
স্বাধীন
বাংলাদেশের জন্মেতিহাস পর্যালোচনা করলে তিনটি তারিখ প্রাসঙ্গিকভাবে
অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করতে হয়। তারিখগুলো হচ্ছে ৭ই মার্চ-২৬শে
মার্চ-১৬ই ডিসেম্বর। এই তিনটি তারিখের জন্ম ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে।
৭ই মার্চ
১৯৭১- এ তারিখটি বিখ্যাত একটি ভাষণের জন্য স্মরণযোগ্য। তখনকার বাংলাদেশের
অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান রমনা রেইসকোর্স ময়দানে ১৯ মিনিট ভাষণটি
দিয়েছিলেন। লোকসমাগম হয়েছিল দশ লক্ষাধিক। ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের
নির্বাচনোত্তর ঘটনা প্রবাহে উদ্ভূত পরিস্থিতির বাস্তবতায় স্বাধীন বাংলাদেশ
প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পরোক্ষভাবে যাপিত হলেও তা আস্তে আস্তে অভীষ্ট লক্ষ্যে
পৌঁছার ক্ষেত্র রচিত হতে থাকে অনেক আগ থেকেই। এ নিয়ে পুরোনো কাসন্দি ঘাটতে
চাই না, এ বিষয়ে আমরা জানি। আমরা বলতে তখন যাঁরা জীবিত ছিলেন এবং এখনও
তাঁদের মধ্যে যাঁরা সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছেন। ১৯৭১ সালের পর যাদের জন্ম তারা
পড়ে শুনে জেনেছে। কিন্তু প্রকৃত উত্তাপের নির্যাস তেমনভাবে যাপন করতে পারছে
না। তার প্রধান কারণ-
১. ঐতিহাসিক সত্যটা আমরা তেমনভাবে তুলে ধরতে পারিনি।
২. একই ঘটনা বিভিন্নভাবে উপস্থাপনের ফলে সত্য অন্ধকারে চলে গেছে।
৩.
যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি, তারা তাদের ভুলটুকু মেনে
নেয়নি। বরং নিজস্ব প্রজন্মকে ভুল শিক্ষায় বিপথগামী করে গেছে এবং যাচ্ছে
এখনও।
৪. আপসহীন অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নানাভাবেই বিতর্কিত করার প্রয়াস আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, হচ্ছে।
কারণ,
আজও স্বাধীন দেশে বাস করে সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারছে না। এক
শ্রেণির বিপথগামী জাতীয় সঙ্গীতকে সম্মান জানাতে পারছে না, জাতীয় পতাকাকে
কুর্ণিশ করছে না, ১৯৭১ কে মানতে পারছে না। এ নিয়ে অনেক কথা, অনেক ঘটনা এবং
অনেক অবহেলা প্রত্যক্ষ করছি। প্রশ্ন শুধু একটি- কেন ?
এই ‘কেন?’ কে সমাধান করতে হলে ৭ই মার্চ-২৬শে মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্বরকে ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রাসঙ্গিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
৭ই
মার্চের ১৯ মিনিটে ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস যেমন বর্ণিত হয়েছে, একটি জাতির
জন্মেতিহাস কীভাবে ক্রমান্বয়ে চূড়ান্ত অবস্থায় এসে গেছে এবং অস্তিত্ব
প্রতিষ্ঠার জন্য একটি মাত্র পথই তখন নির্ধারণ করার ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে।
ঘোষণাটি কি ?
