মাটির সন্তান

মাইনুল তোহা ।।
খুরশীদ শিয়রে বসলো। তহুরা গভীর ঘুমে মগ্ন। হাড়-ভাঙা খাটুনিতে শরীর নিস্তেজ, অসার। মাথা ঝিমঝিম করে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। সন্ধ্যার দিকে বমি করেছে, প্রায়ই এমনটা ঘটে, না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। খুরশীদ তহুরার গায়ে আলতো করে হাত রাখলো। ভোর হতে অনেক দেরি। মেয়ে জেগে উঠলে বাকিটা সময় আতঙ্কে কাটাবে। গ্রাম-গঞ্জে ভূত-প্রেতের গল্প খুব জনপ্রিয়। উৎস না জানলেও চালিয়ে নেয় এক গ্রামের মানুষজন তার পাশের গ্রামের নামে।
ছেলেকে কোলে নিলো খুব সাবধানে। মুখের দিকে তাকাতে লজ্জা পায়। কতোটুকুইবা বয়স। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। পড়াশোনায় খুব মনোযোগ, এবার প্রথম হয়েছে। প্রতি বিকেলে মাঠে যায় খেলতে, একটা বল কিনে দেওয়ার আবদার করেছিল।
‘যারা খেলাধুলা করে, তাদের লেখাপড়া হয় না। ভালো ছেলেদের এসব করতে নেই।’ Ñ এই বলে শান্ত করেছে, যদিও কথাটা খুরশীদের নিজের মনই সায় দেয়নি।
কৃষিকাজে এখন আর পোষায় না। দিন-দিন সার-কীটনাশকের দাম বাড়ছে। প্রতি বছর নতুন বীজ কিনতে হয়। সবসময় যে ভালো মানের পাওয়া যায়, এমন নয়। আগে পাকা ধান শুকিয়ে সংগ্রহ করতো, পরেরবার বপন করবে। এখন আর সেÑসুযোগ নেই। বাজার থেকে সবচেয়ে ভালো মানের বীজ কিনে আনলেও ফলন আশানুরূপ হয় না, ভেজালে ভরা। জমির আকার ছোটো, লাঙলের ফলা ঠিকমতো ঘুরে না। ওয়ারিশদের কেউ কাউকে ছাড়দিতে নারাজ। মাটিও কৃপণ হয়ে গেছে।
খুরশীদ এক লোকের থেকে টাকা নিয়েছে দেড়গুণ ফেরত দেওয়ার শর্তে। ব্যাংকে গিয়েছিল। তারা নাকি এতো অল্প পরিমাণ পাশ করে না। এÑবিষয়ে খুরশীদের অভিজ্ঞতা শোচনীয়। ঋণ নিতে জামানত লাগে। কাগজপত্র হাতে দৌড়-ঝাঁপ, ম্যানেজারকে ঘুষ দেওয়া, আরও কতো চা-নাস্তার বিল। লেখাপড়া করেনি, জানাশোনা একজনকে সাথে নেওয়া, তার পেছনে খরচ Ñ খুরশীদের এতো ঝামেলা সইবে না।
গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার দরুণ পাশের দেশ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। এদিকে ধান চাষে বারবার লোকসান গুনতে হচ্ছে। শীতকালীন ফসলও আশানুরূপ হয় না। অনেকেই পেশা বদলেছে। কৃষকদের সামাজিক মর্যাদা নেই বললেই চলে। পেটের ভাত জোগাড় করা দায়। টান উপেক্ষা করতে পারেনি খুরশীদ, মাটি কামড়ে পড়ে আছে এখনও।
পেঁয়াজের দাম আকাশ ছোঁয়া, তার ওপর হুমকি-ধামকি, স্বজাতির অপমান। সিদ্ধান্ত নিলো নিজে আবাদ করবে, ন্যায্যমূল্যে সবার হাতে তুলে দেবে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, সাথে আশেপাশের জমিগুলো বর্গা চষে।
ফলন ভালোই হয়েছিল। আশায় বুক বাঁধে। মেয়ে বড় হচ্ছে Ñ পড়াশোনা, বিয়ে-শাদীর খরচ, গহনা-গাটি, স্ত্রীর জন্য নতুন কাপড়, ছেলের স্কুল ড্রেস Ñ সব হবে এবার।
ফসল তোলার মুহূর্তে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। দু’দেশ পরস্পরকে আলিঙ্গন করে। আমদানি বাড়ায়। সম্প্রীতি রক্ষা করতে হবে, বন্ধুর সাথে মন কষা-কষি হতেই পারে।
