আধুনিক
বাংলা কাব্যসংসারে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অকালমৃত্যু পরম অনুশোচনার
বিষয়। সুকান্তর জন্ম ১৩৩৩ সালের ৩১ শ্রাবণ, অর্থাৎ ১৯২৬ সালের ১৬ আগস্ট,
তাঁর মৃত্যু ১৩৫৪ সালের ২৯ বৈশাখ, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১২ মে। মৃত্যুকালে তার
বয়স হয়েছিল ২০ বৎসর ৮ মাস ২৬ দিন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’
প্রকাশিত হয়েছে তার মৃত্যুর পরে।
বাংলার কবিকিশোর সুকান্ত ভট্টাচার্যের মৃত্যুসংবাদ শুনে প্রথমেই মনে পড়লো সত্যেন্দ্রনাথের ‘ছিন্ন-মুকুল’-এর শেষ চার পংক্তিঃ
সব-চেয়ে যে শেষে এসেছিল
সেই গিয়েছে সবার আগে সরে,
ছোট্ট যে-জন ছিল রে সব-চেয়ে
সেই দিয়েছে সকল শূন্য ক’রে!
তরুণ
প্রতিভার অকাল-মৃত্যু পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম নয়। মনে পড়ছে শেলী-কীট্সের
কথা। বিশেষ করে কীট্সের। জীবনের ছাব্বিশটি বসন্ত শেষ না হতেনই তাঁকে
বিদায় নিতে হল এই চিরসুন্দর পৃথিবী থেকে। সুকান্তর সঙ্গে কীট্সের মৃত্যুর
একদিকে দিয়ে মিল আছে।-উভয়েরই মৃত্যু ক্ষয়রোগে। কিন্তু আরেক দিক দিয়ে
সুকান্ত একক, অনন্য। মৃত্যুর পূর্বে কীট্স অভিমান বশে বলে গিয়েছিলেণ, আমরা
সমাধিফলকে লিকে রেখো-‘ঐবৎব ষরবং ড়হব যিড়ংব হধসব ধিং ৎিরঃ রহ ধিঃবৎ.’।
সুকান্তর ব্যক্তিগত নালিশ কারো বিরুদ্ধেই ছিল না, ব্যক্তি-সত্তাই যেন তার
ছিল না-সুতরাং এমন অভিমান সে কোনদিনই প্রকাশ করতে পারত না। এই প্রসঙ্গে মনে
পড়ছে ইংলন্ডের আরেকটি কবিকিশোরের কথা-চ্যাটারটন। দারিদ্র্যের দুঃসহ কশাঘাত
সহ্য করতে না পেরে নৈরাশ্যে সে সতোরো বছর বয়সে আর্সেনিক খেয়ে আত্মহত্যা
করেছিল। সুকান্ত আত্মহত্যা করে নি, তাকে হত্যা করা হয়েছে।
যে-দেশের
আকাশ-বাতাস কিশোর-কিশোরী-লীলার কোমলকান্ত-পদাবলীতে প্রতিধ্বনিত, সে দেশের
কবিকিশোর সুকান্তকে কি দুঃখেই না বলতে হয়েছে, এ দেশে জন্মে পদাঘাতই
শুধু পেলাম,
অবাক পৃথিবী! সেলাম, তোমাকে সেলাম! [অনুভব]
চিরবসন্তের কবি রবীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল উত্তরাধিকার যার পরম গৌরব তাকে কী গভীর বেদনাতেই না উচ্চারণ করতে হয়েছে ঃ
আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,
প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি!
আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,
আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,
আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে
আমার বিস্ময় জাদে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।
কিন্তু
এই পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করবার জন্যেই তো সুকান্তর মত মহৎ কবিপ্রাণের
জন্ম হয় নি। মনের খেয়ালে দেয়ালে-দেয়ালে নখের আঁচড় কেটে দু-হাতে যে কবিতার
ফুলঝুরি ছড়িয়ে গেছে তার সঙ্গে ভাগ্যের এ কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যে চাঁদ চিরকাল
কবিপ্রেয়সীর মুখচন্দ্রের উপমান আর মধুর আদিরসের উদ্দীপন বিভাব হয়েছে, সেই
চাঁদ আর পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে কবির মনে হয়েছে-
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
অথবা
হয়ত এরই নাম ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। যে ধারাবাহিক কার্যপরস্পরায় সুকান্তর
জীবন গ্রথিত ছিল তার বিচার-বিশ্লেষণে বসলে হয়ত মনে হবে, এই পরিণতিই ছিল তার
পক্ষে অবশ্যম্ভাবী।
২
সুকান্ত যে অনন্যাসাধারণ কবি ছিল, প্রথম
প্রকাশেই ছিল তার নিঃসংশয় প্রমাণ। তাই সংবাদপত্রে প্রকাশিতব্য ‘বিবৃতি’ও
তার কণ্ঠে ‘সহৃদয়াহ্লাদকারিস্পন্দসুন্দর’ কাব্য হয়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে তার
পরিচয় স্পষ্ট হল। দেখা গেল, সুকান্তের কবি-পরিচিতি দশজনের ভিড়ে হারিয়ে
যাবার মত নয়। যে কবির বাণী শোনবার জন্যে কবিগুরু কান পেতে ছিলেন, সুকান্ত
সেই কবি। সুকান্তই আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রথম জনগণের কবি। শৌখিন মজদুরি
নয়, কৃষাণের জীবনের সে ছিল সত্যকার শরিক-কর্মে ও কথায় তাদেরই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ
আত্মীয়তা ছিল তার, মাটির রসে ঋদ্ধ ও পুষ্ট তার দেহমান। মাটির বুক থেকেই সে
উঠে এসেছিল।
সুকান্ত সূর্যের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলেছে, ‘হে সূর্য,
তুমি তো জানো, আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব! সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে, এক
টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে, কতো কষ্টে আমরা শীত কাটাই।’
হে সূর্য! তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে
উত্তাপ আর আলো দিও,
আর উত্তাপ দিও,
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
এটি
হয়ত কবিতা হয়ে ওঠে নি-কিন্তু অকৃত্রিম মানব-প্রেমের অমন নিরাবরণ উদাহরণ
সাহিত্যে কদাচিৎ চোখে পড়ে। ফুল্লরার দারিদ্র্য আর এ-দারিদ্র্যের চেহারা
একই-কিন্তু ফুল্লরার দুঃখ ব্যক্তিসীমাকে অতিক্রম করতে পারে নি। এখানে
দারিদ্র্য রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটার প্রতি সমপ্রাণতার রসে মিশ্রিত হয়ে
মানবপ্রেমের চিরনতুন অমৃতের আস্বাদ বয়ে এনেছে।
সমপ্রাণতার আরেকটি
সুন্দর নিদর্শন ‘রানার’-কবিতাটি। দিগন্ত থেকে দিগন্তে রাত্রির নৈঃশব্দ্যকে
মুখরিত ক’রে ঝুম-ঝুম ঘন্টা বাজিয়ে ছুটে চলেছে রানার। কাঁধে তার চিঠি আর
নতুন খভরের বোঝায়। কত গ্রাম কত পথ পেরিয়ে ভোরের শহরের উদ্দেশে তার রাতের
পাড়ি। সে ছুটে চলেছে, আর-
তার জীবনের স্বপ্নের মত পিছে স’রে যায় বন।
এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘মেলে’।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে,
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্পদামে।
অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।
‘ক্লান্তশ্বাস
ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে’-তবু রানারে বিশ্রাম নেই। রাতের পর রাত
সে বয়ে চলেছে মানুষের বার্তা। ‘কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত
দুঃখে ও শোকে’ নরনারী তাদের প্রিয়জনের উদ্দেশে লিখছে চিঠি-সে-সব খবর তাদের
কাছে পৌঁছে দেবার ভার নিয়েছে রানার। কিন্তু তার নিজের দুঃখ?-
এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও,
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,
এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,
এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে।
যাদের
দুঃখ কেউ কোনো দিনই জানবে না, করুণাকাতর কবি ‘কালো রাত্রির খামে’ ঢাকা
তাদের দুঃখের কাহিনী খাম খুলে আমাদের কাছে তুলে ধরেছে। এর প্রেরণামূলে শুধু
মমতা বা করুণাই আছে মনে করলে ভুল করা হবে-মানুষের সমব্যথী কবির সমপ্রাণতা
থেকেই এর সৃষ্টি।
ব্যক্তিজীবনের সুকান্ত একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদে
বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু এই শেষ চার পংক্তিতে কবি সুকান্ত যে আদর্শের কথা বলে
গেছে, তা পৃথিবীর সমস্ত মতবাদের চেয়েও প্রাচীন-সমস্ত আদর্শের চেয়েও বড়।
আকাশের ধ্রুবনক্ষত্র আর নদীর গতিশীলতা-অরণ্যের মর্মল-ধ্বনি আর পৃথিবীর
চিরকালের আবর্তন যাকে প্রেরণা দেয়, সে যে সমস্ত মতবাদের ঊর্ধ্বে চিরকেলে
কবিদেরই একজন, সে-বিষয়ে কি কোনো সন্দেহ থাকে?