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সুতরাং
অনেক চিন্তাভাবনার পর আমার উপলব্ধি হলো- এই ৭ই মার্চেই বাংলাদেশের
স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছে, এ দিনটিই আমাদের ‘স্বাধীনতা দিবস’। বক্তৃতার শেষে
নেতা- ‘জয় বাংলা’- ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন কী না এটা বড় করে দেখার প্রয়োজন
নেই। কারণ, গোটা নয়মাস যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীসহ আপামর জনগণের জাতীয় শ্লোগান
ছিল ‘জয় বাংলা’ আওয়ামী লীগ জাতীয় শ্লোগানটি নিজস্ব দলীয় শ্লোগান হিসেবে
এককভাবে কুক্ষিগত রাখার কারণে তার সর্বজনীন মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে, তার
মহিমা ভূ-লুন্ঠিত হয়েছে। মহান শ্লোগানটি বিতর্কিত হয়েছে। আইন করেও
পূর্বাবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি, যাবেও না। আওয়ামী লীগ এজন্য বিচারের
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে জনগণের দরবারে। এ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত অনেকভাবেই এ দলটি
দিতে হচ্ছে, হবেও।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে- তাহলে ২৬ শে মার্চ কেন
স্বাধীনতা দিবস নয় ? এ প্রশ্ন আমার। কেন ? এই কেন ?-এর ব্যাখ্যা হলো- ২৫
মার্চ রাত্রে পাক হানাদার বাহিনী অতর্কিতে ঘুমন্ত বাঙালিকে নির্বিচারে
হত্যা শুরু করেছিল। সেই ভয়াবহ রাত্রির ইতিহাস দীর্ঘ ও মর্মান্তিক এবং
পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম নির্মম নৃশংস ঘটনা। সেদিনই প্রকাশ্যে যুদ্ধ শুরু
হয়ে যায়। তখনকার সময়ে প্রথাগত কোনো ঘোষণা ধূম্রজালে নিমজ্জিত এবং সর্বকালীণ
বিতর্কের উপাদান ছাড়া কিছুই নয় বলে আমার মনে হয়েছে, হচ্ছে। ঐদিন ঘোষণা না
দিলেও যুদ্ধ তো শুরু হয়ে গেছেই, তা তো থামবার কোনো কারণ ছিল না। ফলে ইতিহাস
পাঠে আজও ঘোষণাটি কে দিয়েছেন, কে পাঠ করেছেন, এ বিষয়টি মীমাংসার জন্য
অপেক্ষা করতে হয়নি। তারপর থেকে নয়মাসের ঘটনাপ্রবাহে ১৬ই ডিসেম্বর জন্ম।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যাবে।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এলো। যুদ্ধ সমাপ্ত হলো।
শত্রুবাহিনী পরাজিত হলো। আত্মসমর্পণ করল। বাংলাদেশ হানাদার মুক্ত হলো। নতুন
সূর্য উদিত হলো। মুক্ত হলো দেশ, মুক্তি পেল বাংলাদেশের জনগণ, স্বাধীনতার
অমিয় স্বাদ গ্রহণ করল, নি:শ^াস নিল প্রাণভরে। এ এক মাহেন্দ্রক্ষণ,
মহামিলনের জগৎ- বিজয়ের আনন্দ এবং উল্লাস। যাঁরা তখন জীবিত ছিলেন, তাঁরাই
উপভোগ করতে পারলেন।
সুতরাং প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ তো ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
সালেই বাঙালি পেল বা পেতে লাগল এবং এখনও। তাহলে উপলব্ধির সমীকরণ বিশ্লেষণে
৭ই মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা, ২৬ শে মার্চ সশস্র যুদ্ধরাম্ভ এবং ১৬ই ডিসেম্বর
১৯৭১খ্রি: পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ- এভাবে যদি বিচার বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে
কোনো দ্বন্দ্বই আমাদেরকে বিতর্কিত করতে পারে না, পারবে না।
আমাদের মনে
রাখতে হবে ২৬ শে মার্চ যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হয়, তাহলে ১৪ই
ডিসেম্বর ১৯৭১খ্রি: জাতির সূর্যসন্তানরা কেন শহিদ হলো, নয়মাস কেন বাঙালি
জাতি বন্দিশিবিরে আবদ্ধ ছিল, মা-বোনসহ বাঙালি কেন শহিদ ও নির্যাতিত হলো ?
কাজেই
একমাত্র আমার উপলব্ধি ৭ই মার্চ স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছে, ২৬ শে মার্চ
স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেছে
বাংলাদেশ। যেভাবেই আমাকে বিবেচনা করুন না কেন, মীমাংসিত বিষয় নিয়ে আমার
উপলব্ধিকে অস্বীকার করুন না কেন, আমরা তো সর্বজনীন সিদ্ধান্তে এখনও
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এক অবস্থানে দাঁড়াতে পারছিনা। এজন্যই অর্বাচীনের
মূল্যহীন উপলব্ধির সাতকাহন।
শেষকথা- ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক তিনটি তারিখকে
কোনোভাবেই অবহেলা অবজ্ঞা করা যাবে না। কারণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা
প্রাপ্তির পূর্ণ ঠিকানা এবং প্রেরণা হচ্ছে এ তিনটি মহিমময় তারিখ। এই তিনটি
তারিখের মহিমা ভিন্ন হলেও ঐক্যসূত্রে অবিভাজ্য এবং পারস্পরিক দৃঢ়
সম্পর্কযুক্ত। ৭ই মার্চ একটি জাতি এক মঞ্চে উপস্থিত হয়েছিল, ২৬ শে মার্চ
গোটা জাতি (বিপথগামী ছাড়া) যুদ্ধক্ষেত্রে সমবেত হয়েছিল এবং ১৬ই ডিসেম্বর
বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করেছিল। এ ধারা আজও বহমান। চলবে
চিরকাল। জয় বাংলা। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