দেশি পেঁয়াজ আকারে ছোটো, চাহিদা কম। বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়, পঁচন ধরে। এদিকে ব্যাংক-সুদ বেড়েই চলছে। খুরশীদ গরু নিয়ে সামনে, মাঝখানে ছেলে, পেছনে স্ত্রী। চাঁদের আলোয় চারদিক ঝলমল করছে, জমিগুলো দেখতে ঢেউ খেলানো নদীর মতো। ট্রাক্টরের ফলায় চষা, প্রখর রোদে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। খাল-বিলে পানি নেই, উজানে বাঁধ, বর্ষা মৌসুমে খুলবে। তখন বাড়ি-ঘর, জায়গা-জমি সব তলিয়ে যাবে।
গ্রামের অনেকে কৃষি অফিস থেকে বীজ, ওষুধ, সার পেয়েছে। খুরশীদের নাম পাঠানো হয়েছিল, ইউপি মেম্বার সেÑকথা জানায়। কিন্তু কীভাবে যে বাদ পড়ে গেলো?
একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে, যারা অনুদান পেয়েছে, সবাই মেম্বারের পরিচিত। একই দলের রাজনীতি করে, অথবা আত্মীয়-স্বজন। বিষয়টা নজরে আসে মেম্বারের বড় ভাইয়ের নাম দেখে, কৃষিকাজ করে না। যা পায়,বিক্রি করে পাইকারী দরে।
এখানকার ডিলার বড় হারামি। প্রতি কেজিতে চার-পাঁচ টাকা বাড়িয়ে রাখে। অভিযোগ করলে বলে,‘সাপ্লাই কম, নিলে নেন, না নিলে রাস্তা মাপেন।’
খুরশীদ জোয়ালের একপ্রান্ত কাঁধে তুলে নিলো। স্ত্রী হাল ধরেছে, ছেলে ঘাস কুড়িয়ে ঝুড়িতে রাখবে। তাদের প্রতি মমত্ব নেই, এমন নয়। জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে পড়া সৈনিক, দারিদ্র্যের কশাঘাতে জরা-জীর্ণ।
দু’মুঠো খাবার আশায় সংগ্রামরত। আজ তিনদিন ধরে এÑকাজ করছে। মনে লোক-লজ্জার ভয়, গরিবের এইতো সম্বল, চাইলেও টাকা দিয়ে কিনতে পারবে না। সূর্য উঠার আগে স্ত্রী-সন্তানকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। ছেলে মক্তবে যায়, তাকে পরিষ্কার করার দায়িত্ব মেয়ের ওপর। বোন আজকাল মায়ের জায়গা নিতে শুরু করেছে।
চারাগুলো বড় হতে শুরু করেছে। আগে এÑসময় অন্য কাজ করতো, মাটি কাটা কিংবা গাছ বাছাইয়ের।
খুরশীদ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমির আইলে বসে থাকে, সোনার ফসল রক্ষা করতে মরিয়া। প্রচণ্ড গরম, সারা শরীর ঘামে চপচপে। প্রায়ই জ¦র চলে আসে।
পশু-পাখি হানা দেয়। একসময় আবাদি জমিগুলো ছিলো লোকালয় থেকে দূরে, আলাদা স্থানে। এখন যত্র-তত্র বাড়ি-ঘর নির্মাণ করে রেখেছে। গৃহস্থলির আবর্জনা ফেলে। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল ঢুকে। আইলের ধারে গাছ-পালা, ছায়াযুক্ত স্থানে কিছুই জন্মায় না।
খুরশীদ একদিন লক্ষ করলো চারাগুলো হলুদ হয়ে যাচ্ছে, মাটি কালচে, তৈলাক্ত। খাল থেকে সেচ দিয়েছিল। পাশের এলাকায় রঙের কারখানা, রাসায়নিক বর্জ্য পানিতে ফেলে। সব জমির একই হাল।
খুরশীদের মন ভালো নেই। খেতে বসে আফসোস করলো। পাশের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান, প্রচুর খাবার নষ্ট করেছে, ফেরার সময় দেখে নালায় ফেলছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ‘সামান্য কিছু কাগজের জন্য সোনার ফসল এদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম!’
