
ভারতের
দ্বিখণ্ডিতা ও বাংলা ভাগ- এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। নবাব
সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় এবং তার করুণ মৃত্যুর ভেতর দিয়েই ভারতবর্ষ পরাধীনতার
শেকলে বন্দি হয়ে পড়ে। এই শেকল ছিঁড়তে বহু রক্তক্ষয়ী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে।
বহু তাজা প্রাণের বলি হয়েছে। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ১৯৪৭ সালের ১৪
আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার মধ্য দিয়ে। ইংরেজ শাসনের
অবসান ঘটলেও ভারত ও বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে এখানে চিরকালের জন্য বিয়োগান্তক
এক অধ্যায় রচিত হয়। পাকিস্তান দুটো অংশে বিভক্ত হয় পশ্চিম পকিস্তান ও
পূর্ব পাকিস্তান। ট্র্যাজেডিটা এখানেই। পূর্ব বাংলা যেটাকে ‘পূর্ব
পাকিস্তান’ অভিধা দেওয়া হলো এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া
হলো, তা বাংলার জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের মহাকাব্য হয়ে থাকল। যার
চূড়ান্ত পরিণতিও ঘটে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
ভারতকে দ্বিখণ্ডিতকরণ এবং বাংলার বুকে
শাণিত ছুরি চালিয়ে দুভাগ করার কথা বিপ্লবী ও রাজনীতিকরা কখনো ভাবেননি।
কিন্তু ইংরেজদের চতুরতার ফাঁদে রাজনীতিকরা আটকে যান- তাদের অদূরদর্শিতার
কারণে, কিছু রাজনীতিকের ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে ভারত ও বাংলা বিভাগ
অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে পূর্ব বাংলার ললাটে লেখা হয়ে যায়
আর এক খণ্ডণের ইতিহাস। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব বাংলার দূরত্ব ছিল
বহু, ভাষা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতেও কোনো মিল ছিল না। শুধু ধর্মের
ভিত্তিতে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব বাংলাকে যুক্ত করে পাকিস্তান
রাষ্ট্র গঠন করা হয়। পূর্ব বাংলার নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান।
পাকিস্তান সরকারের বৈষম্য আর নিপীড়নের অনিবার্য জায়গা হয়ে ওঠে পূর্ব
পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক কাঠামোয়
ভারসাম্যোর ব্যাপক অভাব ছিল।
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি না
দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানিরা আলাদা জাতি। অথচ সে
সময় পাকিস্তানের শতকরা ৫৬.৪০ ভাগ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। পাঞ্জাবি ছিল
শতকরা ২৮.৫৫ ভাগ, পশতু ছিল ৩.৪৮ ভাগ, সিন্ধি ছিল ৫.৪৭ ভাগ, উর্দু ছিল ৩.২৭
ভাগ এবং অন্যান্যা ভাষাভুক্ত ছিলেন শতকরা ২.৮৩ ভাগ। অথচ মাত্র ৩.২৭ ভাগ
মানুষের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার ঔদ্ধত্য দেখান তিনি। এর ভেতর দিয়েই তার
প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পায়। পূর্ব পাকিস্তানিরা প্রতি পদে পদে
বঞ্চনা-বৈষম্যের শিকার হয়েছে। এর বড় কারণ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর
একনায়কতান্ত্রিকতা। তার উত্তরসূরিরাও তার দেখানো পথেই হেঁটেছিল। ফলে পশ্চিম
পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়। অথচ পাকিস্তান ছিল
বহু ভাষাভাষী মানুষের আবাস। সংস্কৃতিও ছিল আলাদা। ভৌগোলিকভাবেও নাগরিকরা
ছিল বিচ্ছিন্ন। ফলে জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুদৃঢ় করার জন্য যে ‘একজাতি
একরাষ্ট্র’- এই চেতনাবোধ সৃষ্টি করা যে অপরিহার্য ছিল, তা করা হয়নি। ফলে
পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে পারস্পরিক মমত্ববোধ ও সহানুভূতির ব্যাপারটিও
তৈরি হয়নি। বরং পাকিস্তান তৈরির পর থেকেই বহুভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত
ও নির্যাতন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে ব্যাপকভাবে বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
১৯৬৮
সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব,
পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যান ও ডেপুটি চেয়ারম্যান, পাকিস্তান
ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান ও প্রশাসক, ১৯৬২ সাল পর্যন্ত
পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের চেয়ারম্যান, ১৯৬৭ সাল
