
রাজধানীর
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে অভিভাবকদের ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যেই
কন্যা সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন অভিভাবক। জানা গেল, বড় ছেলে তৃতীয়
শ্রেণিতে পড়ে, ছোট মেয়েকে এখনো স্কুলে দেননি। ছেলেকে স্কুলে ঢুকিয়ে
অন্যান্য অভিভাবকদের সাথে লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ নিয়েই গল্প করছিলেন, সে ফাঁকেই
তার সাথে আলাপ।
কথা বলতে বলতে তিনি বললেন, সরকারি স্কুলে ছেলের বই বিনা
মূল্যে পাই এটা অনেক বড় সহায়তা। কিন্তু শুধু বই পেলেই তো সব হয় না। কোচিং,
খাতা-কলম, পোশাক, যাতায়াত সব মিলিয়ে অনেক খরচ! আর ছোট মেয়ের জন্য একটা ভালো
প্রি-স্কুল খুঁজছি, কিন্তু যেগুলো ভালো, সেগুলোর খরচ আমাদের সামর্থ্যের
বাইরে।
অভিভাবকের সাথে কথার মাধ্যমে বাংলাদেশের লাখো পরিবারের বাস্তবতার
আঁচ পাওয়া যায়। আমরা যখন জাতীয় বাজেট নিয়ে কথা বলি, তখন সাধারণত রাস্তা,
সেতু, জিডিপি, কর, মূল্যস্ফীতি-এসব শব্দই বেশি শোনা যায়। কিন্তু খুব কমই
প্রশ্ন ওঠে, ‘এই বাজেটে শিশুদের জন্য কী আছে?’
সচেতন নাগরিক মাত্রই
জানেন যে, বাজেট শব্দের অর্থ কেবল অর্থের হিসাব নয় বরং এটি একটি দেশের
নৈতিক অগ্রাধিকার প্রকাশ করে। প্রকাশ করে ভবিষ্যতের মানুষের জন্য তাদের
ভাবনার নকশা নিয়ে! বাজেট কেবল বর্তমানের সমস্যার সমাধানের জন্য অর্থভিত্তিক
পরিকল্পনা নয় বরং ভবিষ্যৎ মোকাবেলার ভাবনাও!
একটি রাষ্ট্র তার বাজেটে
কোথায় কত টাকা খরচ করছে, সেটাই বলে দেয় সে ভবিষ্যৎকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
আর ভবিষ্যৎ বলতে যদি কাউকে বোঝায়, তবে তারা হলো আগামীর মানুষ; শিশু।
বাংলাদেশের
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার ছিল প্রায় ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি
টাকা। বাজেটে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো, বিনিয়োগ এসবের কথা এসেছে
বারবার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে শিশুদের জন্য সরাসরি
বরাদ্দ কত?
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, শিশুদের জন্য আলাদা কোনো খাত
নেই। কিন্তু বাস্তবে শিশুদের প্রয়োজন ছড়িয়ে আছে নানা মন্ত্রণালয় ও খাতে
যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, পুষ্টি, স্থানীয় সরকার, নারী ও
শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, এমনকি পানি ও স্যানিটেশনেও। উদাহরণ হিসেবে শিক্ষা
খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ছিল প্রায় ৪১
হাজার কোটি টাকা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ছিল প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার
কোটি টাকা। সংখ্যাগুলো বড়। কিন্তু এই টাকার কতটা শিশুর সরাসরি কল্যাণে
যাচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। কারণ বাজেটে ‘শিশু’ আলাদা করে
দৃশ্যমান নয়।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জেমস হেকম্যান একবার বলেছিলেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হলো শিশুদের ওপর বিনিয়োগ।
কারণ আজ একটি শিশুর পুষ্টি, শিক্ষা ও নিরাপত্তায় যে টাকা খরচ হয়, সেটিই ভবিষ্যতে একটি সুস্থ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল নাগরিক তৈরি করে।
একই
সাথে বলবো গর্ভাবস্থা থেকেই যদি মায়েদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিকটির প্রতি
লক্ষ্য রাখা যায় তবে ভবিষ্যতের মানুষগুলো আরও সুন্দর ও সুস্বাস্থ্য নিয়ে