৩
কাব্যের উপাদান
হিসেবে সুকান্ত যে-সব প্রতীক ব্যবহার করেছে, সেগুলোও চলতি জীবনের পথের
দুপাশ থেকেই কুড়িয়ে নেওয়া। তার জন্যে তাকে বিদেশী বা স্বদেশী পুরাণ-উপকথার
শরণ নিতে হয় নি। সুকান্তর কাব্য জীবনাশ্রয়ী, তার প্রতীকগুলোও জীবনাশ্রিত।
কন্ট্রোলের ‘কিউ’র কথা বলেছি। জানালায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধফেরত কনভয়কে দেখে তার
মনে জাগছে যুগ-যুগান্তরের রাজপথ বেয়ে ছুটে-আসা জন-কনভয়ের চিত্র ঃ ‘অনেক
যুগ, অনেক অরণ্য, পাহাড় সমুদ্র পেরিয়ে তারা এগিয়ে আসছে; ঝলসানো কঠোর-মুখে।’
সিগারেটকে সে করেছে শোষণকারীর হাতে শোষিত জনগণের প্রতীক ঃ ‘তোমাদের শোষণের
টানে আমরা ছাই হই, তোমরা নিবিড় হও আমাদের উত্তাপে।’ কখনো আবার প্রতীক
হয়েছে সিঁড়ি! তাদের মাড়িয়ে প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যায় প্রাসাদবিলাসী
উচ্চবিত্তের দল-তাদের পদধূলিধন্য জনগণের বুক পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত, হয়ে যায়
প্রতিদিন ঃ
তোমরাও তা জোনা,
তাই কার্পেট মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত
ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্নকে
আর চেপে রাখতে চাও পৃথিবীর কাছে
তোমাদের গর্বোদ্ধত, অত্যাচারী পদধ্বনি।
সব
প্রতীকই যে সুনির্বাচিত হয়েছে তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। অন্তত সিগারেটের
প্রতীক ভাবালুতা দোষ-দুষ্ট হয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু এদিক দিয়ে সুকান্তর ‘একটি
মোরগের কাহিনী’ এবং ‘চিল’ কবিতা-দুটি সার্থক হয়েছে স্বীকার করতেই হবে।
একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে, ভাড়া
প্যাকিং বাক্সের গাদায় আরো দু’তিনটি মুরগীর সঙ্গে। আশ্রয় যদিও মিললো,
উপযুক্ত আহার মিললো না। শুরু হলো আস্তাকুঁড়ে আনাগোনা। কিন্তু আশ্চর্য, সেই
আস্তাকুঁড়েও জুটলো অংশীদার-দেখা দিল প্রতিদ্বন্দ্বী ঃ
অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে;
বারবার চেষ্টা করলো প্রাসাদে ঢুকতে,
প্রত্যেকবারই তাড়া খেলো প্রচন্ড।
ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁটু করে স্বপ্ন দেখে-
তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেলো,