‘আরেক চামচ দেই?’ তহুরা জিজ্ঞেস করে।
খুরশীদ নিশ্চুপ। সারাদিন পরিশ্রম করেছে। পেটে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। অভাবের সংসার, এতো ক্ষুধা ভালো না। খালি প্লেটে আঙুল ঘষতে ঘষতে, ‘ওরা খেয়েছে?’
‘হুম।’
‘তুমি?’
‘আপনি খান, আমার খিদে নেই।’
খুরশীদ হাড়ির দিকে লক্ষ করে, ভাত তলানিতে।
ধান পাকতে শুরু করেছে, এখন আরও সতর্ক থাকতে হবে। রাস্তার পাশে জমি, কখন মন্ত্রী-আমলারা ঢুকে পড়ে,
সাথে উৎসুক জনতা, সাংবাদিক, মিডিয়াকর্মী। কাস্তে হাতে নানা ঢঙে ছবি তুলে অনেক ধান নষ্ট
করেছে গতবছর। এবার আর তা হতে দেওয়া যাবে না, বাঁশ হাতে পাহারায় থাকে।
‘বইয়ে লেখা আছে নবান্ন উৎসবের কথা। ঘরে ঘরে আনন্দ, কৃষকের মুখে হাসি। কিন্তু বাবা হাসে না
কেন?’ Ñ মেয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্নটা করলো।
পথে হকান খাঁর সাথে দেখা। লোকটাকে আড়ালে সবাই গাল-মন্দ করে, বাঁকা চোখে তাকায়। জুমা’বারে আলোচনা হয় তাকে নিয়ে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই, উল্টো মানুষকে বুঝায়, ‘তোমরা মিয়ারা ঠেকায় পইড়া আমার কাছে আসো, সারাইয়া দেই। লাভ তোমরা করো, সেখান থেকে একটু-আধটু আমারে দেও, আবার আমারই বদনাম করো। এলাকায় এতো ধার্মিক মানুষ, এতো এতো টাকা। বড়ো বড়ো কথা কওয়োনের বেলায় ওস্তাদ। কয় আমি নাকি সুদখোর, ইমান নাই। কই ইমানদারদের কেউতো দুই পয়সা দিয়া সাহায্য করলো না?
হেই আমি বেইমানের কাছেই আওয়ন লাগবো কেন?’ পানের পিক ফেলে, ‘বাজার থেকে আসার সময় দেখলাম, এবার ধান ভালোই হইছে। কাইট্যা বিক্রি কইরা ফেলো। টাকাটা তাড়াতাড়ি দিয়া দিও। কয়েকজন বায়না ধরছে, দেওন লাগবো। শীতকালীন শাক-সবজি করবো, সরিষা বাইন্যাইবো। তোমার লাগলে পরে কইও।
কতো দিতে হইবো, মনে আছে তো?’
খুরশীদ মাথা নিচু করে, ‘হুম।’
খুরশীদ চেয়েছিল, আরও কিছুদিন পর ধান তুলবে। এখন লোক পাওয়া যাবে না, একা কাটা সম্ভব নয়। আড়তে দাম কম। তেতাল্লিশ কেজিতে মন ধরে, এভাবেই চলে আসছে। ন্যায্যমূল্যে ধান কিনতে সরকার থেকে লোক আসবে মৌসুমের শেষদিকে। বিক্রি না হলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তারপরও রাখা যেতো কিন্তু মনে সন্দেহ, কৃষি কার্ডের মতো সে বাদ পড়ে যাবে নাতো?
হিসেবের খাতা শুন্য, ফলাফল আগে থেকে-ই জানা। খুরশীদ এÑমাটির সন্তান, স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। বছর ঘুরতেই ভুলে যাবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের গল্প। মাঝরাতে ঘুম ভাঙবে, লাঙল কাঁধে বেড়িয়ে পড়বে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে।
লেখক: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, চাঁদপুর সাহিত্য পরিষদ।
সাধারণ সদস্য, সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় বামপন্থী রাজনীতি ও মার্কসবাদী দর্শনের প্রভাব

মাসুমুর রহমান মাসুদ ।।
১.