পৃথিবীর বুকে আসে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা কী বলে? বাজেট আলোচনায় শিশুদের
প্রায়ই ‘কল্যাণমূলক ব্যয়’ হলো সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সমাজের
দুস্থ, দরিদ্র, বয়স্ক, অসুস্থ বা অসহায় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন,
মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যে অর্থ
ব্যয় করা হয়।
হিসাবে দেখা হয় যেন এটি একটি দয়া অথবা সহায়তা। অথচ শিশুদের
জন্য ব্যয় দান নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ইউনিসেফ বলে যে, শিশুদের জন্য
বরাদ্দ ব্যয় নয় বরং বিনিয়োগ। বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, জীবনের প্রথম
পাঁচ বছর শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এই সময়
পুষ্টি, যত্ন, খেলাধুলা ও মানসম্মত প্রারম্ভিক শিক্ষা না পেলে, সেই ঘাটতি
পরে পুরোপুরি পূরণ করা যায় না। এমনকি গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টির যথাযথ
খেয়াল না রাখলে পরবর্তীতে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় পুষ্টির অভাবহীনতার
ছাপ লক্ষ্য করা যায়! ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, আয়োডিন, প্রোটিন, ওমেগা-৩ এর
অভাবে পরবর্তীতে মনোযোগের সমস্যা, স্মৃতিশক্তি দুর্বলতাসহ নানা রকমের
সমস্যার মুখোমুখি শিশু হতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসে আমাদের বাজেটে আর্লি
চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট (ঊঈউ) এর গুরুত্ব কোথায়?
বাংলাদেশে এখন
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে অনেক কথা হয়। জাতীয় শিক্ষানীতিতে এর
স্বীকৃতি আছে। সরকারি স্কুলে দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু
হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে একজন শিক্ষককে কখনো কখনো পঞ্চাশ ঊর্ধ্বও সংখ্যার
শিশুদের ক্লাস নিতে হয়।
পর্যাপ্ত খেলনা নেই, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে
প্রশিক্ষণ নেই, ক্লাসগুলোয় যথাযথভাবে প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম বা ক্ষেত্র
বিশেষে মাইক্রোফোনের ব্যবহার নেই। যে খেলনাগুলো বছরের শুরুতে কেনা হয়
সেগুলো কিছু ক্ষেত্রে বছরের তিন মাসও টেকসই হয় না! ক্লাসরুমে চার্ট ব্যবহার
করে ও বোর্ডে ছবি এঁকে এতগুলো শিক্ষার্থীদের আর কত ভালো পাঠদান করানো যায়?
সরকারি
স্কুলগুলোয় বড় পরিসরের মাঠ বা উঠোন থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় তাও
থাকে না! শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করে মুরগির খোয়ারে! কিন্তু এখানেও প্রশ্ন
আসে, কত শতাংশ সরকারি স্কুল প্রি-প্রাইমারির শিক্ষার্থীদের মাঠে বা
প্রাঙ্গণে নিয়ে হাতে কলমে স্পর্শ করিয়ে, দেখিয়ে পরিবেশ সম্পর্কে পরিচিতি
দেওয়ার সুযোগ পায়?
তাহলে দিনশেষে ফ্রি বই, সকালের টিফিন আর বেতন ফ্রি
করে মূল শিক্ষা কী লাভ হলো? সেইতো মুখস্থ নির্ভর লেখাপড়া, অনাধুনিক এবং
ক্লাসরুম কেন্দ্রিক! একজন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক বলছিলেন, আমাদের বলা হয়
খেলাধুলার মাধ্যমে শেখাতে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে যদি বল, ব্লক, বই, খেলার
উপকরণই না থাকে তাহলে কী দিয়ে শেখাব? এই প্রশ্ন শুধু একজন শিক্ষকের নয়; এটি
বাজেটের প্রশ্ন।
বাংলাদেশ শিশু মৃত্যুহার কমিয়েছে, টিকাদানে সাফল্য
পেয়েছে এটি সত্য বলেই জানতাম কিন্তু বর্তমান সময়ে যখন হামের টিকার
স্বল্পতার কারণে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে; বড় মুখ করে একথা কি আর বলা যায়?
