অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যে ‘কল্লোল’-এর দান। আর কল্লোলেই সাহিত্যে আধুনিকতার যাত্রারম্ভ। শুধু যাত্রারম্ভই নয়, সাহিত্যেসৃষ্টির সে এক মহালগ্ন! বস্তত, বঙ্গীয় চতুর্দশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মারণীয় হয়ে থাকবে। রবীন্দ্রনাথের নোবেল-পুরুস্কার-প্রাপ্তির পর এই দশটি বৎসরের মধ্যে সাহিত্য ঐশ্বর্যে ও প্রাচুর্যে যেন দশগুণ হয়ে উঠল। কবি স্বয়ং তো পুনর্যৌবন লাভ করলেনই, উপরন্তু তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন শরৎচন্দ্র। চার-পাঁচ বৎসরের মধ্যে তাঁর নব-নব দানে কথাসাহিত্য নতুন ভাস্বরতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। ওদিকে ‘সবুজপত্র’র পৃষ্ঠায় বীরবলীয় বুদ্ধিবাদ মোহমুক্তির মন্ত্র উচ্চারণ করছে। জীবনের রঙ্গ মঞ্চেও চলছে দ্রুত পটপরিবর্তন। সাগরপারের মহাকুরুক্ষেত্রের তাণ্ডব শান্ত হতে-না-হতেই ভারতের বুকে আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে অচলায়তনের ভিত্তি নড়ে উঠেছে। আশা ও নৈরাশ্যে, সাফল্যে ও ব্যর্থতায় প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণচঞ্চল। একদিকে দুঃখে-দারিদ্র্যে-লাঞ্ছনায়-অপমানে জীবন পর্যুদন্ত, অন্যদিকে সর্বদুঃখবিজয়ের অপরাজেয় প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে নব-জীবনের অভিসার। ভাঙন-গড়নে বিপুল উত্তেজনায় অশান্ত দিনগুলি। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানবের সঙ্গে বাঙালীর আত্মীয়তা গড়ে দিলেন। মহাযুদ্ধ আমাদের যুক্ত করল বিশ্বজীবনের সঙ্গে। এই মহাজীবনের মোহনায় দাঁড়িয়ে তৃতীয় দশকের শেষবৈশাখে ‘কল্লোল’-এর কলধ্বনি শোনা গেল বাংলা সাহিত্যের আঙিনায়। শুধু কলধ্বনিই নয়, ‘উদ্ধত যৌবনের ফেনিল উদ্দামতা, সমস্ত বাধাবন্ধনের বিরুদ্ধে নির্বারিত বিদ্রোহ, স্থবির সমাজের পচা ভিত্তিকে উৎখাত করার আলোড়ন’ এল সাহিত্যে।
বেপরোয়া বিপ্লবী যৌবন নবজীবনের সন্ধানে নতুন পথে যাত্রা শুরু করল। দুঃসাহসী পথিকতের দল স্পর্ধাভরে বললেন, ‘না-মানা যুগের মোরা মানুষ, / বেসাতি মোদের কালি-কলূষ, / চোখে জলিতেছে তাজা জলুস-/ কিছু না পাওয়া নেশা।’
স্বভাবতই এই ‘কালি-কলুষে’র বেসাতি অভিনন্দনের মালাচন্দন বহন করে আনল না। দুর্নীতিপরায়ণতার তীব্র অভিযোগ উঠল এর বিরুদ্ধে। এমন কি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ‘সাহিত্যের নবত্ব’ প্রবন্ধে এ যুগের অপটু রচনার বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ উত্থাপন করলেন। ওর মধ্যে একটা হচ্ছে ‘দারিদ্র্যের আস্ফালন’, আরেকটা ‘লালসার অসংযম’। এ অভিযোগ নিতান্তই অমূলক ছিল, এ কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। যে জল-স্রোত দুকুলপ্লাবী উচ্ছৃাসে কল্লোলিত হয়ে ওঠে তার মধ্যে পঙ্কিল আবিলতা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রাথমিক উচ্ছৃাস কেটে যাবার পর তা যে-পলিমাটির আস্তরণ বিছিয়ে দেয় তাই নতুন ফসল-সৃষ্টির উর্বরতম ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ‘কল্লোল’-যুগের সব রচনাই অপটু হাতের ছিল না। এঁদের মধ্যে শক্তিধরও ছিলেন অনেকেই। তা ছাড়া এঁরা শুধু প্রলয়ের উল্লাসেই উন্মত্ত ছিলেন না, প্রতিসৃষ্টির প্রাণদ স্বপ্নও এঁদের মনকে অধিকার করে ছিল। ভাঙনের গানই শুধু এঁরা গান নি, নতুন আদর্শবাদের সন্ধানও এঁরা করেছেন। বেদরদী বিমুখতা দিয়ে নয়, সপ্রেম সহানুভুতি দিয়ে এ-যুগের শিল্পিমনকে বুঝতে হলে অচিন্ত্যকুমারের ভাষাতেই বলতে হয়: ‘কল্লোল যুগে এ দুটোই প্রধান সুর ছিল; এক, প্রবল বিরুদ্ধবাদ; দুই, বিহ্বল ভাববিলাস।
একদিকে অনিয়মাধীন উদ্দামতা, অন্যদিকে সর্বব্যাপী নিরর্থকতার কাব্য। একদিকে সংগ্রামের মহিমা, অন্যদিকে ব্যর্থতার মাধুরী। আদর্শবাদী যুবক প্রতিকুল জীবনের প্রতিঘাতে নির্ধারিত হচ্ছে-এই যন্ত্রণাটা সে যুগের যন্ত্রণা শুধু বন্ধ দরজায় মাথা খুঁড়ছে, কোথাও আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে না, কিংবা যে জায়গা পাচ্ছে তা তার আত্মার আনুপাতিক নয়-এই অসন্তোষে এই অপূর্ণতায় সে ছিন্নভিন্ন। বাইরে যেখানে বা বাধা নেই, সেখানে বাধা তার মনে, তার স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের অবনিবনায়। তাই একদিকে যেমন তার বিপ্লবের অস্থিরতা অন্যদিকে তেমনি বিফলতার অবসাদ।’ আর বিফলতাই যে সাফল্যের স্তম্ভ, ‘কল্লোলে’র উত্তরকালেই আছে তার পূর্ণ স্বীকৃতি।
অচিন্তকুমার কল্লোলগোষ্ঠীর প্রতিনিধিস্থানীয় প্রতিভাবান লেখকদের অন্যতম। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বেদে’ যখন রচিত হয় তখনও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরগ্লাতক। কিন্তু এই উপন্যাসখানি তার বক্তব্য ও বাচনিকতার অভিনবত্বে প্রকাশের সঙ্গে-সঙ্গেই বিশেষ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। এমন কি, রবীন্দ্রনাথও পত্রপ্রবন্ধে লেখকের ‘কল্পনার প্রশস্ত ক্ষেত্র ও অজস্র বৈচিত্র্য’ দেখে তাঁর প্রতিভা, তাঁর শক্তির বিশিষ্টতা প্রশংসাস্নিগ্ধ কণ্ঠেই স্বীকার করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য লেখকের রচনায় ‘মিথুন প্রবৃত্তি’র অত্যন্ত পৌনঃপুন্য দেখে কবিগুরুক্ষুন্নও না হয়ে পারেন নি। কিন্তু এ পৌনঃপুন্য একলা অচিন্ত্যকুমারেরই নয়, সে যুগেরই বিশিষ্ট লক্ষণ ছিল। আগুন-নিয়ে-খেলার দুঃসাহসিকতা ছিল সে যুগের রক্তে। তা ছাড়া বিংশ শতাব্দীর হাতে মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের এও যে এক নতুন অভিজ্ঞান! অবশ্য ‘বেদে’ রচনার পর দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। পরে লেখক কবিতা-গল্প-উপন্যাসে অনেক পথ অতিক্রম করে এসেছেন। ‘কল্লোলে’র স্বপ্ন নবসৃষ্টিতে সার্থক হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার বন্ধুর পথ পেরিয়ে এসেছে নতুন যুগ, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন জীবনবোধ। যুগপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কল্লোলগোষ্ঠীর অনেকের লেখনীই মন্থর হয়েছে। কিন্তু চলিষ্ণুমনা অচিন্ত্যকুমারের সৃষ্টিতে আছে অকৃপণ অজস্রতা। পৌনঃপুনিকতা নয়, নিজেকে অতিক্রম করে যাবার শক্তিতে তাঁর সাহিত্যের ঋতুবদল হয়েছে যুগে যুগে। আর ঋতুবদলের সঙ্গে সঙ্গে রীতিবদলও হয়েছে বার বার। শিল্পী হিসেবে অচিন্ত্যকুমার যেমন দূরয়ানী, তেমনি বিচিত্রসম্ভব। কবিত্বময় ভাবুকতা নিয়ে তাঁর জীবনবোধের আরম্ভ। নিজের এবং সহযাত্রীদের জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তো ছিলই, উপরন্তু বিদেশী সাহিত্যের প্রেরণাও নগণ্য ছিল না। বিশেষত হামসুনের প্রভাব তাঁর প্রথম দিককার রচনায় বিশেষ ভাবেই লক্ষিতব্য। কিন্তু মনের বন্ধন থেকে অচিন্ত্যকুমারের সত্যকার মুক্তি ঘটল মফস্বল শহরের বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। সরকারী চাকুরি-জীবনের নির্দেশে তাঁকে বাংলার শহরে-শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। কত বিচিত্র পরিবেশে কত বিচিত্র নরনারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে তাঁর। মফস্বলের বড়-পুতুল ছোট-পুতুল, তাঁদের অন্তঃসারহীন আত্মাভিমান, তাঁদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উন্নাসিকতা তটস্থ-দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। দেখেছেন উকিল-মোক্তার-মুহুরি-মামলাবাজ-মতলববাজদের বিড়ম্বিত দিনযাত্রাকে। ব্যঙ্গে ও রসিকতায়, সহানুভূতি ও সহৃদয়তায় তাদের জীবনকে নতুন সাহিত্যের উপজীব্য করেছেন। কিন্তু মধ্যবিত্ত সমাজের স্বরূপ উদ্ঘাটনেই তাঁর দৃষ্টি সীমাবদ্ধ থাকে নি, শহরের সংকীর্ণ ঘণ্ডি পেরিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন সুদুর-পল্লীর অতি সাধারণ মানুষের নগণ্য সুখদুঃখের মধ্যে। ‘কাঠ-খড়-কেরাসিন’, ‘হাড়ি-মুচি-ডোম’, ‘চাষা-ভূষা’ নিয়েই তাঁর সাম্প্রতিক রচনা সাহিত্যকে নতুন দিগন্তে প্রসারিত করেছে। বিশেষত, এতদিন যারা আমাদের সাহিত্যে প্রায় উপেক্ষিত ছিল, বঙ্গপল্লীর সেই দরিদ্র মুসলমান জনসাধারণের অন্তরঙ্গ জীবনের সুখদুঃখের কথা অচিন্ত্যকুমারের লেখনী এযুগে অনন্য-সাধারণ বিশিষ্টতা পেয়েছে।
২
আর এই দীর্ঘ জীবন-পরিক্রমায় লেখকের যে পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সেটি হচ্ছে এই যে, তিনি জীবনের ব্যাখ্যাকার নন, তিনি জীবনের রূপকার। সমস্যাস্নিগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে কোনো বিশেষ সূত্রে জীবনের ব্যাখ্যান ও বিশ্লেষণ তাঁর ধর্ম নয়, অন্তর্ভেদী কবিদৃষ্টি দিয়ে জীবনকে প্রত্যক্ষ করে শিল্পীর সাধনায় তাকে রূপায়িত করে তোলাই তাঁর প্রকৃতি। এমন কি দারিদ্র্যও তাঁর সাহিত্যে সমস্যা হয়ে আসে নি। এসেছে জীবনের অভিজ্ঞান হয়ে। চোখের উপর দিয়ে বিচিত্র সংসার কালস্রোতে নিয়ত প্রবহমান। তারই মধ্যে কোন একটি বিশেষ মুহূর্তে একটি বিশেষ ঘটনা বা চরিত্র-রহস্য কবিদৃষ্টিকে উচ্চকিত ও নন্দিত করে তোলে। অচিন্তকুমার সেই চিত্তবিস্ফারী জীবন-রহস্য-সন্ধানের আনন্দকেই তাঁর ছোটগল্পে ধরে রেখেছেন।
