সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সাল পর্যন্ত বাড়বে। এরপর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার কমতে শুরু করবে। তার বিপরীতে বাড়বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। তাই জনমিতির সুবিধা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের হাতে সময় আর বেশি নেই। এ সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে জনসংখ্যার এই সুবিধা কাজে লাগানো যাবে না। অথচ কর্মসংস্থান তৈরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ঘাটতি রয়েছে। ফলে ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের দুর্বল চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে ছোট উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন। ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে তারা এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করেছেন। দেশের কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এসব কর্মসংস্থানের চাকরি নিরাপত্তা সামাজিক সুরক্ষা ও অবসরকালীন সুবিধা সীমিত। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে ধীরগতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে কর্মী কমিয়েছে। উচ্চশিক্ষা থাকলেও আনুষ্ঠানিক চাকরি নিশ্চিত হচ্ছে না। নারীদের শ্রম বাজারে অংশগ্রহণ কম এবং শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতিও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর একটি প্যানেল আলোচনায় দেশের বিশিষ্টজনরা তাতে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, জনমিতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সরকার পুরো জীবনচক্রভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার জন্য কর্মসূচিগুলো আমরা বিস্তৃত করছি। আমাদের লক্ষ্য, তরুণ প্রজন্ম যেন স্বাস্থ্যবান ও দক্ষ হয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার চিত্রও উদ্বেগজনক। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। সরকার শিক্ষায় অর্থ ব্যয় করছে এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে। কিন্তু সেই বিনিয়োগের বিপরীতে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুবসমাজের শিক্ষার প্রতি অনীহা। কারণ শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সেগুলো চিহ্নিত করে কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
বিশ্বব্যাংক যে প্রতিবেদন সামনে এনেছে তা আমলে নিয়ে এখন থেকেই সরকারকে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। অবশ্য বিশ্বব্যাংক এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে। তাই সেসব বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করে দেশের অর্থনীতিতে গতি আনা জরুরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশে শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারিগরি ও এআই-ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। উৎপাদনশীল কাজে নারীর অংশগ্রহণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে। প্রবীণ জনসংখ্যার সংখ্যা বিবেচনা করে তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। আগামী দিনের সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে কর্মক্ষম জনশক্তির সুবিধা কাজে লাগাতে হবে।