একেবারে সোজা চলে এলো
ধপধপে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে।
প্রতীক
বাদ দিলে এটি সত্যি-সত্যি সমাজতন্ত্রবাদের ওকালতি করা একটি প্রবন্ধ হতে
পারতো। কিন্তু প্রতীকের ব্যঞ্জনা-বলেই রচনাটি কাব্যলোকে প্রবেশপত্র পেয়েছে
এবং এর কাব্যত্ব নিহিত আছে অসহায় মোরগের ঐ অন্তিম পরিণামের প্রতি কবির
অশ্রুক্ষরা করুণার মধ্যে। ‘চিল’ কবিতাটি অর্থ-গৌরবে আরো বলিষ্ঠ। ফুটপাতে
একটি মরা চিলকে দেখে এই কিবাতর জন্ম। গম্বুজশিখরে বাস করতো এই চিল, নিজেকে
জাহির করতো সুতীক্ষ্ম চিৎকারে; হালকা হাওয়ায় ডানা মেলে দিত আকাশের নীলে
অনেককে ছাড়িয়ে; একক-পৃথিবী থেকে অনেক উঁচুতে। সেখান থেকে সে এই পৃথিবীটাকে
দেখেছে, লুন্ঠনের অবাধ উপনিবেশ। কিন্তু যার শ্যেনদৃষ্টিতে ছিল তীব্র লোভ আর
ছোঁ-মারর দস্যু-প্রবৃত্তি সে আজ ফুটপাতে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। অনেক আজ
নিরাপদ-নিরাপদ ইঁদুরছানারা আর খাদ্য-হাতে ত্রস্ত পথচারী; নিরাপদ-কারণ আজ সে
মৃত। আজ আর কেউ নেই ছোঁ-মারার, ওরই ফেলে-দেওয়া উচ্ছিষ্টের মতো ও পড়ে রইলো
ফুটপাতে-শুকনো, শীতল বিকৃত দেহে। গদ্যচ্ছন্দে রচিত এই কবিতাটি; গদ্যবন্ধেই
বসিয়ে দেওয়া হয়েছে কবির কথাগুলো। কিন্তু তবু এর কাব্যত্ব সহৃদয়
ব্যক্তিমাত্রকেই আনন্দিত করবে। এবং বলা বাহুল্য, এটাও প্রতীকাশ্রয়ী বলেই
কবিতা হয়ে উঠেছে। আর এর কাব্য-রসদ সংগৃহীত হয়েছে এযুগের জনস্বপ্নের মধ্য
থেকে। শোষণ আর নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি-কামনাই এযুগের জনচিত্তের সবচেয়ে
বলিষ্ঠ কামনা। সে কামনারই কাব্যরূপ এই কবিতাটি।
৪
কিন্তু সুকান্তর
শ্রেষ্ঠ কবিতা, ‘বোধন’। পৃথিবীতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ যখন অত্যাসন্ন তখন
অস্তাচলশায়ী রবীন্দ্রনাথ ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’র এই নবঘাতন নিষ্ঠুরতার
বিরুদ্ধে তাঁর শেষ শক্তি সংহত করে চরম ধিক্কারবাণী উচ্চারণ করেছিলেন ঃ
মহাকাল-সিংহাসনে
সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,
কণ্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী, শিশুঘাতী-নারীঘাতী
কুৎসিত বীভৎসা ‘পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন.....