বাংলা সাহিত্যে সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) এক অনন্য প্রতিভার নাম। অতিঅল্প বয়সে সাহিত্যজগতে আবির্ভূত হয়েতিনি এমন এক কাব্যভাষার সৃষ্টিকরেছিলেন, যার কেন্দ্রে ছিল ক্ষুধার্ত, নিপীড়িত, শ্রমজীবী ও বঞ্চিত মানুষেরজীবন। তাঁর কবিতায় কল্পনার সৌন্দর্যের চেয়ে বাস্তব জীবনের দুঃখ, শোষণ, বৈষম্য ওসংগ্রাম অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই জীবনদৃষ্টির পেছনে মার্কসবাদীদর্শনের গভীর প্রভাব ছিল। তাঁর পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য এবং মা সুনীতি দেবীরছিল নিম্নবিত্ত পরিবার। মাতুলালয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করে। তার পৈতৃক নিবাসছিল বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অন্তর্গত ঊনশিয়াগ্রামে। বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায়অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন সুকান্ত। এই সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থীরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। ১৯৪৪সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৪৩-এরদুর্ভিক্ষ, ফ্যাসিবাদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁরকবিতায় তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠ উচ্চকিত হয়।
২.
মার্কসবাদ মূলত সমাজকে শ্রেণিবিভক্ত বাস্তবতার আলোকে বিচার করে এবংউৎপাদনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ ও শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাজেরপরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করে। সুকান্ত কোনো তাত্ত্বিক মার্কসবাদী গ্রন্থ রচনাকরেননি। মার্কসবাদ উনিশ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও দার্শনিক মতবাদ। এর মূল ভিত্তি হলো সমাজে শ্রেণিবৈষম্য, শোষণও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিশ্লেষণ এবং একটি শ্রেণিহীন, শোষণমুক্ত সমাজপ্রতিষ্ঠার আকাঙক্ষা। এর প্রধান প্রবক্তা ছিলেন কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) এবংফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (১৮২০-১৮৯৫)। তাই একে শুধু মার্কসের আবিষ্কার না বলেমার্কস ও এঙ্গেলসের যৌথভাবে বিকশিত মতবাদ বলা অধিকতর যৌক্তিক। উনিশশতকের ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের ফলে কারখানা ও পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার দ্রুতপ্রসার ঘটে। এর ফলে একদিকে পুঁজিপতি শ্রেণির সম্পদ বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকেশ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম মজুরি ও অমানবিক জীবনযাত্রার সমস্যা প্রকট হয়েওঠে। এই সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মার্কস ও এঙ্গেলসের চিন্তাকেগভীরভাবে প্রভাবিত করে। মার্কস ইতিহাস ও সমাজকে শ্রেণিসংগ্রামেরদৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে- উৎপাদনের উপায় যার নিয়ন্ত্রণে, সমাজে তারঅর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাও বেশি থাকে। পুঁজিবাদী সমাজে মূল দ্বন্দ্বহলো পুঁজিপতি বা বুর্জোয়া ও শ্রমিক বা প্রলেতারিয়েত শ্রেণির মধ্যে।
শ্রমিকের শ্রম থেকে সৃষ্ট অতিরিক্ত মূল্য পুঁজিপতি আত্মসাৎ করে- মার্কসএটিকে উদ্বৃত্ত মূল্য এর ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যাকরেন।
৩.