অনেক পরিবারে শিশুর পেট ভরে, কিন্তু পুষ্টির অভাব শরীরে। অর্থাৎ খাবার আছে,
কিন্তু সুষম খাবার নেই। এর ফলে খর্বতা, কৃশতা, রক্তশূন্যতা এসব সমস্যা
দেখা দেয়।
শিশুদের পাশাপাশি গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টিও কি সেই সাথে দেখার
বিষয় নয়? স্কুলে শিশুদের যে ফ্রি টিফিন দেওয়া হয় সেটা কি পুষ্টিকর? ডিম কি
সব স্কুলের সব শিশুরা পায়? এখানে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন আছে। বাজেট,
বরাদ্দ-এর পরবর্তী সময়ে বরাদ্দ যথাযথভাবে হয়েছে কি না সেটার তথ্য মাঠ
পর্যায় থেকে নেয়ার প্রয়োজন আছে।
শিশুদের পাশাপাশি মাঠ পর্যায় থেকে যদি
গর্ভবতী মা ও তাদের খাবার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা যায় তাহলে আরও কার্যকরী
হয় পরিকল্পনাগুলো। যদি বাজেটে শিশু পুষ্টি কর্মসূচি, স্কুল মিল (মিলে আসলে
কি দেওয়া হচ্ছে বা যথাযথভাবে দেওয়া হচ্ছে কি না), কমিউনিটি পর্যায়ে পুষ্টি
শিক্ষা এসব বড় অগ্রাধিকার না দেওয়া হয়, তাহলে উন্নয়ন কাগজে থাকবে, শরীরে
নয়।
বাংলাদেশ সরকার ‘শিশু বাজেট’ ধারণা চালু করেছে এটি একটি ইতিবাচক
পদক্ষেপ। প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের একটি অংশে শিশুদের জন্য বরাদ্দের
বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি সাধারণ মানুষের কাছে
বোধ্য? একজন সাধারণ বাবা বা মা কি সহজে বুঝতে পারেন এই বছরের বাজেটে তার
সন্তানের জন্য কী আছে?
একজন শিক্ষক কি জানেন তার স্কুলে নতুন কী আসছে?
বা এতে করে পাঠদানের ক্ষেত্রে নতুন কি সহযোগিতা তিনি পাচ্ছেন? একজন স্থানীয়
জনপ্রতিনিধি কি জানেন তার ইউনিয়নের শিশুদের জন্য কী বরাদ্দ এসেছে? যদি
উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে বাজেটের তথ্য আছে, কিন্তু জনগণের ক্ষমতায়ন হয়নি।
এখন
সত্যিকার অর্থে শিশুদের গুরুত্ব দিতে হলে বাজেটে কয়েকটি বিষয় জরুরি,
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় বেশি বিনিয়োগ, শিশু পুষ্টিকে অগ্রাধিকার, গর্ভবতী
মায়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, শিশু সুরক্ষায় বরাদ্দ, শিশুদের আধুনিক ও
কার্যকরী শিক্ষার জন্য বরাদ্দ, শিশুদের জন্মদান থেকে শুরু করে শিক্ষাদান
কর্মসূচি পর্যন্ত চারপাশের মানুষগুলো যে যে জড়িত তাদের সবার কথা বিবেচনায়
এনে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য চমৎকার পরিবেশ নিশ্চিত করণের ক্ষেত্রে বাজেট
বরাদ্দ রাখা।
উপরে উল্লিখিত অভিভাবকের ছোট মেয়ে একদিন কোনো না কোনো
স্কুলে ভর্তি হবে কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ শুধু পরিবারের চেষ্টায় গড়ে উঠবে না;
সেটি নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারও। জাতীয় বাজেটের বিশাল অঙ্কের
মধ্যে শিশুদের জন্য বরাদ্দ হয়তো একটি সংখ্যা। কিন্তু সেই সংখ্যার ভেতরে
লুকিয়ে আছে একটি শিশুর প্রথম বই, প্রথম টিকা, প্রথম নিরাপদ খেলার মাঠ,
প্রথম শিক্ষক, প্রথম স্বপ্ন।
প্রশ্নটা তাই খুব সহজ আমরা কি বাজেটে
শিশুদের খরচ বা ব্যয় হিসেবে দেখি, নাকি ভবিষ্যৎ বা বিনিয়োগ হিসেবে? এই
প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে বাংলাদেশ তার আগামীকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
দিচ্ছে কি?
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, শৈশব; শিক্ষা বিষয়ক গবেষক