বলা
নি®প্রয়োজন, দীপ্তিকাব্যের এটি একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এর কাব্যত্ব
গৌরবোক্তিতে। শিশুঘাতী-নারীঘাতী কুৎসিত বীভৎসার বিরুদ্ধে ধিক্কারবাণীর
ক্ষমাহীন প্রচন্ড শক্তির মধ্যেই এর কাব্যমহিমা। সুকান্তর কবিতাটি কিন্তু
এ-যুগের দীপ্তিকাব্য-প্রধান সাহিত্যে রসোত্তীর্ণ দ্রুতিকাব্যের একটি দুর্লভ
উদাহরণ। ‘বোধন’ রৌদ্ররসাত্মক কবিতা। ক্রোধই তার স্থায়িভাব। কিবগুরু যে
ধিক্কারবাণী উচ্চারণের জন্য মহাকালের বিচারকের কাছে শক্তির প্রার্থনা
জানিয়েছেন, জনগণের সেই ধিক্কারই প্রছন্ড ক্রোধে ফেটে পড়েছে সুকান্তর
কবিতায়। তেরশ পঞ্চাশের পরবর্তী বাংলার পট-ভুমিকায় এই কবিতাটি রচিত। ক্রোধের
বিভাব হলো সমাজ তথা মানবতাবিরোধী শাসক আর শোষকশ্রেণী-মন্বন্তরের
মহাশ্মশানে উপবিষ্ট মজুতদার আর মুনাফাখোরের দল। রৌদ্ররসের ক্রোধকে পরিপুষ্ট
করেছে একদিকে এদরে বিরুদ্ধে ঘৃণা আর বিদ্বেষ, অন্যদিকে জনগণের সঙঘবদ্ধ
প্রতিশোধ-কামনা, সংগ্রামস্পৃহা এবং বীররসের স্থায়িভাব উৎসাহ। ৯৫ পংক্তিতে
রচিত এই কবিতাটিকে আমি এযুগের মহাকাব্য বলতে চাই। অন্তত ১৩৫০ থেকে ১৩৫৪ র
মধ্যে এমন শক্তিশালী অথচ রসোত্তীর্ণ কবিতা যে আর আমার চোখে পড়ে নি, সেকথা
মুক্তকণ্ঠেই স্বীকার করতে হবে। ভাব-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ছন্দ পরিবর্তনের
ফলেও এর মধ্যে মহাকাব্যোচিত মহিমা এসেছে। কবিতাটিকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা
প্রয়োজন। প্রথমেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মহামানবের বোধন কামনা ক’রে কবিতাটির
নান্দী বা প্রোলোগ ঃ
হে মহামানব, একবার এসো ফিরে
শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম-নগরের ভিড়ে,
এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার;
লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।
এই যে আকাশ, দিগন্ত, মাঠ, স্বপ্নে সবুজ মাটি
নীরবে মৃত্যু গড়েছে এখানে ঘাঁটি;
কোথাও নেইকো পার
মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন-ঘন বন্যার
আঘাতে আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল,
এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল,
ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো,
হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।
রৌদ্ররসের
যোগ্য অনুভাব বাংলা কাব্যে দুর্লভ। এ ‘আমি’র মধ্যে আছে বিরাট জনচিত্তের
অপরিসীম শক্তিসম্পন্ন আত্মসম্বিৎ। এর মধ্যে এ-যুগের সর্বস্বান্ত জনগণের
পুঞ্জীভূত ক্রোদ প্রতিস্পন্দিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু কবিতাটির উপসংহৃতি বা
এপিলোগ্টি যেন রৌদ্ররসকে আঘাতে-আঘাতে শতধা খন্ডিত ক’রে দিকে-দিকে ছড়িয়ে
দিয়ে গেছে। শাসক ও শোষকের এই জনঘাতী পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ জনগণের
সঙ্গে এখনো যারা যোগ দিতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন ধিক্কারবাণী
উচ্চারণ ক’রেই কবিকণ্ঠ স্তব্ধ হয়েছে ঃ
তা যদি না হয় মাথার উপরে ভয়ংকর
বিপদ নামুক, ঝড়ে-বন্যায় ভাঙুক ঘর;
তা যদি না হয়, বুঝবো তুমি তো মানুষ নও
গোপনে-গোপনে দেশদ্রোহীর পতাকা বও।
ভারতবর্ষ মাটি দেয়নিকো, দেয়নি পানি,
দেয়নি তোমার মুখেতে অন্ন, বাহুতে বল,
পূর্বপুরুষ অনুপস্থিত রক্তে, তাই
ভারতবর্ষে আজকে তোমার নেইকো ঠাঁই।
নিশ্চয়ই
এটা ভরততবচন নয়, এ যেন ক্রোধোদ্দীপ্ত দুর্বাশার অভিশাপ। কিন্তু এর পেছনে
শুধু অশুভ-তান্ডবই নেই, আছে শিবপ্রতিষ্ঠার শভৈষণা। সেজন্যেই ‘বোধন’ এ-যুগের
শ্রেষ্ঠ প্রেরণা এবং শ্রেষ্ঠ কাব্য। এ-যুগে জনজীবন-চেতনা নিয়ে
কাব্যসাহিত্যে অনকে সৃষ্টিপরীক্ষাই হয়েছে, কিন্তু শত-শত পরীক্ষার পরেও যদি
এমনি একটি সার্থক সৃষ্টিসম্ভব হয় তবে সে পরীক্সার মূল্য অপরিসীম।
সুকান্ত
ভট্টাচার্যের কাব্যসাহিত্যের আলোচনা শেষ হয়ে এসেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে
যে, সবগুলো কবিতা মিলিয়ে সুকান্ত যেন একটি কবিতা লিখতে চেয়েছিল-একটিই তার
বক্তব্য, একটিই তার সুর। এবং তার জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এই প্রতীতিই
হবে যে, তার কাছে বাস্তব আর কল্পনায়, জীবন আর কাব্যে কোন প্রার্থক্য ছিল
না। সুকান্তের জীবনই তার কাব্য, তার কাব্যই তাঁর জীবন। সুকান্তর অকালমৃত্যু
অনুশোচনীয় এই জন্য যে, তার কাব্য-প্রেরণা ও কাব্যশক্তি দিন-দিনই
উত্তরোত্তর উন্নতির পথে এগিয়ে চলেছিল। তার প্রথম দিকের অনেক রচনাতেই দলীয়
শ্লোগান অতি স্পষ্ট ছিল, কিন্তু মনের বালকত্ব উত্তীর্ণ হবার সঙ্গে সঙ্গে
তার আত্মবিশ্বাস আত্মপ্রকাশকে অনন্য পরতন্ত্র করে তুলেছিল। সুকান্তর
কাব্যের উপজীব্য রসও ভাববৈচিত্র্যের অভাবের জন্যে দায়ী সুকান্ত নয়, দায়ী এই
যুগ। যে-চার বছর মাত্র তার কবিজীবন, সেই চার বছরে এবং হয়ত অনাগত আরো অনেক
বছরে, জীবনের এই একটি মাত্র সুরই সত্য। সুকান্ত এই জীবনসত্যকেই কাব্যে
স্পন্দসুন্দর করে রেখে গেছে। তার মৃত্যু যে সহসা আসবে একথা যেন সে আগে
থেকেই অনুভব করতে পেরেছিল। তার নিজের জীবনের এই ট্রাজিক পরিণামর ছবিটি সে
‘সহসা’ কবিতায় অঙ্কিত করে গেছে;
আমার গোপন সূর্য হলো অস্তগামী
এ-পারে মর্মর ধ্বনি শুনি,
নিস্পন্দ শবের রাজ্যে হতে
ক্লান্ত চোখে তাকালো শকুনি।
গোধূলি-আকাশ বলে দিলো,-
তোমার মরণ অতি কাছে,
তোমার বিশাল পৃথিবীতে
এখনো বসন্ত বেঁচে আছে।
এ
বিশাল পৃথিবীতে বসন্ত এখনো বেঁচে আছে। চিরকালই থাকবে। কিন্তু কবিকিশোরের
জীবনে বসন্ত আর কোনো দিনই এলো না। অনাগত বসন্তের প্রতীক্ষায় ব’সে থাকার সময়
আর সুযোগও তার হলো না। নবজাতকের কাছে সে যে-অঙ্গীকার করেছিল, অনাগত বসন্ত
দিনের এ-বিশ্বসে নবজাত শিশুর বাসযোগ্য করে যাবার জন্যে দুহাত দিয়ে প্রাণপণে
এ-পৃথিবীর জঞ্জাল সরাবে, সুকান্ত আমরণ সেই প্রতিশ্রুতিই পালন ক’রে গেছে।
‘জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংস্তূপ’ পিঠে নিয়েই সে দুনিয়া থেকে
বিদায় নিয়ে গেল। তার দেহের রক্ত দিয়েই সে নতুন শিশুকে আশীর্বাদ করে গেল।