পর্যন্ত স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের গভর্নর কখনোই বাঙালি ছিলেন না।
পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বেড়ে যায়।
সামরিক শাসনের ৪৪ মাসে ৭৯০ জন জুনিয়র গ্রেড কর্মচারী নিয়োগ করা হয়, যার
মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ছিল মাত্র ১২০ জন (১৫.২ শতাংশ)। ১৯৫৯ সালের
সেপ্টেম্বর মাস থেকে ১৯৬০ সালের মে মাস পর্যন্ত ৯ মাসে ৭৩৪ জন সেকশন অফিসার
নিয়োগ করা হয়, যার মাত্র ৭৪ জন (১০ শতাংশ) পূর্ব পাকিস্তানের। ১৯৫৯-১৯৬৩
সময়কালে রাওয়ালপিন্ডির কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে ৩১৫ জন কেরানি নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানি ছিল মাত্র ৩৬ জন (১১ শতাংশ)। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩
সালেল মধ্যে ১৪ জন সামরিক কর্মকর্তাকে বেসামরিক প্রশাসনে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তারা সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি।
এভাবে দেখা যায় পাকিস্তানের সব
ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য ছিল
অবিশ্বাস্যরকমের। শিল্পকারখানা, চাকরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব ক্ষেত্রে এই
বৈষম্য বিরাজ করেছিল। দেশভাগের অভিশাপ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তি ঘটেনি
এবং এই মুক্তি যখন ঘটেছে, তখন পেরিয়ে গেছে ২৩ বছর। পাকিস্তানি সরকার পূর্ব
পাকিস্তানকে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করেছিল।
করাচিকে রাজধানী
শহর হিসেবে গড়ে তুলতেই ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ব্যয় ৫ হাজার ৭০০ মিলিয়ন টাকা। এই
অর্থ ছিল সে সময়ে পাকিস্তান সরকারের মোট ব্যয়ের ৫৬.৪ শতাংশ। আর পূর্ব
পাকিস্তানে সে সময় ব্যয় ছিল ৫.১০ শতাংশ। আর একটা চিত্র দিলে ব্যাপারটা আরও
পরিষ্কার হয় পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানকে কতভাবে শোষণ করেছে। ১৯৪৭
থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত সময়কাল পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত ছিল ৪৯২৪.১
মিলিয়ন টাকা। সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে ঘাটতি ছিল ১৬,৬৩৪.৬ মিলিয়ন টাকা।
খুব সহজেই বোঝা যায়, পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বৃত্ত টাকা পশ্চিম পাকিস্তানের
ঘাটতি পূরণে ব্যবহার করা হতো। ২৩ বছর শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে পূর্ব
বাংলা।
১৯৪৭ সালে দেশভাগ হওয়ার পরে পাকিস্তানের জনগণের যে মনোভাব ছিল,
স্বাধীনতা লাভের পরেই তা ভূলুণ্ঠিত হতে থাকে। পাকিস্তান সব ক্ষেত্রে পশ্চিম
পাকিস্তাননির্ভর হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে ব্যাপক বৈষম্যের
শিকার হতে হয়। উন্নয়নের সব ধারা থেকে ছিটকে ফেলানো হয়। পাকিস্তান নিজেই
নিজেদের বিভক্ত করে ফেলে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকাণ্ডে
প্রতিফলিত হতে থাকে যে, পাকিস্তান নামক দেশটা ও দেশের সম্পদ পূর্ব
পাকিস্তানিদের জন্য নয়। নিজেদের স্বাধীন হওয়ার শক্তিটা সেই হতাশা থেকেই
অগ্নিবারুদের মতো জন্ম নেয়। পুরো পূর্ব পাকিস্তান যখন ক্ষোভে বিস্ফোরিত হতে
থাকে, পরিণত হতে থাকে উত্তাল তরঙ্গে- স্বাধীনতার প্রশ্নে, পাকিস্তানি
সৈন্যবাহিনী তখন বাঙালি-নিধনে ২৬ মার্চ গভীর রাতে অতর্কিত আক্রমণ শুরু করে।
বাঙালির জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ কালরাত্রি। বাঙালিরা মৃত্যুকে তখন বুকে পেতে
নিয়ে রুখে দাঁড়ায়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যে যুদ্ধ দীর্ঘ নয় মাস চলে।
ভারত
স্বাধীনতার মাধ্যমে যে খণ্ডিত হলো, পূর্ব বাংলাকে জোর করে ভাগ করে
পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করে দিল, তা ছিল ঐতিহাসিকভাবে চরম ভুল এবং
হঠকারী এক সিদ্ধান্ত। এর ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র
হয়ে উঠতে পারেনি- পাকিস্তানের সম্পদ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সম্পদ হয়ে
ওঠেনি। বৈষম্যের অগ্নিশিখা সব ক্ষেত্রে তখন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল- তার
চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। সেই স্বাধীনতার সূর্য চিরকাল
থাকুক অক্ষয়।
লেখক: অধ্যাপক-কবি-কথাসাহিত্যিক-গবেষক
