিবিআই মামলার তদন্ত শুরু
করে। এ ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা মামলার আসামি সাফায়েত আলী ওরফে
সাফুকে (৩৫) রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার রহস্য বের হয়। তিনি
হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার মামলার তদন্ত
কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক দিদারুল ফেরদাউস সাংবাদিকদের এসব তথ্য
জানিয়েছেন। তিনি দুই মাস আগে এই মামলার তদন্তের দায়িত্বভার পান।
মামলার
অভিযোগ ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, নিহত গোলাম রসুল মজুমদার লিটন জেলার সদর
দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা দক্ষিণ ইউনিয়নের নলকুড়ি গ্রামের মৃত তফাজ্জল
হোসেনের ছেলে। তিনি নলকুড়ি ফোরকানীয়া মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন। ২০২৪ সালের ৬
মার্চ তিনি যখন মাদরাসায় পাঠদান করছিলেন, তখন একই গ্রামের শাহ আলমের ছেলে
ঘাতক সাফায়েত আলী শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পেছন থেকে এসে ধারালো দা দিয়ে তাকে
উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে পালিয়ে যান। পরে স্থানীয় জনতা ধাওয়া
করে পাশের গ্রাম থেকে তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
পিবিআই জানায়, এ
ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মাহমুদা হেলেন চৌধুরী বাদী হয়ে সাফায়েত আলী ও তার বড়
ভাই কেরামত আলীসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে সদর দক্ষিণ মডেল থানায়
একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ আসামিকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে
জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। পরে পুলিশ
সাফায়েতের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। থানা পুলিশের তদন্তে
হত্যাকা-ের মূল রহস্য ও অন্য আসামিদের সম্পৃক্ততা স্পষ্ট না হওয়ায় মামলার
বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর
আদালত মামলাটির অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত
কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক দিদারুল ফেরদাউস জানান, কারাবন্দী আসামি
সাফায়েত আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করলে আদালত এক
দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। গত বুধবার আসামিকে পিবিআই হেফাজতে এনে
জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি হত্যাকা-ের রোমহর্ষক বর্ণনা দেন। পরদিন
বৃহস্পতিবার ওই আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। তিনি
একাই এই হত্যার সাথে জড়িত।
পিবিআই কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. মতিয়ার
রহমান সাংবাদিকদের জানান, ঘাতক সাফায়েত আলী একসময় সিঙ্গাপুর প্রবাসী ছিলেন।
দেশে ফিরে বিয়ে করার পর তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। মাদকের কারণে স্ত্রীর
ভরণপোষণ দিতে না পারায় স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তীতে নিজের ভাইয়ের
কাছে জমি বিক্রি করে তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও হতাশ হয়ে পড়েন। এসব পারিবারিক
বিষয় নিয়ে স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকবার সালিশ-বিচার করেছিলেন প্রতিবেশী মাদরাসা
শিক্ষক গোলাম রসুল মজুমদার লিটন। এসব সামাজিক বিচার ও বিভিন্ন বিষয়ের
প্রতি ক্ষোভ থেকেই শিক্ষক লিটনের ওপর ক্ষুব্দ হয়ে সাফায়েত মাদরাসার
শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষক লিটনকে কুপিয়ে হত্যা করেন।