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বিষয়, চরিত্র, বক্তব্য ও জীবনদর্শনে মার্কসবাদীচেতনার বাস্তব প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। তাঁর কবিতায় মানুষকে শুধু ব্যক্তিমানুষহিসেবে নয়, বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবেও দেখাহয়েছে। ফলে তাঁর কাব্য হয়ে উঠেছে গণমানুষের জীবনসংগ্রামের দলিল। সাধারণমানুষের জীবনসংগ্রাম, যন্ত্রণা ও বিক্ষোভ তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় এবং তাঁররচনায় শোষণহীন নতুন সমাজের আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। সুকান্তের কবিতায়মার্কসবাদী দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিষয়চিত্রণের মধ্য দিয়ে। মার্কসবাদী দৃষ্টিতে মানুষের বস্তুগত জীবন তার চিন্তা ওচেতনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সুকান্ত এই সত্যকে অত্যন্ত শক্তিশালী কাব্যিকপ্রতীকে রূপ দিয়েছেন ‘হে মহাজীবন’ কবিতায়। তিনি লিখেছেন:
“প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা-/
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,/
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:/
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্ধসঢ়;সানো রুটি।”
এখানে ‘পূর্ণিমার চাঁদ’ প্রচলিত কাব্যিক সৌন্দর্যের প্রতীক, আর‘ঝলসানো রুটি’ ক্ষুধার্ত মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের প্রতীক। ক্ষুধার্তমানুষের কাছে সৌন্দর্য, রোমান্টিকতা কিংবা কাব্যিক কল্পনার চেয়ে অন্নেরপ্রয়োজনই প্রধান। অর্থাৎ মানুষের জীবনকে তার বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থারবাইরে গিয়ে বোঝা যায় না। এই উপলব্ধি সুকান্তের কবিতাকে নিছক দরিদ্রমানুষের প্রতি সহানুভূতির কবিতা না রেখে সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতারকবিতায় পরিণত করেছে। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই সুকান্তের কবিতার একটিগুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তিনি সৌন্দর্যকে অস্বীকার করেননি। প্রশ্ন তুলেছেন- যেসমাজে মানুষ অনাহারে থাকে, সেখানে নিছক সৌন্দর্যচর্চার মূল্য কতটুকু ?
তাই ‘হে মহাজীবন’-এ তিনি কবিতাকে কোমলতার আবরণ থেকে বের করে কঠিনবাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন:
“হে-মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়/
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,/পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক/গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!”/
‘কড়া হাতুড়ি’ এখানে শুধু ভাষার কঠোরতার প্রতীক নয়। এটি পরিবর্তনের শক্তিরওপ্রতীক। কবিতা যেন বাস্তব জীবনের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আঘাত হানারহাতিয়ার হয়ে ওঠে। এই জায়গাতেই সুকান্তের কবিতা মার্কসবাদী শিল্পচেতনার
সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এভাড়া শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা সুকান্তেরমার্কসবাদী জীবনদর্শনের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত সাহিত্যে যেশ্রমজীবী মানুষ অনেক সময় পটভূমির চরিত্র হয়ে থাকে, সুকান্ত তাকে কবিতারকেন্দ্রস্থলে নিয়ে এসেছেন।
৪.
‘রানার’ কবিতায় একজন সাধারণ ডাকবাহক বা রানারের জীবনকে কেন্দ্র করেতিনি শ্রমজীবী মানুষের অব্যক্ত দুঃখ ও শোষণের ছবি এঁকেছেন। তিনি লিখেছেন:
“ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে/জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।”/
এই দুটি চরণে শ্রমের মূল্য ও শ্রমিকের জীবনযন্ত্রণার বৈপরীত্য অত্যন্ত স্পষ্ট। শ্রমজীবীমানুষ তার শ্রম দিয়ে সমাজকে সচল রাখে, অথচ তার নিজের জীবনে থাকে অভাব।‘পিঠেতে টাকার বোঁঝা’ থাকলেও সে ওই টাকার মালিক নয়। এইবৈপরীত্যের মধ্যদিয়ে কবি শ্রম ও সম্পদের অসম বণ্টনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ফলে ‘রানার’ কেবলএকজন ডাকবাহকের গল্প নয়। এটি শ্রমজীবী মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বেরপ্রতীকী চিত্র। ডাকবাহক সমস্ত শ্রমজীবীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। সুকান্তেরকবিতায় শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্বও সুস্পষ্ট। ‘শত্রু এক’ কবিতায় তিনিলিখেছেন:
“এদেশ বিপন্ন আজ জানি আজ নিরন্ন জীবন/মৃত্যুর প্রত্যহ সঙ্গী নিয়ত শত্রুর আক্রমণ/.../তবুও সুদৃঢ় আমি, আমি এক ক্ষুধিত মজুর।”/
এখানে ‘ক্ষুধিত মজুর’ কেবল একজন ব্যক্তির পরিচয় নয়। সে সমস্ত শোষিত শ্রেণিরপ্রতীক। তার ক্ষুধা ব্যক্তিগত হলেও তার সংগ্রাম সামাজিক এবং বৃহদ গোষ্ঠীর।সুকান্তের কবিতার এই চরিত্রগুলো পরাজিত হয়ে নীরবে কষ্ট সহ্য করে না, নিজেদের
অধিকার ও মর্যাদার জন্য সংগ্রামের সম্ভাবনা ধারণ করে। শ্রমিকশ্রেণির ঐক্য ওসংগ্রামের বিষয়টি আরও প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ পেয়েছে ‘মজুরদের ঝড়’ কবিতায়।কবিতাটিতে ধর্মঘটকে তিনি ক্ষুধার চূড়ান্ত প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন এবংশেষদিকে বলেছেন:
“ঝড় আসছে- সেই ঝড়:/যে ঝড় পৃথিবীর বুক থেকে জঞ্জালদের টেনে তুলবে।/আর হুঁশিয়ার মজুর:/সে ঝড় প্রায় মুখোমুখি।”/
এখানে ‘ঝড়’ প্রতীক হয়ে উঠেছে সংগঠিত শ্রমিকশক্তির। মার্কসবাদী দর্শনেশ্রমিকশ্রেণির ঐক্য ও সংগ্রাম সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শক্তি।সুকান্ত এই ধারণাকে তাত্ত্বিক ভাষায় নয়, কাব্যিক প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ
করেছেন। তাঁর কবিতায় মজুর তাই করুণার পাত্র শুধু নয়, অধিকন্তু সে পরিবর্তনেরসক্রিয় শক্তি। সুকান্তের মার্কসবাদী চেতনার সঙ্গে কৃষকজীবনের সম্পর্কও গভীর।বাংলার কৃষক ছিল ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় বহুমাত্রিক শোষণেরশিকার। সুকান্ত তাঁর কাব্যে কৃষক ও ফসলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর‘ফসলের ডাক’, ‘কৃষকের গান’ এবং ‘এই নবান্নে’ প্রভৃতি কবিতায়কৃষিজীবনের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের সম্পর্ক প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কবিতার
জগতে অন্ন কেবল খাদ্য নয়; অন্ন উৎপাদনকারী কৃষকের শ্রম, অধিকার ও মর্যাদারপ্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত। ‘হে মহাজীবন’-এর ক্ষুধার্ত মানুষ এবং ‘কৃষকের গান’-এর শ্রমজীবী মানুষ একই সামাজিক বাস্তবতার দুই দিক।
৫.
১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ সুকান্তের কাব্যচেতনায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। দুর্ভিক্ষ তাঁরকাছে নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না। এর পেছনে ছিল মানুষের তৈরিঅর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা, মুনাফা, মজুতদারি এবং বৈষম্য। তাঁরসম্পাদিত ‘আকাল’ সংকলনও দুর্ভিক্ষের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিতহয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁরসাহিত্যিক অবস্থান ছিল একেবারেই স্পষ্ট। ‘অনুভব’ কবিতায় তিনি সমকালীনদেশের বাস্তবতার প্রতি বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন:
“অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন/অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন;/অবাক পৃথিবী! অবাক করলে আরো-/দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো।”/
এখানে রাজনৈতিক পরাধীনতা এবং অর্থনৈতিক অনাহার একই বাস্তবতার মধ্যেএসে মিলেছে। মার্কসবাদী দৃষ্টিতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিকমুক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। সুকান্তও তাই শুধু বিদেশি শাসনেরবিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেননি; দেশের অভ্যন্তরের শ্রেণিবৈষম্য ও অনাহারের বিরুদ্ধেওপ্রশ্ন তুলেছেন। এর জন্য যারা দায়ি তাদের প্রতি তিনি বিষোদ্গার করেছেন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনাও তাঁর মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদ পৃথিবীর মানুষের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের জন্যভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছিল। সুকান্ত তাঁর সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকেবিচ্ছিন্ন থাকেননি। ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁরসম্পৃক্ততা এবং ‘আকাল’ সম্পাদনা তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।