উপন্যাসে যেমন ‘বেদে’, ছোটগল্পে তেমিন ‘দুইবার রাজা’ অচিন্তকুমারের শক্তিমত্তার প্রথম নিঃসংশয় প্রামাণ। রবীন্দ্রনাথ যাকে সে যুগের অপটু হাতের রচনায়, ‘লালসার অসংযম’ আর ‘দারিদ্রের আস্ফালন’ বলেছিলেন, আমরা যাকে বর্তমান শতাব্দীর মানুষের হাতে জীবনের সঙ্গে পরিচয়ের দুটি নতুন অভিজ্ঞান বলে পরিচিহ্নিত করেছি, এই দুটি রচনায় সে যুগের এ দুধারারই প্রকাশ। ‘বেদে’র বোহেমীয় জীবনায়ন এককালে ‘বিবাহের চেয়ে বড়’ বলে প্রতিভাত হলেও লেখকের দৃষ্টিতে আজ ‘একটি গ্রাম্য প্রেমের কাহিনী’র মধ্যেও অভিঘাত-সহিষ্ণু মানসতৃষাতেই প্রেম পরিশুদ্ধি লাভ করেছে। কিন্তু দারিদ্র-লাঞ্ছিত জীবনের মানুষের যে পরিচয়, অচিন্ত্য কুমারের দৃষ্টিতে তাঁর জীবনবোধের প্রসারতা প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তা আরো স্পষ্ট আরো উজ্জল হয়ে উঠেছে।
অচিন্ত্যকুমারের সাহিত্যসাধনা জনসাধারণের দ্বারপ্রান্তে এসে বৃহত্তর জীবনোপলদ্ধির আনন্দে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। কারণ জনজীবনের মধ্যেই এযুগের শিল্পিমানসের সবচেয়ে বড় ভরসা। অবশ্য সমষ্টিবদ্ধ মানুষের সামগ্রিক জীবন নিয়ে মহাকাব্য রচনার প্রেরণা তাঁর নয়। ব্যক্তিজীবনের মনের গহনের তাঁর শিল্পের সীমাহীন সাম্রাজ্য। এবং সেখনেও অবচেতনবাদী ফ্রয়েডের সূত্র ধরে মানুষের মধ্যে কেবল পশুকেই খুঁজে বেড়ানোর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি মুক্ত হয়েছেন। তাই তাঁর গল্পসমূহে দরিদ্র মানুষের চরম দুঃখের কথা বলতে গিয়েও প্রাণপ্রাচুর্যের চিরসঞ্জীবিত।
পঞ্চাশের মম্বন্তর এবং তৎপরবর্তী বাংলার জনমানবের দুঃখ-দুর্গতির ছবিই বিশেষভাবে রূপ পেয়েছে এযুগের রচনায়। ‘কালনাগ’, ‘বস্ত্র;, ‘বাঁশবাজি’তে মন্বন্তরের পটভূমি ও প্রভাব প্রত্যক্ষ। ‘কালনাগ’ গল্পে মন্বন্তরের অনশনক্লিষ্ট নিুমধ্যবিত্ত সংসারের সর্বহারা দীনতার চিত্র। ইস্কুল-মাষ্টার ভবতোষ, তার স্ত্রী আর তিনটি অসহায় ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার। আত্মহত্যা ছাড়া পরাজয়-মোচনের আর কোনো উপায়ই চোখে পড়ে না। আত্মহত্যার সংকল্প নিয়েই ঘুমিয়েছিল ভবতোষ। ভোরে ঘুম ভেঙে দেখে স্ত্রী সুধা ঘরে নেই। তবে সুধাই কি আগে তাকে ফাঁকি দিয়ে আত্মহত্যা করে বাঁচল? ভবতোষ পাগলের মত চারদিক খোঁজে। শেষটায় গঙ্গার ঘাটেই গেল সুধার মৃতদেহের সন্ধানে। এমনি ভাবে ছটফট করে উৎকণ্ঠায় সারাদিন কাটবার পর প্রায় সময় সুধা ফিরল অপরূপ বেশে। বস্তির ঝিয়ের মত তার বেশভূষা, হাতে দু’সের চাল। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই কন্টোলের দোকানে গিয়েছিল চাল-সংগ্রহে। আর ঝি না সাজলে কি দাঁড়ানো যায় কন্টোলের লাইনে? কিন্তু সুধার প্রায় পিছনে-পিছনেই এসে উপস্থিত চিনে-সিল্কের ছেঁড়া-পাঞ্চাবি-পরা এক আধবয়সী ভদ্রলোক। সুধার সন্ধানে সে এসেছে। তাকে দেখেই ভবতোষের মনে আদিম সন্দেহ কুটিল কালনাগের মত উদ্যতফণায় হিংস্র হয়ে উঠল। আরো বিস্মিত হল তার প্রতি সুধার মমত্ববোধের পরিচয় পেয়ে। তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে জেনে সুধাকে আক্ষেপ করতে দেখে ভবতোষের কণ্ঠে কালনাগের তীব্র বিষ উচ্ছলিত হয়ে উঠল কুৎসিত কটাক্ষে: ‘না, তাকে আমার কাট ছেড়ে দিতে হবে!’ কিন্তু সুধা যখন কন্টোলের লাইনে চারদিনের উপোসের পর চাল সংগ্রহ করতে এসে ভদ্রলোকের ব্যর্থতা ও ভেঙেপড়ার কথা বর্ণনা করে বললো যে, সে-ই তাকে দয়াপরবশ হয়ে চারটি ভাত খেতে দেবার জন্যে ডেকে এনেছে, তখন ভবতোষ তার বিষের জ্বালায় নিজেই জর্জরিত না হয়ে পারল না। অকারণ-সন্দেহ-বিষের পরিমোক্ষন-বর্ননাটি ব্যঞ্জনাময়: ‘আস্তে আস্তে একটা তীব্র ঘন উগ্র গন্ধ ভবতোষকে আচ্ছন্ন করতে লাগল।’ বাস্তবানুগ জীবন ও মনের বিচিত্রলীলা-বর্ণনায় অচিন্ত্যকুমার সূক্ষ্মকর্মে কত পারংগম ‘কালনাগ’ তার সার্থক নিদর্শন।
‘বস্ত্র’ গল্পটিও মম্বন্তরের আরেকটি শ্মশানচিত্র। বুড়ো ছাদেম ফকির। অনুদয়ে গেয়ো-গরুর দুধ দুয়ে লোকের বাড়ি যোগান দিত। সংসারে ছাদেমের পরিবার আর তার বিধবা পুত্রবধু। বস্ত্রাভাবে সভ্যসমাজের সম্মুখীন হওয়া যায় না বলেই ছাদেমের জীবিকা বন্ধ হল। কোমরের নিচে একহাত অবধি একটা ন্যাকড়ার ঘের ছিল। সেই ফালিটা নেংটি হয়েছিল আস্তে-আস্তে। তারপর একেবারে তন্তুহীন। ছাদেম ফকির অন্ধকারে ভূতের মত শ্মশানে কাপড় খুঁজে ফেরে-যদি পায় ন্যাকড়ার ফালি, চটের টুকরো, বালিশের খোল। অবশেষে একেবারে দিগম্বর অবস্থায় একদিন শ্মশানপথের অন্ধকারে ধরা পড়ে তার ভাগ্যে জুটল একখানি নতুন কাপড়। কিন্তু একখানি মাত্র কাপড়ে কার লজ্জা নিবারিত হবে? নিজের, বউয়ের, না ছেলের বউয়ের? ছাদেম ফকির তাই লজ্জার হাত এড়াবার জন্যে নতুন কাপড়খানি গলায় জড়িয়ে আমের ডালে ঝুলে আত্মহত্যা করল। নতুন কাপড় দেনেওয়ালা বাবু যখন ছাদেম ফকিরের সন্ধানে এলেন তখন সে লাজলজ্জার বাইরে নগ্নদেহে গাছের ডালে ঝুলছে। নতুন দক্ষিণের বাতাসে বোল-ধরা ডালগুলো কাপছে মৃদু মৃদু। কিন্তু ছাদেমের এই আত্মহত্যায় শোকে বিলাপ করবার মতও কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না। না তার স্ত্রী, না তার পুত্রবধু। পাওয়া যাবেই বা কি করে? মানুষের সমাজে সম্পূর্ণ নগ্ন দেহ নিয়ে বেরোবার উপায় কোথায় তাদের? কাঁদবার উপায়ও তাই নেই। ছাদেমকে লাশখানায় নিয়ে যাবার পর অবশ্য তারা কাঁদবার সুযোগ পেল! তার গলা থেকে কাপড়খানি খুলে শাশুড়ি-বউ এ দুভাগ করে পরবার পর শোক প্রকাশের সুযোগ হল তাদের। এ গল্পে মানুষের হাতে মনুষ্যত্ব বেআক্র হয়ে লজ্জায় রুদ্ধকণ্ঠ।
এরা তবু শেষ পর্যন্ত কেঁদে দুঃখ লাঘবের সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু ‘বাঁশবাজিঃ গল্পে পুত্রের মৃত্যুতেও বুড়ো বাপ মন্তাজের চোখের জল ফেলবার উপায় নেই। বাঁশবাজি দেখিয়েই সে অর্থোপার্জন করে, ওই তার একমাত্র জীবিকা। কিন্তু অনাহারজীর্ণ বৃদ্ধদেহে সব সময় সে টাল সামলে চলতে পারে না। তাই বাঁশের ডগায় উঠে বাজি দেখাতে গিয়ে ছেলে তার ছিটকে পড়ে মাটিতে। দুটি ছেলে তার সম্বল। বড়টি মারা যাবার পর ছোট ছেলেটি বোঝে এবার তার পালা। তাই তার নিঃসহায় শিশুকণ্ঠে ভীত আর্তনাদ: ‘আমি নির্ঘাত পড়ে যাব। মরে যাব আমি।’ কোন্ অদৃশ্য আল্লার কাছে নিরুপায় শিশুর করুণ অথচ প্রতিকারহীন কাকুতি! মন্তাজ কিন্তু একেবারেই নির্বাক। তার পাথুরে মুখে নিষ্ঠুর নিলিপ্ততা। ছেলের কান্নার উত্তরে রেখাহীন কাঠিন্য। উপায় কি, তাকে খেতে হবে তো। দারিদ্র্য জীবিকাম্বেষী মানুষকে হৃদয়হীন অমানুষিকতার ক্ষেত্রে কোথায় নামিয়ে নিয়ে গেছে, এ গল্প তারই নির্মমতম উদাহরণ। দারিদ্র্য-পীড়নে পাষাভীভূত পিতৃহৃদয়ের রূপায়ণে লেখক ভাষাশিল্পেও ভাস্কর্য-কাঠিন্য সৃষ্টি করেছেন। দৃষ্টিভঙ্গির নিজস্বক্ষেত্রে ‘বাঁশবাজি’ গল্পটি অচিন্ত্যকুমারের শিল্পসৃষ্টির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
৩
‘জনমত’, ‘দাঙ্গা’ আর ‘নুরবানু’ গল্পের সুর আলাদা জীবনের নাটকীয় মূহুর্তে মনের আকস্মিক দিকপরিবর্তনের লীলারহস্যই এ তিনটি গল্পকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। ‘জনমত’ গল্পটি অধিকতর নাট্যধর্মী। কাবুলিওলা মামুদ খাঁ। তার লূণ্ঠনের অবাধ উপনিবেশের ক্ষেত্রে এসে মামুদ খাঁর বিস্ময়ের শেষ নেই। বছর পাঁচেক জেলে ছিল সে, এরই মধ্যে যে দিন-কাল-পাত্র একেবারে হুবহু বদলে যেতে পারে তা তার ধারণাই ছিল না। কিন্তু মামুদ খাঁ বুঝল, জনসমর্থন সে একেবারেই হারিয়েছে। কাজেই ভোজালি আর লাঠির দাপট তার মিথ্যা হয়ে গেছে। জনবলের প্রহারে জর্জরিত হয়ে মামুদ খাঁ পালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার প্রতিদ্বন্দ্বী মহেন্দ্র সাপুইয়ের কীর্তি দেখে তার চক্ষুরুন্মীলন হল। বারবধু নিত্যগোপীর ঘরে মহেদ্র দুর্ভিক্ষের হাসপাতাল থেকে একশখানি লাল মোটা কম্বল সরিয়ে রেখেছে। জনশোষণে তাহলে মহেন্দ্র তার চেয়েও হীন অনাচারে লিপ্ত! কিন্তু নির্বোধ জনমতকে কৌশলে সে আয়ত্ত করেছে বলেই শোষণের সূবর্ণ সুযোগ পেয়েছে। মামুদ খাঁর মনে হল, মহেন্দ্রদেরও কপাল একদিন ফাটাবে সেদিনের প্রত্যাশায় আজকের অপমানিত পরাজয়ের দুঃখ সে অনায়াসেই ভুলতে পারল। এ গল্পে শুধু মামুদ খাঁর মানস-পরিবর্তনই মুখ্য হয়ে ওঠে নি, অপ্রবুদ্ধ জনমতের স্বরূপ-নির্ণয়েও লেখকের বক্রোক্তি শাণিত হয়েছে।
‘দাঙ্গা’য় মনস্তত্ত্বই মুখ্য। আদমপুর আর ধুলেশ্বর দুই গ্রাম। মাঝখানে শিশেখালের ওপরে বাঁশের সাঁকো দিয়ে দুই গ্রামের যোগসূত্র। এই সাঁকোর ওপরে দুই গ্রামের ছেলে আর আর মেয়ের সাক্ষাৎ। গফুরালির ছেলে জিন্নাত আর মকবুলের মেয়ে মমিনা। দুই গ্রামের বিরোধে এরাই মিলনের সেতু নির্মাণ করতে পারত, কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। দুই গ্রামে বাধল দাঙ্গা। মকবুলের দলের কাছে গফুরালির দল গেল হেরে। জিন্নাত হল বন্দী। হাতে-পায়ে-কোমরে দড়ি বাঁধা, জিন্নাত শুয়ে আছে লকড়ি-ঘরে। শুকনো হোগলার ওপর। রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি গেল মমিনা তার কাছে। পালিয়ে যাবার পরামর্শ দিল সে। দুজনেই পালিয়ে গিয়ে ভিন গাঁয়ে কাব্জির দরবারে কাবিননামা রেজেষ্ট্রি করে আসবে। তাদের বিয়ে হয়ে গেলেই ঝগড়া-বিবাদ মিটে যাবে দু’পক্ষের। সম্মত হল জিন্নাত। বন্ধন মুক্ত হল তার। কিন্তু শেষ মুহুর্তে আদিম কামনাকে ছাপিয়ে উঠল তার গোষ্ঠী-চেতনা। সে না মরদের বাচ্চা? বিপক্ষের একটা মেয়ের প্রলোভনে সে তার দলগত সম্ভ্রমকে কিছুতেই পরাজিত হতে দেবে না। পালিয়ে গেল জিন্নাত। জীবনের নাট্যশিখরে মনের আকস্মিক দিকপরিবর্তনেই এখানে গল্পের চিত্তচমৎকার পরিণাম রচিত হয়েছে।
‘নুরবানু’ গল্পের অবলম্বন মুসলিম বিবাহ-বিচ্ছেদ-প্রথা। বর্গাচাষী কুরমান আর তার স্ত্রী নুরবানু। সংসার চলে না বলে নুরবানুকে খাটতে হয়। মুনিব-বাড়িতে। সেখানে মুনিব উকিলদ্দি দফাদারের কুনজরে পড়ে সে। এই নিয়ে স্বামীর মনে সন্দেহ আর ভুল-বোঝাবুঝি। এবং তারই পরিণতিতে এক উত্তেজিত মুহূর্তে সে স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে বসল। পরমুহুর্তেই এল অনুশোচনা। কিন্তু সামাজিক প্রথায় তালাক-দেওয়া স্ত্রীকে নিয়ে আর ঘর করা চলে না। একটি মাত্র উপায আছে। কেউ যদি নুরবানুকে বিয়ে করে তালাক দেয় তবে ফের কুরমান তাকে নিকে করতে পারে। উকিলদ্দি সে সুযোগ গ্রহণ করল এবং তালাক দেবার পূর্বে একরাত্রি সহবাসের সামাজিক দাবি জানাল। নিরুপায় নুরবানুর আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় নেই। কুরমান কিন্তু বুঝল না, কার প্রতি ঐকান্তিক অনুরক্তি-বশেই পর-পুরুষের কাছে নুরবানুর এই বাধ্যতামূলক দেহদান। তার কাছে পাতিব্রত্যের চেয়ে দৈহিক সতীত্বই হল বাড়। আর সেখানেই এল দাম্পত্য-জীবনের চরম ট্রাজেডি।
কিন্তু ‘মাটি’ ও ‘জমি’ গল্পে চেতনার শিকড় তরিয়ে গেছে একেবারে আসক্তির গভীরতায়। কৃষাণ আর কৃষাণবধু। মাটির মানুষ তারা। মাটির দৌলতেই তাদের সুখদুঃখ। মাটির প্রতি আকর্ষণ তাই তাদের সর্বজয়ী। সম্পন্ন চাষী আমানতের সত্তর বিঘে জমি ছিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষাভিলাষী একমাত্র পুত্র আজিজের পড়ার খরচ জোগাতে সে হয় সর্বস্বান্ত। তা হোক্, তবু পুত্রের কাছে তার একমাত্র আশা, বিয়ে করে তাকে ছেলে এনে দেবে একপাল। নাতিতে দাদু মিলে আবার গড়ে তুলবে তার বাড়বাড়ন্ত খেতখামার। কিন্তু শিক্ষিত পুত্রের কাছে সে-আশা আর তার মিটল না। সদরে চাকরি পেয়ে ছেলে বাপকে নিয়ে গেল শহরে। বুড়ি বউ এখনো আঁকড়ে আছে আমানতকে। কিন্তু নারীর চেয়েও মাটি অনেক বড়। স্ত্রী একপাল ছেলে এনে দেয়, আর সেই ছেলের দলের সাহায্যে মাটির বুকে সোনা ফলে বলেই না স্ত্রীর মূল্য! তাই সন্তান-সূজনে অসমর্থা বৃদ্ধা স্ত্রীর পাতিব্রত্য আমানতের কাছে অর্থহীন। ছেলে বাপকে সেলাই-কল কিনে দিলো। এখন আমানত আর চাষ্য নয়, খলিফা। কিন্তু ‘যেদিন আকাশ কালো করে টিনের চালের ওপর বৃষ্টি পড়ে ঝমঝম করে, আমানতের পা-কল কেমন আপনা থেকেই থেমে যায়-বৃষ্টিটা মনে হয় যেন কান্নার শব্দ; আর সেই সঙ্গে ভেসে আসে তার মাটির ডাক।’
তবু ‘মাটি’ গল্পে আমানতের জীবনে আসক্তির কান্নাটাই বড়, কিন্তু ‘জমি’ গল্পে কৃষাণবধু আমিরন আত্মবিক্রয় করেও সেই আসক্তিকেই জয়যুক্ত করেছে সোনামদ্দি জমি কিনেছিল হুকুমালির কাছে থেকে; কিন্তু সে জমির ওপর লোভ পড়ল জলিল মুন্সির। হুকুমালিকে কিছু টাকা দিয়ে নকল কাবালা করিয়ে জমির স্বত্ব নিয়ে মামলা বাধাল। কিন্তু জলিল মুন্সির তঞ্চকী মামলা বেফাঁস হয়ে গেল আদালতে। জোর করে জমি দখলের চেষ্টাও ব্যর্থ হল সোনামদ্দির স্ত্রী আমিরনের কঠোর প্রতিরোধে। তবু দূর্ত জলিল মুন্সির কাছে হল তাদের পরাজয়। ভিটে-মাটি সব গেল, শিশুপুত্রের হাত ধরে গিয়ে দাঁড়াতে হল একেবারে পথের ওপর। শুধু তাই নয়, শেষটায় কি না আশ্রয় নিতে হল জলিল মুন্সিরই কাছে! জমিতে সোনামদ্দি হালিয়া খাটবে আর বাড়িতে আমিরন দাসী-বাঁদি হবে। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস এখানেই শেষ হল না। কিছুদিন পরে দেখা গেল, জলিল মুন্সি আমিরনকে নিকা করেছে। আমিরনের কিন্তু আফসোস নেই। সোনামদ্দিকে তার জমি ফিরিয়ে দেবার শর্তে সে নিজেই জলিল মুন্সিকে নিকা করতে প্রস্তুত হয়েছে। হতবুদ্ধি সোনামদ্দিকে সে বলেছে, ‘আমার জন্যে মন খারাপ করো না। আমার চেয়ে তোমার জমির দাম অনেক বেশি। আমি গেলে কি হয়? কিন্তু জমি তো তোমার ফিরে এল। তোমার জমির গায়ে তো কেউ হাত দিতে পারল না। কৃষাণ-জীবনের আশা-আসক্তির এ এক নতুন দিক, নতুন উপলদ্ধি। অচিন্ত্যকুমারের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে ধ্যানাবিষ্ট স্বকীয়তা আছে, একেবারে মাটির স্তরে পৌঁছেও তার নিঃসংশয় প্রমাণ পাওয়া গেল। তাঁর শিল্পদৃষ্টি জনজীবনের নিুতম স্তরকে শুধু স্পর্শই করে নি, তাকে নতুন আলোয় আলোকিতও করেছে।
আর শুধু দৃষ্টিভঙ্গিতেই নয়, সৃষ্টিকর্মেও অচিন্ত্যকুমার অনন্যপরতন্ত্র। তাঁর শিল্পসাধনার আদিতেই কল্লোল-যুগের বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল ‘শুধু ভাবের দেউলে নয়; ভাষারও নাটমন্দিরে।’ সে বিদ্রোহ ‘শুধু বিষয়ের ক্ষেত্রেই ছিল না, ছিল বর্ণনার ক্ষেত্রেও। ভঙ্গি ও আঙ্গিকের চেহারায়। রীতি ও পদ্ধতির প্রকৃতিতে। ভাষাকে গাত ও ভাবকে দ্যুতি দেবার জন্যে ছিল শব্দসৃজনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রচনাশৈলীর বিচিত্রতা। এমন কি, বানানের সংস্করণ।’ আর এ বিদ্রোহে অচিন্ত্যকুমার ছিলেন একেবারে পুরোভাগে। তাঁর ‘বেদে’ শুধু বিষয়-বস্তুতেই নয়, ভঙ্গি ও আঙ্গিকেও ছিল একেবারে অভিনব। নিত্যবর্তমান কালের প্রয়োগে রচনাশৈলীকে বেগবান করে তোলার কাজে ‘বেদে’ সে যুগের পথপ্রদর্শক। বাংলা গদ্যকে অলংকৃত করার শিল্পকর্মেও তাঁর কবিত্বশক্তি নিত্যজাগ্রত ছিল। অবশ্য তাঁর প্রথম যুগের রচনার অলংকরণ-বাহুল্য সর্বদাই প্রশংসার্হ ছিল না, মধ্যে মধ্যে এদিক দিয়ে তাঁর অতিসচেতনতা চক্ষু-কর্ণের পীড়াদায়কও ছিল। কিন্তু সমকালীন রচনায় অচিন্ত্যকুমার বাংলা গদ্যের এমন একটি সহজ ও সরল রূপ আবিষ্কার করেছেন যে তা বাংলার নিরক্ষর চাষীর মুখেও স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠেছে। পল্লীবাসীর কণ্ঠে ভাষা দিতে গিয়ে আঞ্চলিকতা বা তৎস্থানিকতা সৃষ্টি প্রয়োজনে গ্রাম্য উপভাষা-প্রয়োগ শিল্পীরা প্রায় অপরিহার্য বলেই মনে করেন। কিন্তু অচিন্ত্যকুমার ভাষার একটি সর্বসাধারণ রূপ আবিষ্কার করে তাকে জনসাধারণের কণ্ঠে বসিয়েছেন। হয়ত তাতে ভাগীরথী-তীরবর্তী বাগ্ ভঙ্গির বিশুদ্ধতা সর্বদা রক্ষিত হয় নি, কিন্তু তা যে, বাংলা সাহিত্যকথার সম্পদ বৃদ্ধি করেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