তবে সুকান্তের মার্কসবাদ নিছক রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরকবিতার গভীরে রয়েছে মানবমুক্তির আকাক্সক্ষা। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় তিনি ভবিষ্যৎপৃথিবীর জন্য নিজের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন:
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”/
এই ‘বাসযোগ্য পৃথিবী’ আসলে এমন এক সমাজের স্বপ্ন, যেখানে নতুনপ্রজন্ম শোষণ, ক্ষুধা ও বৈষম্যের উত্তরাধিকার বহন করবে না। সুকান্তের দৃষ্টিতেবিপ্লব বা সামাজিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কেবল পুরোনো ব্যবস্থাকেধ্বংস করা নয়; তার উদ্দেশ্য একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও শোষণমুক্ত পৃথিবীনির্মাণ। তাই ‘নবজাতক’ তাঁর কবিতায় ভবিষ্যৎ সমাজের প্রতীক হয়ে ওঠে। এইভবিষ্যৎমুখী চেতনা তাঁর ‘রানার’ কবিতাতেও দেখা যায়। দীর্ঘ অন্ধকারের শেষেনতুন দিনের প্রত্যাশায় তিনি লিখেছেন:
“আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?/রানার! গ্রামের রানার!/সময় হয়েছে নতুন খবর আনার।”/
কবিতাটিতে ‘আলো’ কেবল দিনের আলো নয়, এটি নতুন সমাজ ও নতুনজীবনের প্রতীক। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার এই প্রত্যয় সুকান্তেরকবিতাকে হতাশার কবিতা হতে দেয়নি। তাঁর কবিতায় দুঃখ আছে, ক্ষুধা আছে,
শোষণ আছে এবং এসবের পাশাপাশি আছে প্রতিরোধ, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতেরপ্রতি অটুট বিশ্বাস।
৬.
সুকান্তের ভাষা ও শিল্পরীতিতেও মার্কসবাদী প্রভাব লক্ষ করা যায়। তিনি অভিজাত,দুর্বোধ্য বা কৃত্রিম কাব্যভাষার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের পরিচিত শব্দ, দৈনন্দিনজীবনের উপকরণ ও শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতাকে কবিতার উপাদান হিসেবে গ্রহণকরেছেন। রুটি, ভাত, মজুর, রানার, কৃষক, ধর্মঘট, দেশলাই কাঠি, সিগারেট-এসব সাধারণ বস্তু তাঁর কবিতায় অসাধারণ তাৎপর্য লাভ করেছে উপস্থাপন ভঙ্গিরনিপুনতায়। কবিতা তাঁর কাছে শুধুমাত্র সৌন্দর্যসৃষ্টি নয়, কবিতা হয়ে উঠেছে
সমাজবাস্তবতার সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের অনবদ্য মাধ্যম। তবেসুকান্তকে কেবল ‘মার্কসবাদী কবি’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। তাঁরমার্কসবাদী চেতনার ভিতরে ছিল গভীর মানবতাবোধ। ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতিতাঁর মমতা, শ্রমিক-কৃষকের প্রতি শ্রদ্ধা, শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবংশোষণমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন- সবকিছু মিলিয়ে তাঁর কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেমানুষ ও মানবিকতা। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস তাঁর মানবিকতাকে সংকুচিতনা করে সামাজিক বৈষম্যের কারণ অনুসন্ধান করে মানবমুক্তির প্রশ্নকে আরও গভীরকরেছে।
পরিশেষে বলা যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় মার্কসবাদ কোনো বাহ্যিকমতাদর্শ হিসেবে আরোপিত হয়নি। তাঁর জীবনবোধ, সমাজদৃষ্টি ও কাব্যচেতনারসঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ, শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের
বঞ্চনা, দুর্ভিক্ষের হাহাকার, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, শোষিত মানুষেরসংগ্রাম এবং একটি নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন—- সবের মধ্য দিয়ে তাঁর কবিতায়মার্কসবাদী দর্শন প্রাণ পেয়েছে।
লেখক:সহকারী অধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিক।